দীপঙ্কর নন্দী, অংশু চক্রবর্তী: ‘‌এত বড় তাণ্ডব আমি দেখিনি। মনে হচ্ছে যেন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসে আছি!‌ ইট্‌স এ বিগ ডিজাস্টার। স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছি। মনে হচ্ছে যেন স্বজন হারিয়েছি।’‌
বুধবার রাতে ঝড় কিছুটা থামলে নবান্নে কন্ট্রোল রুমে বসে সাংবাদিকদের এ কথাই বললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তিনি আরও বললেন, ‘‌৭–৮ জনের মৃত্যুর খবর শোনা গেছে। বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আমরা এখনও খবর পাইনি। সমস্ত ক্ষয়ক্ষতির খবর আসতে আসতে প্রায় ১০ দিন সময় লাগবে। এক দিনে কিচ্ছু হবে না। হাজার হাজার কোটির ক্ষতি হয়েছে। লক্ষ কোটিরও হতে পারে। নবান্নের কন্ট্রোল রুমে বসে ঝড়ের তাণ্ডব আমরা বুঝতে পেরেছি। বেশ ক্ষতি হয়েছে নবান্নেরও। ১৪তলায় আমার ঘরের দরজা আটকানো যাচ্ছিল না।’‌ জানা গেছে, নবান্নে কাচ ভেঙে পড়ে গুরুতর জখম হয়েছেন পুলিশকর্মী তীর্থ মণ্ডল। কন্ট্রোল রুমে সারাক্ষণই বসে ছিলেন বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের মন্ত্রী জাভেদ খান।
ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করতে বৃহস্পতিবার বেলা তিনটেয় টাস্ক ফোর্সের বৈঠক ডেকেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে এ ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌এখনও পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট আসতে অনেকটা সময় লাগবে। ব্রিজ, বঁাধ, রাস্তা— সমস্ত ভেঙে গেছে। সব সারাতে হবে। সাগর, কাকদ্বীপ, নামখানা, নন্দীগ্রাম, হাসনাবাদ, সন্দেশখালি, বনগঁা, ভাঙড়, বাগদায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বঁাকুড়া, বসিরহাট, ব্যারাকপুর, হাবড়া, হাওড়ারও বিভিন্ন জায়গায় ঝড়ের তাণ্ডবে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সর্বনাশ হয়ে গেছে। বহু বাড়ি ভেঙেছে। আমরা বুঝতে পারিনি এত বড় ঝড় হবে। আমরা ৫ লক্ষ মানুষকে সরিয়ে নিয়ে এসেছি বলে মৃত্যুর হাত থেকে অনেকে বেঁচে গেছেন।’‌ মুখ্যমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, ‘‌যঁারা আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন, সরকারি নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত সেখান থেকে কেউ বেরোবেন না। অনেক জায়গা বিদ্যুৎ–‌বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। প্রাথমিক যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন।’‌ তবে আশাবাদী মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌এই সমস্ত যা–‌কিছু ক্ষতি হয়েছে আমরা সমস্ত ঠিকঠাক করে আবার উন্নয়নের যজ্ঞে সকলকে নিয়ে শামিল হব। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।‌ তবে কেন্দ্রকে বলেছি, রাজনৈতিক নয়, মানবিক দিক দিয়ে দেখুন।’‌‌
এদিন দুপুর দুটো নাগাদ তিনি কন্ট্রোল রুমে আসেন। সঙ্গে ছিলেন মুখ্য সচিব রাজীব সিন্‌হা, স্বরাষ্ট্র সচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়–‌সহ অন্য অফিসারেরা। 
মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন, ‘‌সাগর, বাসন্তী, কাকদ্বীপ, মন্দিরবাজার, কচুবেড়িয়ায় ঝড়ের দাপটে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাথরপ্রতিমা, কচুবেড়িয়া, মাতলায় বঁাধ ভেঙে গেছে। মাতলায় ব্রিজ তৈরি করতে হবে। কেন্দ্রের কাছে চাইলে ওরা তো কিছু দেবে না। শুধু গালাগালি দেবে।’‌ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌কলকাতাতেও ঝড়ের দাপট ছিল মারাত্মক। বিকেল থেকে সন্ধে পর্যন্ত ১০৫ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়েছে।’‌ মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও জেলাশাসকদের সঙ্গে কথা বলে মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘‌দিঘায় অতটা প্রভাব না ফেললেও, প্রবল জলোচ্ছ্বাস হয়েছে।’‌
সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী মন্টুরাম পাখিরার সঙ্গেও মুখ্যমন্ত্রী কথা বলেন। সাগর, গোসাবা, ক্যানিংয়ে ঝড়ের দাপট ছিল বেশি। মন্টুরামকে সবটা দেখে নিতে নির্দেশ দেন মমতা। বলেন, বঁাধ ভাঙা ঠেকাতে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ খুব ভাল কাজ করে। তিনি এ ব্যাপারে পরিবেশ দপ্তরের সঙ্গে কথা বলবেন। সাগর ও সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী খেঁাজখবর নেন। ঝড়ের সময়ে কাউকে না–‌বেরোনোর নির্দেশ দেন তিনি। মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আমাদের এলাকায় প্রচুর গাছ পড়েছে।’‌ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌সাধারণ মানুষের যাতে কোনও ক্ষয়ক্ষতি না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে।’ এদিকে, কলকাতায় বহু রাস্তায় জল জমেছে এবং গাছ ভেঙে পড়েছে বলে পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী তঁাকে বলেছেন, ‘‌এই মুহূর্তে রাস্তাঘাট পরিষ্কার করার দরকার নেই। আজ ওসব কাজ বন্ধ রাখতে হবে।’‌ গাছ উপড়ে পড়ায়, ল্যাম্পপোস্ট ভাঙায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন জায়গায় আলো নিভিয়ে দিতে বলেন, যাতে বড়সড় কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে। কলকাতার বহু জায়গা তাই বেশি রাতেও ছিল নিষ্প্রদীপ।
মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘বর্ধমানেও ঝড় হয়েছে। এদিকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মন্দিরবাজার, কচুবেড়িয়া তছনছ করে দিয়েছে। কন্ট্রোল রুমে দু’‌জনের মৃত্যুর খবর এসেছে সন্ধে ৭টা পর্যন্ত। এঁরা হলেন মিনাখঁার নুরজাহান বেওয়া। তিনি তালগাছ পড়ে মারা গেছেন। অন্যজন উলুবেড়িয়ার লক্ষ্মী সাউ। তঁার মৃত্যু হয়েছে টিন চাপা পড়ে।’‌ পরে জানা গেছে, মারা গেছেন আরও একজন। তিনি বসিরহাটের মোহন দাস। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বার বার ঝড়ের মধ্যে বেরোতে বারণ করা হয়েছে। কেউ কথা না শুনলে কিছু করার নেই। মৃত্যু খুবই দুঃখজনক।’ তিনি বলেন, ‘‌কাকদ্বীপ–‌বকখালিতে ভয়ঙ্কর ঝড় হয়েছে। ৫ লক্ষ মানুষকে সরিয়ে আনা হয়েছে। সেচ দপ্তর সঙ্গে সঙ্গে সব খবর পাঠিয়েছে। কাকদ্বীপেই যদি ১৬৭ কিলোমিটার বেগে ঝড় হয়, তা হলে অন্য জায়গায় কী হয়েছে ভাবুন!‌’‌ তিনি বলেন, ‘‌বানতলা, চৌবাগা, ভাঙড়, বাসন্তী, রাজারহাটের সীমান্ত এলাকা দিয়েও ঝড় বয়ে গেছে। নবান্নে বসে আমরা বুঝতে পারছি ঝড়ের গতি।’ নবান্নের ১১৯ নম্বর ঘরে বসতেন প্রাক্তন মন্ত্রী শোভন চ্যাটার্জি। ঝড়ের দাপটে তঁার ঘরের দরজা ভেঙে গেছে। অফিসারেরা সেই ঘর দেখে আসেন।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top