‌আজকালের প্রতিবেদন: বিদ্যাসাগরের মূর্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি আগেই দিয়েছিলেন। মঙ্গলবার নিজের দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি পালন করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। বিদ্যাসাগর কলেজে বিদ্যাসাগরের আবক্ষ মূর্তি স্বমর্যাদায় নিজের হাতে প্রতিষ্ঠা করলেন তিনি। তার আগে হেয়ার স্কুলের অনুষ্ঠানে বিদ্যাসাগরের আবক্ষ মূর্তিটি উন্মোচন করে মূর্তি ভাঙার অরাজকতার বিরুদ্ধে ‘‌নবজাগরণ’‌–এর ডাক দেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেন, ‘‌আরেকবার নবজাগরণ আসুক। সবাই এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। বাঙালি হঠাও অভিযান করলে আমি কিন্তু ভয়ঙ্কর।’‌ 
নিজের হাতে আবক্ষ মূর্তির প্রতিষ্ঠাই শুধু নয়, কলেজে ঢোকার মুখে বিদ্যাসাগরের পূর্ণাবয়ব একটি মূর্তিও এদিন উন্মোচন করেন তিনি। সুসজ্জিত হুডখোলা জিপে আবক্ষ মূর্তিটি নিয়ে হেয়ার স্কুল থেকে বিদ্যাসাগর কলেজ পর্যন্ত পদযাত্রা করেন। তাঁর সঙ্গে পা মেলান বিদ্বজ্জন–সহ আরও অনেকে। 
লোকসভা ভোটের প্রচারে ১৪ মে বিজেপি নেতা অমিত শাহের রোড শোয়ের পর বিদ্যাসাগর কলেজে রাখা বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হয়। অভিযোগ ওঠে অমিত শাহের মিছিলে যাঁরা ছিলেন তাঁরাই মূর্তিটি ভেঙেছেন। সেই রাতেই বিদ্যাসাগর 
কলেজে ছুটে এসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। পরে শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি জানিয়েছিলেন, বিদ্যাসাগরের নতুন মূর্তি গড়া হবে। 
ঘটনার দিনই মূর্তি ভাঙার কড়া নিন্দা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এদিন হেয়ার স্কুলের অনুষ্ঠানেও মূর্তি ভাঙা নিয়ে ফের একবার ক্ষোভ ঝরে পড়ে তাঁর বক্তব্যে। বলেন, ‘‌বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা দুঃখজনক, লজ্জার।’‌ বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার ঘটনাকে ফের একবার বাংলার সংস্কৃতির ওপর আঘাত বলে মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, ‘মূর্তি ভেঙে বিদ্যাসাগরকে ভোলানো যাবে না। মূর্তি ভেঙে বর্ণপরিচয় মোছা যাবে না। যিশুর কথা মনে পড়ছে, ঈশ্বর ওরা জানে না, ওরা কী করছে। ওদের ক্ষমা করো। মূর্তি ভেঙে বাংলাকে অসম্মান করা হয়েছে। আমি লজ্জিত। ক্ষমা চাইছি।’‌ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌ভোটের আগে নৈরাজ্য তৈরি করেছিল বিজেপি। অমিত শাহের মিছিলের পর কেন মূর্তি ভাঙা হল?‌ বিজেপি মূর্তি ভেঙে তৃণমূলের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। তৃণমূলের কোনও কর্মী এটা করলে থাপ্পড় মারতাম।’‌ পরে বিদ্যাসাগর কলেজে বলেন, ‘‌বাংলার পরিচয় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ— কাকে কাকে ভাঙবে?‌ বাংলা গান্ধীজি, মৌলানা আবুল কালাম আজাদকেও সম্মান করে। বিজেপি মার্কস, লেনিন, আম্বেদকর–সহ অনেকের মূর্তি ভেঙেছে।’‌ হেয়ার স্কুলের অনুষ্ঠানে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‌বিদ্যাসাগর বাঙালির ‘‌আইকন’‌। তাঁর  ভাবমূর্তি অত সহজে ভাঙে না। তিনি স্মরণে, ধ্যানে, মননে, চিন্তায় আছেন। শুধু বর্ণপরিচয় নয়, নাটকও লিখেছেন। দানের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের মনে চিরকাল থাকবেন। সাঁওতাল পরগনা নিয়েও কাজ করেছেন।’‌ 
এদিন হেয়ার স্কুলের অনুষ্ঠানমঞ্চে ছিলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী, শুভাপ্রসন্ন, সুবোধ সরকার, আবুল বাশার, নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, গৌতম ঘোষ, সোহিনী সেনগুপ্ত, বীথি চ্যাটার্জি, অরিন্দম শীল, জুন মালিয়া, অভীক মজুমদার প্রমুখ। মন্ত্রীদের মধ্যে ছিলেন অমিত মিত্র, পার্থ চ্যাটার্জি, নির্মল মাজি, ইন্দ্রনীল সেন, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, তাপস রায়, সাংসদ সুদীপ ব্যানার্জি, ডাঃ শান্তনু সেন প্রমুখ। এছাড়াও ছিলেন মুখ্য সচিব মলয় দে, স্বরাষ্ট্র সচিব আলাপন ব্যানার্জি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সোনালি চক্রবর্তী ব্যানার্জি, যাদবপুরের উপাচার্য সুরঞ্জন দাস–সহ অন্য উপাচার্যরা, অধ্যক্ষ এবং শিক্ষকেরা, ভারত সেবাশ্রমের দিলীপ মহারাজ–সহ আরও অনেকে। ছিলেন বিদ্যাসাগরের বংশধররা। অতিথিদের উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করে নেয় হেয়ার স্কুলের পড়ুয়ারা। বিদ্যাসাগরের লেখা বর্ণপরিচয়ের দুটি ভাগ এবং তাঁকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত–সহ আরও অনেকের লেখা নিয়ে তৈরি একটি পুস্তিকা বিলি করা হয়। বিদ্যাসাগরের আবক্ষ মূর্তি নিয়ে পদযাত্রায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পা মেলান শুভাপ্রসন্ন, সুবোধ সরকার, আবুল বাশার, নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, অরিন্দম শীল, অভীক মজুমদার প্রমুখ। মন্ত্রীদের মধ্যে ছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, তাপস রায়, নির্মল  মাজি, ইন্দ্রনীল সেন প্রমুখ। 
মুখ্যমন্ত্রী এদিন তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বিদ্যাসাগরের জন্মের দ্বিশতবর্ষ উপলক্ষে আরও নানা অনুষ্ঠান হবে। ঘাটাল কলেজকে ৫০ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে। বীরসিংহ গ্রামেও আমি যাব। বিদ্যাসাগর কলেজকে ১ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বিদ্যাসাগর, ভেতরে স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, প্রেসিডেন্সির ভেতর রবীন্দ্রনাথ এবং কলেজ স্ট্রিট চত্বরে নজরুলের মূর্তি বসবে।’‌ 
বিদ্যাসাগর কলেজের অধ্যক্ষ গৌতম কুণ্ডু জানিয়েছেন, বিদ্যাসাগরের ভাঙা মূর্তিটি ওই অবস্থাতেই সংরক্ষণ করা হবে। কলেজের সংগ্রহশালাতেই ভাঙা মূর্তিটি রাখা হবে। নতুন যে আবক্ষ মূর্তিটি বসল সেটি রাখার জন্য কাচের শোকেস করা হবে। বাইরের প্রায় সাড়ে ৮ ফুটা লম্বা পূর্ণাবয়ব মূর্তিটির ওপর ছাউনির ব্যবস্থা করা হবে। কলেজে বিদ্যাসাগরের নামে একটি মিউজিয়াম কোথায় গড়া হবে তা পরিচালন সমিতি ঠিক করবে বলে তিনি জানান।

জনপ্রিয়

Back To Top