দীপঙ্কর নন্দী- সত্তর দশকের মাঝামাঝি রাজনীতি শুরু করেছেন মালা রায়। অবিভক্ত কংগ্রেসে ছাত্র পরিষদের সভাপতি কুমুদ ভট্টাচার্য মালাকে প্রথম সাধারণ সম্পাদক করেন। বিদ্যাসাগর উইমেন্স কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। থাকতেন উত্তর কলকাতায় হরি ঘোষ স্ট্রিটে জ্যাঠামশাইয়ের বাড়িতে। যৌথ পরিবার। দেশের বাড়ি তমলুকে। প্রতি বছর এখানে দুর্গাপুজো হয়। স্কুলজীবন এখানেই। টালিগঞ্জেও থাকতে হয়েছে। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল যখন তৈরি হল, সেইদিন সারা রাত মমতার বাড়িতে কাটিয়েছেন। তার আগে মমতার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি ও সুব্রত মুখার্জির সঙ্গেও দীর্ঘদিন ছিলেন মালা। রাজনৈতিক জীবন শুরু দক্ষিণ কলকাতা থেকেই। এখনও সেখানেই রাজনীতি করেন। এবার কলকাতা দক্ষিণ থেকে লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী। ২০১৪–‌য় কংগ্রেস থেকে কলকাতা দক্ষিণে প্রার্থী হয়ে হেরে যান।
দক্ষিণ কলকাতায় রাজনীতি করার সময় নির্বেদ রায়ের সঙ্গে পরিচয়। ১৯৮৬ সালে বিয়ে। মালার এক মেয়ে ও এক ছেলে। নির্বেদ মেয়ের নাম দেন প্রমিতি। সম্প্রতি প্রমিতির বিয়ে হয়েছে। অধ্যাপনা করেন। সাউথ পয়েন্ট থেকে স্কুলের গণ্ডি পার করে এমএসসি পাস করেছে ছেলে। কর্মস্থল বেঙ্গালুরু।
তৃণমূলে থাকাকালীন কলকাতা পুরসভার মেয়র পরিষদের সদস্য হয়েছেন। কয়েকটি ছোটখাটো কারণে তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ তৈরি হয়। মেয়র পারিষদ থাকাকালীন কয়েকজনের সঙ্গে তিনিও সাসপেন্ড হয়েছিলেন। এরপর নির্দল প্রার্থী হয়ে তিনি জয়ী হন। কিছুদিন কংগ্রেসও করেন। ২০১৫–য় মালা ফিরে আসেন তৃণমূলে। মমতার সঙ্গে মালার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। কখনই তাঁর সঙ্গে মতবিরোধ হয়নি। ৮০–র দশকে মমতার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। মমতা যেখানে যেতেন, সেখানে মালা থাকতেন। পারিবারিক সম্পর্ক তাঁর।
বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মায়া সেনের কাছ থেকে গান শিখেছেন। ভেবেছিলেন গান গেয়েই জীবন কাটিয়ে দেবেন। হয়নি। রাজনীতির ঘূর্ণিপাকে পড়ে যান। আকাশবাণীতে নিয়মিত যেতেন। প্রবন্ধ লিখতেন। রেকর্ডিং হত। তাঁর বহু প্রবন্ধ আকাশবাণীর যুববাণীতে প্রচারিত হয়েছে।‌‌ লেখার হাত বরাবরই ভাল। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লিখেছেন। গাছপালার প্রতি আকর্ষণ বরাবর। নিজের হাতে গাছ লাগিয়েছেন। ফুলগাছের পরিচর্যা করেন। চাকরি করতে কখনও ইচ্ছে হয়নি জানতে চাওয়া হলে মালা বলেন, ‘‌প্রয়োজন হয়নি। তাই ইচ্ছে হয়নি। আমার সংসার করতে খুব ভাল লাগে। আমরা খুব সুখী। আমি মনে করি  সংসার গুছিয়ে না করতে পারলে রাজনীতি করা যায় না। দিনের শেষে বাড়িতে এসে আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হই।’‌ নির্বেদ সম্পর্কে মালার বক্তব্য, ‘‌আমার ছায়াসঙ্গী বলতে পারেন। আমাকে সবসময় মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন, ভরসা দিয়েছেন। নানানভাবে সাহায্য করেছেন। ও না থাকলে কী যে হত, তা বলতে পারছি না।’‌
মালার এ দেশেই জন্ম। নির্বেদদের বাড়ি বাংলাদেশে। টালিগঞ্জের বাড়িতেই ১৯৮৬ সালে ওঁদের বিয়ে হয়। মালার কখনও মনে হয়নি নির্বেদ ওপার বাংলার। মালা পছন্দ করেন ওপার বাংলার খাবার। বেশি মশলা দিয়ে মালা রান্না করতে ভালবাসেন। মালাইকারি তাঁর পছন্দ। আলু পোস্ত, বিউলির ডাল তাঁর খুব প্রিয়। বিয়ের পর কিছুদিনের জন্য মালা রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। এরই মধ্যে ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে ওঠার পর আবার ফেরেন রাজনীতিতে। মমতা ব্যানার্জি যখন যুব কংগ্রেস সভাপতি সেই সময় তাঁর কমিটিতে ছিলেন মালা। সুব্রত মুখার্জির বাড়িতে তাঁরা প্রায়ই বসতেন, আন্দোলনের কর্মসূচি ঠিক হত। নির্বেদও আসতেন। ২০০৬–এ শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে রাসবিহারী থেকে বিধানসভায় দাঁড়িয়ে হেরে যান।
২০১৪ লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস থেকে দাঁড়াবার পর দেখলেন তাঁর সঙ্গে খুব কম লোক। যাই হোক, সে সময় কংগ্রেসের অবস্থা ভাল ছিল না। মালা হেরে গিয়েছিলেন। ২০১৯–এ দক্ষিণ কলকাতা থেকে তাঁকে তৃণমূলের প্রার্থী হতে হবে, এটা তিনি আগে জানতেন না। প্রতিদিনের মতো পুরসভায় নিজের ঘরে বসে কাজ করছিলেন। হঠাৎ টিভিতেই দেখেন মমতা তাঁর নাম ঘোষণা করে দিয়েছেন। মালা কলকাতা পুরসভার চেয়ারম্যান। প্রার্থী ঘোষণার পরের দিন থেকেই কাজ শুরু করে দেন। দিনভর অগুনতি তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে প্রচার করছেন। মেয়র ফিরহাদ হাকিম, মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস তাঁর হয়ে প্রচার করছেন। অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছেন তিনি। কলকাতা দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে যে ৭টি বিধানসভা রয়েছে তার সব ক’‌টি তৃণমূলের দখলে। কাউন্সিলররা আছেন। সকলেই তাঁর হয়ে নেমেছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রচার করছেন। মমতার উন্নয়নের কথা বলছেন। দীর্ঘদিন দক্ষিণ কলকাতায় রাজনীতি করার ফলে অলিগলি সব চেনেন। একটা সময় তাঁকে যাঁরা কাজ করতে বাধা দিতেন, তাঁরাই এখন তাঁর হয়ে কাজ করেন। মালার সাফল্য এখানেই। তিনি বলেন, ‘‌ভোট হচ্ছে দিদির নামে। আমরা তাঁর সৈনিক মাত্র।’‌‌‌‌

 

মালা রায়। ফাইল ছবি

জনপ্রিয়

Back To Top