সব্যসাচী ভট্টাচার্য ও সঞ্জয় বিশ্বাস
নেতাজির জন্মদিনে ‘‌দেশনেতা’‌ প্রশ্নে নাম না করে প্রধানমন্ত্রীকে তীব্র কটাক্ষ মুখ্যমন্ত্রীর। বৃহস্পতিবার দার্জিলিং ম্যালে নেতাজির ১২৩তম জন্মজয়ন্তী পালনের মঞ্চ থেকেই এই কটাক্ষ ছুঁড়ে দেন মমতা ব্যানার্জি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যিনি দেশকে নেতৃত্ব দিতে পারেন, তিনিই দেশের নেতা। যিনি সব ধর্ম, সব মত, সব ভাবনাকে সঙ্গে নিয়ে কঁাধে কাঁধ মিলিয়ে চলেন, তিনিই দেশের নেতা। যাঁর মনে গরিবের জন্য ভালবাসা আছে, বড়লোককে ভালবাসলেও গরিবের জন্য কাজ করতে বলেন, তিনিই নেতা।’‌ এই সূত্রেই মুখ্যমন্ত্রীর কথায় চলে আসে নেতাজির মৃত্যু সম্পর্কে ধোঁয়াশার প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, ‘‌নেতাজির জন্মদিন তো আমরা জানতে পারি, কিন্তু ৭৩ বছর কেটে গেলেও, তঁার মৃত্যু কবে কোথায় হয়েছে, তা দেশ জানতে পারেনি, এটা খুবই লজ্জার।’‌ 
কেন্দ্রীয় সরকার নেতাজির জন্মদিনকে জাতীয় ছুটি ঘোষণা না করায় কেন্দ্রকে একহাত নেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেন, ‘‌নেতাজি দেশের এত বড় নেতা, আমাদের রাজ্যে স্টেট হলিডে আছে, কিন্তু আমরা অনেক বছর ধরে বলছি নেতাজির জন্মদিন জাতীয় ছুটি হওয়া উচিত, কিন্তু আজ পর্যন্ত হয়নি।’‌ তঁার আশ্বাস, ‘‌নেতাজির জন্মদিনকে জাতীয় ছুটির দিন ঘোষণা করে, তিনি বড় দেশপ্রেমিক ছিলেন এই কথাটা বলার দরকার আছে। একদিন সময় এলে আমরা সেটা করব।’‌ অন্যান্য বছরের মতোই দার্জিলিং ম্যালে নেতাজির জন্মজয়ন্তী পালনের আয়োজন করে রাজ্য সরকার। ঠিক ১২টা নাগাদ অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী। ম্যালে ভানুভক্তের মূর্তিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে সোজা চলে আসেন মঞ্চে। তখন সেখানে রাজ্যের দুই মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও ইন্দ্রনীল সেন ছাড়াও ছিলেন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বিনয় শিবিরের সভাপতি বিনয় তামাং, জিটিএ প্রশাসক বোর্ডের চেয়ারম্যান অনীত থাপা, রাজ্যসভার সাংসদ শান্তা ছেত্রী, স্বরাষ্ট্রসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়, নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুরজিৎ কর পুরকায়স্থ, মিরিক পুরসভার চেয়ারম্যান লালবাহাদুর রাই, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান অমর সিং রাই, রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজ স্বামী নিত্যসত্যানন্দ–‌সহ বিভিন্ন জনজাতি উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানরা। ঘড়ির কঁাটা মিলিয়ে ১২টা ১৫ মিনিটে নেতাজির জন্ম সময়ে সাইরেন বাজানো হয়। এরপর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও স্বাগত ভাষণের পর বলতে ওঠেন মুখ্যমন্ত্রী। দার্জিলিং ম্যালে তখন তিলধারণের জায়গা নেই। নেতাজি ও তঁার আজাদ হিন্দ ফৌজের সঙ্গে গোর্খাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌নেতাজির মতো নেতা হয়তো হবে না, তবে তঁার কথা মনে রাখতে হবে।’‌ খুব প্রাসঙ্গিক ভাবেই নেতাজির ধর্মনিরপেক্ষতার কথা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেন, ‘নেতাজি ১৯৪০ 
সালের ১২ মে ঝাড়গ্রামের সভা থেকে হিন্দু মহাসভার নীতির নিন্দা করেছিলেন।‌’‌
নেতাজির হাত দিয়েই যোজনা কমিশনের সূচনা হয়েছিল জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর তোপ, ‘‌বিজেপি–‌র সরকার এসে প্ল্যানিং কমিশন তুলে দিয়েছে। এখন তো রাজ্যগুলোর নিজের কথা বলার কোনও জায়গাও নেই।’‌ নাম না করে বিজেপি–কে আক্রমণ করতে গিয়ে নেতাজির উক্তিকেই হাতিয়ার করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, নেতাজি স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের লড়াইয়ে রক্ত দেওয়ার কথা বলেছিলেন, কিন্তু এখন নিজেদের রাজনীতির জন্য লোকের রক্ত নিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর উদ্বেগ, ‘‌কত লোকের মৃত্যু হয়েছে!‌ বিশেষ করে দেশে এনআরসি–ক্যা–‌এনপিআরের পর সাধারণ মানুষের অধিকার থাকবে কি না, সেই প্রশ্ন উঠে গেছে।’‌ তঁার প্রতিশ্রুতি, ‘‌আমরা নেতাজি, গান্ধীজি, আম্বেদকর, ভগৎ সিং, ভানুভক্ত, পঞ্চানন বর্মা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলামের দেখানো পথে চলব। যতই ঝড় আসুক, জয় করার হিম্মত আমাদের আছে।’‌ নেতাজির জন্মদিন পালনের মঞ্চ থেকে পাহাড়কে ভাল থাকার বার্তাও দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‌পাহাড় উন্নতি চায়, এক সঙ্গে থাকতে চায়, আমরা কেন এর ভাগাভাগি করব?‌ আমি চাই দার্জিলিং বিশ্বসেরা হোক, কালিম্পং মিরিক কার্শিয়াং ভাল থাকুক। দার্জিলিঙের মানুষ এগিয়ে যাক।’‌‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top