শিখর কর্মকার: আধুনিকতার নামে দ্রুত বদলে যাচ্ছে আমাদের সমাজজীবন। একান্নবর্তী পরিবারে ভাঙন ধরেছিল আগেই, এখন চিড় ধরেছে সম্পর্কে। আদর্শচ্যুত হচ্ছে মানুষ। সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষার পেছনে ছুটতে গিয়ে মানুষ হাঁপিয়ে উঠছে। একাকীত্ব গ্রাস করছে প্রবীণ নাগরিকদের। বদলে যাওয়া সমাজজীবনের এইসব টুকরো ছবি এবার ফুটে উঠছে শহরের কয়েকটি দুর্গাপুজোয়। সমাজে একান্নবর্তী পরিবার এখন অতীত। পরিবার ছোট হয়েছে। টুকরো হয়েছে সম্পর্ক। টুকরো হতে হতে আমরা নিজের অজান্তে নিজের থেকেই আলাদা হয়ে পড়ছি। সম্পর্কের বাঁধনে পড়েছে টান। ঘুণ লেগেছে আদর্শের বন্ধনে। খাটিয়ার বুননকে সামনে রেখে বেলগাছিয়া সাধারণ দুর্গোৎসবে সমাজজীবনের এই ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী দেবজ্যোতি জানা। শিকড়ে ফেরার তাগিদে বাঁশের সঙ্গে বাঁশের ও খাটিয়ার বুননকে কাজে লাগিয়ে মণ্ডপটি সাজিয়েছেন শিল্পী। অন্যত্র দুর্গা একা পূজিত হলেও, এই এলাকায় পারিবারিক বাঁধনে ছেলে–‌মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে আসেন দুর্গা। প্রতিমাতেও খাটিয়ার বুননকে কাজে লাগিয়ে জীবনে বাঁধনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে এখানে। ব্যস্ত জীবনে মানুষ আজ ছুটে চলেছে। এই ছুট প্রয়োজনের তুলনায় চাহিদার পেছনে অনেক বেশি। চাহিদার কোনও শেষ নেই। প্রয়োজনের জন্য ছুটে মানুষ ক্লান্ত হয় না কিন্তু নেশার মতো চাহিদার পেছনে ছুটতে গিয়ে মানুষ হাঁপিয়ে উঠছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ‘‌চরণ ধরিতে দিও গো আমারে‌.‌.‌.‌’‌ গানটির কয়েকটি লাইন সামনে রেখে, এ বিষয়ে মাস্টারদা স্মৃতি সঙ্ঘে মণ্ডপ সাজাচ্ছেন শিল্পী মানস রায়। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের চরণ ধরে চাহিদার নেশা থেকে যেন মুক্তি চাইছে মানুষ। মণ্ডপের মাঝে অসংখ্য বহুতলের দেওয়ালে ফুটে উঠছে উচ্চাকাঙ্ক্ষার ছবি। চাহিদার কোনও শেষ নেই বোঝাতে গাড়ি চাকা ব্যবহার করা হয়েছে। মই বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টায় কিছু বিমূর্ত মানবমূর্তি। মা দুর্গার চরণে ঠাঁই পেতে বিভিন্ন দুয়ার খোলা আছে বোঝাতে পাঁচ ভারতীয় শিল্পকলায় সাজানো হয়েছে গর্ভগৃহ। উচ্চশিক্ষা কিংবা চাকরির কারণে আজ বিধাননগরের অধিকাংশ তরুণ–‌তরুণী বিদেশে। বাড়ি আগলে বসবাস করছেন তাঁদের বৃদ্ধ বাবা–‌মায়েরা। বাসে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য দুটি আসন সংরক্ষিত হয়েছে। কিন্তু তৃতীয় প্রবীণের প্রতি সহানুভূতি দেখাবার লোকের সংখ্যা দিন দিন কমছে। সল্টলেকের এ–‌ই পার্ট ওয়ান ব্লকের দুর্গা ‘‌লাঠি’‌ ভাবনায় প্রবীণদের এই অবস্থা তুলে ধরেছেন শিল্পী অভিজিৎ ঘটক। যুব অবস্থায় মানুষের দেওয়ার থাকে, তাই তার প্রয়োজনও থাকে। বয়সকালে তাঁর কার্যক্ষমতা কমে, প্রয়োজনও কমে যায়। অকেজো নলকূপের সঙ্গে এই অবস্থার মিল খুঁজে শিল্পী মণ্ডপে বেশ কয়েকটি নলকূপ ব্যবহার করেছেন। এই নলকূপের মুখ বয়স্ক মানুষের আদলে। কোথাও তাঁর ভাঙা হাতল ধরার চেষ্টায় এগিয়ে আসছে এক যুব হাত। মণ্ডপ সাজাতে বৃদ্ধ বয়সের অবলম্বন চেয়ার, ছাতা, পথচলার লাঠি, চশমা প্রভৃতি ব্যবহার করা হয়েছে। সব আসন প্রবীণ নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত একটি উড়ন্ত বাসের দেখা মিলবে মণ্ডপে।‌

মধুবনী কাজে সেজে উঠছে মাস্টারদা স্মৃতি সঙ্ঘের মণ্ডপ। ছবি: আজকাল

জনপ্রিয়

Back To Top