কাকলি মুখোপাধ্যায়- আমফানের তাণ্ডব ব্যাপক আঘাত করেছে কলকাতার সবুজে। গত কয়েক বছরের চেষ্টায় এই শহরকে আকাশরেখায় যতটা সবুজ দেখাত, ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কার পর সে এখন বেশ খানিক রুক্ষ, বিবর্ণ। আমফানের অভিঘাতে মহানগর জুড়ে উপড়ে পড়েছে ১৫ হাজার গাছ। কলকাতার সার্বিক পরিবেশের দিক থেকে গভীর উদ্বেগ বয়ে এনেছে। 
ঝড়ের গতি ছিল তীব্র। তবু এত পরিমাণ গাছ উপড়ে পড়াও নজিরবিহীন। পরিস্থিতি সামাল দিতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় পুরসভার উদ্যোগে কলকাতা জুড়ে চলছে গাছ প্রতিস্থাপন এবং নতুন গাছ লাগানো। 
শহর জুড়ে এতশত গাছ পড়া নিয়ে কথা হচ্ছিল পরিবেশ প্রযুক্তিবিদ সোমেন্দ্র মোহন ঘোষের সঙ্গে। তাঁর কথায়, এই ঝড়ে অর্জুন, শিশু, আম, জারুলের মতো শক্ত মজবুত গাছও উপড়ে গেছে। এর সবথেকে বড় কারণ গাছের গোড়া আলগা। আধুনিক এই শহরের মাটিই আলগা হয়ে পড়েছে। মেট্রো রেল, মাটির নীচে অজস্র কেব্‌ল, পাইপ লাইন শহরের মাটি আলগা করে ফেলেছে। অপরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানোও একটা বড় কারণ গাছ পড়ে যাওয়ার। দুটি গাছের মধ্যে কম করে ১০ ফুটের দূরত্ব রাখা দরকার। যেটা সবসময় মানা হয় না। অনেক বড় বড় গাছ লাগানো হয়েছিল। কিন্তু মাটি পরীক্ষা না করেই সেইসব গাছ লাগানো হয়। গাছ একটু বড় হতে না হতেই গাছের চারদিক বাঁধিয়ে দেওয়া হয়। কোথাও আবার গাছের গোড়ায় মন্দিরও তৈরি করা হয়েছে। এতে গাছের বড় ক্ষতি হয়েছে। মাটির নীচে বিদ্যুৎ, কেব্‌ল, ফোনের লাইনের কাজের জন্য যখন তখন খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়। অসচেতনতার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় গাছের শিকড়। আলগা হয়ে পড়ে শিকড়। জল পৌঁছায় না মাটির ভিতরে। এর ফলে গাছটি একটু একটু করে দুর্বল হয়ে পড়ে। পরিবেশবিদদের একাংশের অভিযোগ অপরিকল্পিত এবং অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গাছ লাগানোর জন্যই এত গাছ পড়ে গেছে। শহরে সবুজায়ন ভীষণ জরুরি। তবে নতুন বৃক্ষরোপণের আগে পরিকল্পনা জরুরি। 
পুরসভার একাংশেরও একই অভিমত। পুর আধিকারিকদের একাংশের কথায়, ঝড়ে অনেক শক্ত গাছ পড়ে গেছে। বট, অশ্বত্থের মতো মাটি কামড়ে পড়ে থাকা গাছও এই ঝড়ে উপড়ে গেছে। ঝড়ে গাছের ডালপালা ভেঙে পড়তেই পারে। কিন্তু শিকড় সমেত উপড়ে পড়েছে মানে বুঝতে হবে মাটি আলগা হয়ে পড়েছে। এসব বড় বড় গাছের শিকড় মাটির এত গভীরে পৌঁছে যায়। নানা পরিষেবার কেব্‌ল লাইন। কাজের জন্য বারবার খোঁড়াখুঁড়ি, ঢিলে করে দিয়েছে জমি। ডেকে এনেছে সমস্যা। তাই সম্প্রতি পুরসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিদ্যুৎ, কেব্‌ল–‌সহ এইসব জরুরি পরিষেবা লাইনের জন্য আলাদা ইউটিলিটি টানেল করা হবে। রাস্তার ধার দিয়ে যাবে সেই টানেল। টানেলের মধ্যেই থাকবে এইসব পরিষেবার তারের লাইন। 
আমফানের পরে পুরসভা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মতো গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। এলাকা পরীক্ষা করে যেখানে যে ধরনের গাছ লাগানোর পরামর্শ দেবেন, সেখানে সেইরকম গাছই লাগানো হবে। তালিকায় মূলত দেবদারু, আম, জাম, শিশু, নিম, জারুলের মতো শক্ত গাছের নাম রয়েছে।‌

জনপ্রিয়

Back To Top