মলয় সিনহা: সোশ্যাল মিডিয়ার দাপট এখনও ভোকাট্টা করতে পারেনি ঘুড়ি–লাটাই ও মাঞ্জা–‌সুতোকে। বর্তমানে স্কুলপড়ুয়া থেকে তরুণ–তরুণীরা স্মার্ট ফোন, ভিডিও গেম, নতুন নতুন অ্যাপস ও শপিং মলের আড্ডা–‌নির্ভর হলেও, এখনও ভুলে যায়নি ‘‌ভোকাট্টা’‌ শব্দটি। এমনই ছবি ধরা পড়ল উত্তর–মধ্য কলকাতার ঘুড়ি তৈরির দোকানগুলির ব্যস্ততায়। ঘরের চারিদিকে ছড়িয়ে নানা রঙের ঘুড়ির মেলা। দোকানের কারিগর এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন সব নাম। শুধু অপেক্ষা সুতোর টানে আকাশে ওড়া। বর্তমানে মনোরঞ্জনের আধুনিক নানান উপকরণ থাকলেও, সারা বছর ঘুড়ির চাহিদা রয়েছে। এই কারণে কলকাতার ঘুড়ি তৈরির দোকানগুলি এখনও টিকে রয়েছে বলে দাবি বিশু কাইটের কর্ণধার নীলমণি সেনের। সেনবাবু আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, ‘‌প্রতি বছর বাজার সমান যায় না কিন্তু এখনকার তরুণদের হাতে স্মার্ট ফোন থাকলেও, ঘুড়ি প্রতি টান রয়েই গেছে।’‌ মধ্য কলকাতার বাসিন্দা কলকাতা কাইট অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি প্রয়াত নিমাইচাঁদ সেন নিজের হাতে ঘুড়ি তৈরি করে ওড়াতেন। রেমিংটনের প্রযুক্তি–‌কর্মী নিমাইবাবু ঘুড়ির ওড়ানোর শখ প্যাশন হয়ে দাঁড়ায়। নানা প্রতিযোগিতায় নিজের হাতের তৈরি ঘুড়ি নিয়ে অংশগ্রহণ করতেন। সেই শখকে পেশা হিসেবে বেছে নেন তাঁর ছেলে নীলমণি সেন। তৈরি করেন ‘‌বিশু কাইট’‌। ২৪ বছর ধরে ঘুড়ি তৈরি ব্যবসায় করছেন তিনি। ঘুড়ি ব্যবসায়া নিয়ে নীলমণি সেন জানান, ‘‌প্লাস্টিকের ঘুড়ি এবং চীন থেকে আসা নাইলন সুতোর ব্যবহার। পাশাপাশি গত বছরে জিএসটি–‌র প্রভাবে অন্ধ্র থেকে আনা ঘুড়ি তৈরির কাগজের দামবৃদ্ধিতে কমেছিল বিক্রি।’‌ চলতি বছরে মন্দার সেই ছবিটা কিছুটা হলেও কমবে বলে আশা ব্যবসায়ীদের। বছরের শুরু থেকে রাজ্যের নানা প্রান্তে উৎসবের বাইরেও, ঘুড়ির চাহিদা তুলনামূলক বেড়েছে। একই সঙ্গে কলকাতা ও তার আশপাশে আসন্ন বিশ্বকর্মা পুজোকে ঘিরে ঘুড়ির চাহিদা এখন তুঙ্গে। চাহিদা অনুযায়ী বাজার দখল করতে ৩ মাস আগে থেকে ঘুড়ির দোকানের কারিগররা নাওয়া–খাওয়া ভুলে কাজ করছেন। সেই ব্যস্ততার মাঝে বিশু কাইটের কারিগর শেখ মনসুর, রফিক, জাফরের মুখে একটাই কথা, ‘‌এখানে আমরা ৫ জন কাজ করি। প্রতি বছরই যেন এ রকম কাজের চাপ থাকে।’‌ ঘুড়ি বিক্রি নিয়ে নীলমণিবাবু জানান, ‘স্পেশ্যাল কোয়ালিটির ঘুড়ি তৈরি করি বলে বাজারে আমাদের সুনাম আছে। এবারে বিশ্বকর্মা পুজোতে আশাকরি গত বছরের থেকেও ভাল বিক্রি হবে। আমাদের তৈরি ঘুড়ি বাজারে ৬ থেকে ১৫ টাকা দামে বিক্রি হয়।’‌ এবারে সব বয়সের কাছে ময়ূরাক্ষী, চাঁদিয়াল, মোমবাতি ও পেটকাটির ঘুড়ির চাহিদা বেশি বলে জানান নীলমণি। কলকাতায় বছরে বেশি ঘুড়ি বিক্রি হয় জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি মাস এবং জুলাইয়ের শেষ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। নীলমণি সেনের দাবি, এই শহরের দোকানের তৈরি ঘুড়ির বেনারস, দিল্লি, জয়পুর, এলাহাবাদ–‌সহ দেশের অন্যান্য প্রান্তেও চাহিদা রয়েছে। 

 

 

ঘুড়ি তৈরিতে ব্যস্ত ওঁরা। ছবি: অভিজিৎ মণ্ডল

জনপ্রিয়

Back To Top