সম্রাট মুখোপাধ্যায়: চলে গেলেন দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ অসুস্থতার পর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে। শারদোৎসবের মধ্যেই। ২৭ সেপ্টেম্বর। বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর।‌‌ মঞ্চের এই দক্ষ অভিনেতা জীবনের শেষ দিকে বেশ কিছু দিন অবশ্য অভিনয় থেকে দূরেই ছিলেন শারীরিক কারণে। তবে এই সময়ের ভেতরেও নাট্য–‌নিবেদিতপ্রাণ মানুষটি মঞ্চের জন্য কাজ করে গেছেন নেপথ্য থেকেই। কখনও তা পরিচালনা–উপদেশনার কাজ, আবার কখনও নিজের দল ‘সংস্তব’–‌এর প্রযোজনা, পৃষ্ঠপোষণ। সেদিক থেকে ‘‌সংস্তব’‌–‌এর প্রযোজনা ‘‌কাউ’‌ ছিল মঞ্চের সঙ্গে তাঁর শেষ যোগাযোগ–সূত্র।
দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৪৯–‌এর ২২ সেপ্টেম্বর, কলকাতায়। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যাসির ছাত্র দ্বিজেনবাবু ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর ফাইনাল পরীক্ষা দেননি। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন অভিনয়কে। অভিনেতা হিসেবে তাঁর খ্যাতির শুরু থিয়েটার কমিউনের প্রযোজনা ‘‌কিংকিং’‌ থেকে। এই সময় নীলকণ্ঠ সেনগুপ্তর সঙ্গে তাঁর জুটি জনপ্রিয় হয় আরও একটি নাটকে। প্রেমচন্দর গল্প থেকে তৈরি ‘‌দানসাগর’‌–‌এ। তবে দ্বিজেনবাবু পরিচিতির শীর্ষে পৌঁছন শূদ্রক–‌এর প্রযোজনা ‘অমিতাক্ষর’–‌এ। আদ্যন্ত এক ভীরু মানুষ চাপের মুখে কীভাবে রুখে দাঁড়াচ্ছেন, তারই কাহিনী এই নাটক। কেন্দ্রীয় চরিত্র ত্বিষাজনতি করতেন তিনি। নাটকটির পরিচালনাও ছিল তাঁরই। এর পর গান্ধার–‌এর ‘‌নিলাম নিলাম’‌, ‘‌ভস্মা’, কিংবা রংরূপ–‌এর ‘‌বিকল্প’ নাটকগুলিতে আবার অসিত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর জুটি তৈরি হয়। দ্বিজেনবাবু একদিকে যেমন ছিলেন স্বভাববাদী অভিনেতা, তেমনই একজন পরিচালকের পক্ষে বিশ্বস্ত অভিনেতাও। তাই বড় পরিচালকরা বরাবরই তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন নিজেদের প্রযোজনায়। সেভাবেই শম্ভু মিত্রের সঙ্গে দু’বার অভিনয় করেছেন দ্বিজেনবাবু— ‘‌গ্যালিলেওর জীবন’‌ ও ‘‌দশচক্র’‌–‌এ। বিভাস চক্রবর্তীর পরিচালনায় করেছেন বলিদান এবং ‘‌গাজি সাহেবের কিস্‌সা’‌। পরবর্তী কালে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় টানা অভিনয় করে গেছেন দু’‌দশক ধরে। যার সূত্রপাত বিশ্বরূপা মঞ্চে পেশাদারি থিয়েটারে, ন্যায়দণ্ড নাটকে, যা ছিল পেশাদারি মঞ্চে সৌমিত্রবাবুর শেষ কাজ। পরে গ্রুপ থিয়েটারে যখন সৌমিত্রবাবু এলেন, তখনও তাঁর নির্ভরযোগ্য প্রধান অভিনেতা দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘‌প্রাণতপস্যা’‌, ‘‌নীলকণ্ঠ’, ‘‌আরেকটি দিন’‌, ‘‌কুরবানী’, ‘‌আরোহণ’‌, ‘‌হোমাপাখি’ হয়ে ‘‌ছাড়িগঙ্গা’‌ পর্যন্ত যার বিস্তার। এমনকী সৌমিত্রবাবুর আত্মকথামূলক নাটক ‘‌তৃতীয় অঙ্ক অতএব’‌–‌এও সৌমিত্রবাবুর অন্যতম অল্টার ইগোর চরিত্র করেছেন দ্বিজেনবাবু।
টেলিভিশন ধারাবাহিকেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় মুখ। বিশেষত হাস্যরসের অভিনয়ে। কিন্তু অভিনেতা হিসেবে এই ব্যস্ততা কখনই মঞ্চ‌বিমুখ করেনি তাঁকে। নিজে পরিচালনা করেছেন ‘তৃষাগ্নি’ এবং ‘‌মুষ্টিযোগ’‌–‌এর মতো দুই পলিটিক্যাল স্যাটায়ার। তাঁর নিজের পরিচালিত ‘‌গুণধরের অসুখ’‌–‌এ তিনি করতেন নাম চরিত্রটি, যে গুণধর বয়সে যুবক হলেও মনের দিক থেকে শিশু। আবার সম্প্রতি দ্বিজেনবাবুর পরিচালনায় ‘স্পর্ধাবর্ণ’ নাটকটি ছিল আদ্যন্ত সিরিয়াস এক রাজনৈতিক নাটক। এর পর পরই তিনি কাফকার উপন্যাস ‘‌ট্রায়াল’‌ থেকে তৈরি নাটক ‘‌আইনসিদ্ধ’‌ পরিচালনা করেন। এই নাটকেরও মূল চরিত্রে অভিনয় করতেন তিনি। এই নাটক চলতে চলতেই স্মৃতিভ্রংশ অসুখের শিকার হন, যা তাঁর অভিনয় জীবনে ছেদ ঘটায়। ইচ্ছে ছিল ‘স্পর্ধাবর্ণ’ ও ‘‌আইনসিদ্ধ’র পর আরেকটি রাজনৈতিক নাটক করে একটি ট্রিলজি করবেন। আকস্মিক মৃত্যুতে তা আর হয়ে উঠল না।‌

জনপ্রিয়

Back To Top