দীপঙ্কর নন্দী: বইপাড়ায় ঘুরতে ভালবাসেন। শুধু তাই নয়, প্রচুর বইও কেনেন। গল্প–‌উপন্যাস কম, ভ্রমণ সংক্রান্ত বই প্রতিমার খুব প্রিয়। ‌হিমালয়ের ওপর জলধর সেনের লেখা কয়েকটি বই তাঁর মুখস্থ। বাবা গোবিন্দচন্দ্র নস্কর সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের আমলে মন্ত্রী ছিলেন। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় দাপুটে এই নেতাকে এক ডাকে সকলে চিনতেন। আজও তিনি তৃণমূলের বিধায়ক। গোটা দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার প্রতিটি ব্লকে নেতা ও কর্মীদের নাম জানেন গোবিন্দবাবু। বয়স হয়েছে। শরীর আগের মতো আর নেই। তৃণমূলে থাকতেই একদিন মেয়ে প্রতিমাকে বললেন, ‘‌তুই সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে নেমে পড়। আমি আছি। সমস্যায় পড়লে তোকে পরামর্শ দেব। চিন্তা করবি না। রাজনীতিতে থেকে মানুষের সেবা করতে পারবি। জীবনের শুরুটা আমি করে দেব। তুই জয়নগর থেকে দাঁড়ানোর জন্য মানসিক প্রস্তুতি নে।’ গোবিন্দবাবু‌ মেয়েকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কাছে নিয়ে গেলেন। কথা বলে ভাল লেগে গেল মমতার। তার আগেই ডব্লিউবিসিএস পাশ করে পুরোপুরিভাবে সরকারি চাকরি করছেন। বাড়িতে ফিরে এসে বাবার সঙ্গে আরও আলোচনা। এরপর চাকরি ছাড়লেন। ২০১৪ জয়নগর লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত। প্রতিমার বয়স ৫৩। মাত্র ২৩ বছর বয়সে বিয়ে। স্বামী নারায়ণ মণ্ডল অডিট সার্ভিসে। জয়নগরে বাড়ি থাকলেও পাকাপাকিভাবে থাকেন বালিগঞ্জ স্টেশন রোডে। এক মেয়ে, এক ছেলে। মেয়ে সৌম্যনেত্রা প্যারিসে চাকরি করেন। ছেলে চন্দ্রমৌলী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। গোবিন্দবাবু দীর্ঘদিন দক্ষিণ কলকাতায় থাকেন। নিয়মিত যাতায়াত করেন প্রতিমা। সমস্যায় পড়লে বাবার কাছে ছুটে যান। গোবিন্দবাবুকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় স্নেহ করতেন। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় এই দাপুটে নেতাকে সিদ্ধার্থবাবু অনেক সুযোগ দিয়েছিলেন। গোবিন্দবাবু তাঁর মর্যাদাও রেখেছেন। সরকারি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর প্রতিমা প্রথম রাজনীতিতে এসে কোনও অসুবিধা বোধ করেননি। সুন্দরবনের একটা অংশ বাবার সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই ঘুরে বেড়িয়েছেন। বড় হয়েও বাবার সঙ্গে গেছেন। বাবাই তাঁকে সব চিনিয়েছেন। সেই সময় রাস্তাঘাট ভাল ছিল না। যোগাযোগ করা যেত না। বাবা অনেক কাজ করেছেন। গরিব মানুষের পাশে বাবা সবসময় থাকতেন। এখনও মানুষ ছাড়া বাবার জীবনে অন্য কিছু নেই। 
প্রতিমা ট্রেকিং করতে খুব ভালবাসেন। একবার গঙ্গোত্রী গিয়েছিলেন স্বামীকে নিয়ে। নারায়ণবাবু শেষপর্যন্ত ট্রেকিং করতে পারেননি। প্রতিমা পোর্টার নিয়ে গঙ্গোত্রী গিয়েছিলেন। কথায়–বার্তায় অসম্ভব স্মার্ট প্রতিমা। মুখে মিষ্টি হাসি। একজন প্রকৃত গৃহবধূ। বাড়িতে রান্নার লোক থাকলেও কলকাতায় থেকে রান্না করেননি এমন দিন যায়নি। বললেন, ‘‌সবাই জল গরম করতে পারে। কতটা চা লাগবে তা অনেকেই জানে না। মায়ের কাছ থেকে সব শিখেছি।’‌ সব ধরনের রান্না করতে পারেন। এ ব্যাপারে শাশুড়ির কাছ থেকেও সাহায্য পেয়েছেন। ছেলেমেয়েরা বন্ধুর মতো। প্যারিস থেকে মেয়ে প্রায়ই ফোন করে। কবে ফিরবে তার উত্তর নেই প্রতিমার কাছে। 
সরকারি চাকরি করার সময় শান্তিনিকেতনে থাকতে হয়েছে। সেই সময় মা–‌মেয়ে ও ছেলের সঙ্গ কম পেতেন। বঙ্গবাসী কলেজ থেকে গ্র‌্যাজুয়েট, ক্যালকাটা গার্লস কলেজ থেকে প্রাইভেটে এমএ পাশ করেছেন। ট্রেনে বসেই পড়াশোনা করতে হয়েছে। সাংসদ তহবিলের অধিকাংশ টাকাই খরচ করে ফেলেছেন। বললেন, ‘‌আপনারা জানেন, জয়নগরে তফসিলি জাতি–উপজাতিদের বাস বেশি। আগে ওদের জন্য কেউ কিছু করেনি। ভাবেনি। গত পাঁচ বছরে পানীয় জলের সমস্যা মিটেছে। রাস্তাঘাট হয়েছে। স্যানিটেশন ন্যাপকিন নষ্ট করার আলাদা সেন্টার তৈরি করা হয়েছে। গেইল, হিন্দুস্থান পেট্রোলিয়াম অনেক সাহায্য করেছে। ঘরে ঘরে সৌর আলো চালু করার চিন্তাভাবনা চলছে। স্কুলে সংস্কার হয়েছে। পেট্রোলিয়াম ন্যাচারাল ওয়েলফেয়ার কমিটির সদস্য আমি। গর্ভবতী মহিলাদের সাহায্যে অনেক কাজ হয়েছে। ওয়াটার অ্যাম্বুল্যান্স তৈরি করার ইচ্ছে। কুলতলি, জয়নগর, গোসাবা, ক্যানিং,বাসন্তীতে গত পাঁচ বছরে বেশি কাজ হয়েছে। ২০২১–‌এর মধ্যে পাইপে সব এলাকায় জল পৌঁছবে। জামতলা, সোনাখালিতে বিদ্যুতের সাবস্টেশন করা হয়েছে। নিমপীঠ আশ্রম থেকেও মহারাজ সাহায্য করেছেন। অ্যাম্বুল্যান্স দেওয়া হয়েছে। পুতুল নাচের মাধ্যমে দরিদ্র ছেলেমেয়েদের মধ্যে শিক্ষার আলো আনতে চাইছি। ইতিমধ্যে ৬টি স্কুলে ৩০০ পড়ুয়াকে পুতুল নাচের মাধ্যমে পড়ানো হয়।’‌
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রতিমা এলাকায় ঘুরছেন। সঙ্গে এলাকার বিধায়কেরা। কর্মিসভা শেষ। রোদে তাঁর কোনও কষ্ট নেই। বললেন, ‘‌১০০ শতাংশ জিতব। মমতাদির উন্নয়নের ভিত্তিতেই ভোট হচ্ছে। আমার কাছে বিজেপি, এসইউসি কোনও ফ্যাক্টর নয়।’‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top