সুকমল শীল—দিনভর ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ্যেই চলল ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার ও কংক্রিটের চাঙড় সরানোর কাজ। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৬টায় অপারেশন শেষ করে এনডিআরএফ (‌‌জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা দল)‌‌। তাদের মোট ৫টি মঙ্গলবার সন্ধে সাড়ে ৬টা থেকে কাজ শুরু করে। এদিন ভোর সাড়ে ৫টা নাগাদ নিখোঁজ ঠিকাশ্রমিক গৌতম মণ্ডলের দেহ উদ্ধার করে এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এনডিআরএফের ডেপুটি কমান্ডান্ট স্বয়ংবর সিং ছেত্রি জানান, আর কোনও দেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে নেই। উদ্ধারে দেরি হওয়া প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, যেহেতু প্রথমে জেসিবি মেশিন ঢুকিয়ে কাজ করা সম্ভব হয়নি। তাই গ্যাসকাটার, ড্রিল দিয়ে ছোট ছোট কংক্রিটের টুকরো কেটে উদ্ধারের কাজ করা হয়েছে।  এই দেহটি ভারী বিমের নিচে থাকায় উদ্ধারে দেরি হয়েছে। এই দুই শ্রমিককে কী জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব ছিল?‌ উত্তরে তিনি জানান, কংক্রিটের বিমের তলায় দেহ পড়ে থাকায় সঙ্গে সঙ্গে দেহ থেঁতলে সম্ভবত তৎক্ষণাৎই মৃত্যু হয়েছে এই দু’‌জনের।
বৃহস্পতিবার দুপুর নাগাদ পূর্ত দপ্তরের এক প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থলে আসে। ঘটনাস্থল ঘুরে দেখার পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপের ছবি ও ভিডিও করেন তাঁরা। দুর্ঘটনার পর থেকে এখনও পর্যন্ত ঘটনাস্থল জুড়ে জোরদার পুলিসি তৎপরতা রয়েছে। পথচারী ও উৎসাহীদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। গার্ডরেল দিয়ে গোটা এলাকা ঘিরে রাখা হয়েছে। সেতুর সঙ্গে থাকা বৈদ্যুতিক ও গ্যাসের সংযোগ মঙ্গলবারই বন্ধ করে দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও এদিন সেতুর গায়ে থাকা গ্যাসের পাইপ কেটে ফেলার পর গলগল করে গ্যাস বেরোতে থাকে। সাদা ধোঁয়ার মতো গ্যাসে ধ্বংসস্তূপ কার্যত ঢেকে যায়। কর্মীরা জানান, ভয়ের কিছু নেই, ওই গ্যাস পাইপের ভেতরে থেকে গেছিল। তবুও সকলকে সতর্ক থাকতে বলা হয়। এদিন মূলত ভেঙেপড়া ব্রিজের অংশ ভাঙার কাজ চলছে। লোডার দিয়ে ট্রাক বোঝাই করা চলছে। ধ্বংসাবশেষ ফেলা হচ্ছে ধাপায়।  
এদিন বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন। ব্রিজ ভাঙার জন্য তাঁরা প্রাথমিকভাবে দায়ী করেছেন ব্রিজের বয়স ও  বারবার পিচের পরত পড়ে বাড়তি ওজনকে। ব্রিজের নিচে অস্থায়ী ছাউনিতে বসবাসকারীদের একজন জানিয়েছেন, মালবাহী ট্রেন গেলে ব্রিজটি অল্প কাঁপত। এদিন জেসিবি মেশিনে ধ্বংসস্তূপ সরানোর সময়ও ঘটনাস্থলের মাটি কাঁপছিল। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মেট্রোয় পাইলিংয়ের সময় হওয়া কম্পন ব্রিজকে কিছুটা দুর্বল করতে পারে। সেইসঙ্গে ভেঙেপড়া অংশের নিচের খালের জল ব্রিজের পিলারকে দুর্বল করে থাকতে পারে। সেতুর ভেঙে পড়া অংশের পেছনের দিকে এখনও রয়েছে একটি ভাতের হোটেল, চায়ের দোকান ও মেট্রো ঠিকাকর্মীদের অস্থায়ী ছাউনি। সেগুলি সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। কারণ, ভেঙেপড়া সেতুর পেছনের অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই সেই অংশ ভেঙে ফেলেই সেতুর কাজ শুরু হবে বলেই প্রাথমিক অনুমান। 
বিকেল ৫টা নাগাদ ফরেনসিক দল দুর্ঘটনাস্থলে আসে। ধ্বংসস্তূপ থেকে মাটি, কংক্রিটের টুকরো সংগ্রহ করে। ব্রিজ বিপর্যয়ের কারণ জানতে সেগুলি পরীক্ষা করে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
মঙ্গলবার থেকে উদ্ধারকারী দল, পুলিস ও অন্য কর্মীদের জন্য পানীয় জল, চা ও খাবারের ব্যবস্থা করে বেহালা গুরুদ্বার। ঘটনার খবর পেয়েই পানীয় জল, রুটি, ডাল, ভাত ইত্যাদি নিয়ে গুরুদ্বারের ৭০–৮০ জনের সদস্য চলে আসেন ঘটনাস্থলে। কলকাতা পুলিসের সহায়তায় আয়ারল্যান্ড কনস্যুলেটের দপ্তরে তৈরি হয় তাঁদের সেবাকেন্দ্র। শহরের যে কোনও বিপর্যয়ে তাঁরা দুর্গতদের সাহায্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন বলে দাবি করেন গুরুদ্বারের পক্ষে সৎমান সিং।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top