বিভাস ভট্টাচার্য: সুড়ঙ্গে জল ঢোকা আটকাতে চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছে গেল কলকাতা মেট্রো রেল কর্পোরেশন লিমিটেড (‌কেএমআরসিএল)‌। ইতিমধ্যেই ভেতরে যে বাঁধ তৈরি করা হয়েছে সেখানে জল ভর্তি করে বাড়ানো হচ্ছে জলের চাপ। আজ বৃহস্পতিবার ফের বৌবাজারে বিপর্যস্ত এলাকায় বাড়িগুলির অবস্থা খতিয়ে দেখতে সেখানে যাচ্ছেন কেএমআরসিএলের বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যরা। অন্যদিকে মঙ্গলবার রাতে মৃত্যু হয়েছে অঞ্জলি মল্লিক (‌৮৮)‌ এবং গণেশপ্রকাশ গুপ্তা (‌৮৬)‌ নামে স্যাকরাপাড়ার দুই বাসিন্দার। দু’‌জনেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তঁাদের পরিজনদের অভিযোগ, বাড়ি ছেড়ে আসার কারণে মানসিক কষ্টে ভুগছিলেন তঁারা। সেকারণেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। যদিও কেএমআরসিএলের তরফে এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে তঁাদের। 
বৃহস্পতিবার কেএমআরসিএলের চিফ ইঞ্জিনিয়ার বিশ্বনাথ দেওয়ানজি বলেন, ‘সুড়ঙ্গে জল ঢোকা আটকাতে বাড়ানো হয়েছে বঁাধের জলের চাপ। সেইসঙ্গে ‌মাটির ক্ষয় গত তিনদিন ধরে একেবারেই কমে এসেছে। শেষ চারদিন আমরা বৌবাজারে  কাউকে কোনও বাড়ি ছাড়ার নোটিস দিইনি। এখনও পর্যন্ত সেখানে ৭৮টি বাড়ি ফঁাকা করে ৬৮৮ জন বাসিন্দাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’‌ এক আধিকারিক জানিয়েছেন এলাকায় সব মিলিয়ে ৯টি বাড়ি ধসে গেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে আগামী দিনে আরও ১০টি বাড়ি ধসে পড়তে পারে। বুধবার ভোরের দিকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় একটি বাড়ির কিছুটা অংশ ধসে পড়ে। ওই বাড়িটি আগে থেকেই কিছুটা ভাঙা অবস্থায় ছিল। এদিন এবিষয়ে কেএমআরসিএলের আধিকারিকদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তঁারা জানিয়েছেন, নতুন করে বাড়ি ভেঙে পড়ার কোনও খবর তঁাদের জানা নেই। বাড়িগুলির অবস্থা খতিয়ে দেখতে ভূতত্ত্ববিদ এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ড.‌ নীতিন সোমের নেতৃত্বে যে বিশেষজ্ঞ কমিটি গড়া হয়েছে সেই কমিটির সদস্যরা আজ বৃহস্পতিবার বৌবাজারে যাবেন। সেখান থেকে ফিরে একটি বৈঠক করবেন তঁারা। 
এদিন অঞ্জলি মল্লিকের দেওরের ছেলে তপনকুমার মল্লিক জানিয়েছেন, গত ৭০ বছর ধরে স্যাকরাপাড়ার বাড়িতে থাকছিলেন তঁার জেঠিমা অঞ্জলিদেবী। বাড়ি ছাড়ার পর তাঁদেরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ধর্মতলার কাছে একটি হোটেলে। বার বার বাড়ির কথা বলতেন। মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছিলেন। হোটেলের খাবার সহ্য হচ্ছিল না। রবিবার অসুস্থ হলে অঞ্জলিদেবীকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই মঙ্গলবার মারা যান তিনি। বাড়ির প্রতি তঁার টানের জন্য বুধবার সৎকারের আগে অঞ্জলিদেবীর দেহ স্যাকরাপাড়ার মুখে নিয়ে যাওয়া হয়। 
একই কথা জানিয়েছেন মৃত গণেশপ্রকাশ গুপ্তার পুত্র কিশোরকুমার গুপ্তা। তিনি বলেন, স্যাকরাপাড়ার বাড়ি ছাড়ার পর তঁাদেরকে একটি অতিথিশালায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তঁার বাবা বারবার বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা বলতেন। এরপর অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মঙ্গলবার রাতে সেখানেই মারা যান গণেশপ্রকাশ। বাড়ির প্রতি বাবার টানের জন্য মঙ্গলবার গভীর রাতে বাবার দেহ নিয়ে স্যাকরাপাড়ার মুখে রাস্তার ওপর শববাহী শকটটি কিছুক্ষণ দঁাড় করিয়ে রাখেন। তঁার কথায়, ভেতরে তো ঢোকা যাবে না। তাই বাইরে থেকেই বাবার ইচ্ছা পূরণের চেষ্টা করলাম। 
কেএমআরসিএলের চিফ ইঞ্জিনিয়ার জানিয়েছেন, যে কোনও মৃত্যুই দুঃখের। যাঁরা মারা গেছেন তঁাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা কেএমআরসিএল করেছিল। যতটুকু জানি, স্বাভাবিক মৃত্যুই হয়েছে ওঁদের। আমাদের তরফেও হোটেলে আবাসিকদের কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গড়া হয়েছে। যারা বিভিন্ন হোটেলে গিয়ে দেখে আসছেন। চাই না কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ুক। তবে যাঁদেরকে স্থানান্তরিত করা হয়েছে আগামী দিনে যদি তঁাদের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েন, তবে তঁাদের চিকিৎসার ভারও কেএমআরসিএল নেবে।‌‌

বৌবাজারের স্যাকরাপাড়া লেনের ঘরছাড়া বাসিন্দা অঞ্জলি মল্লিকের দেহ এল পাড়ায়। রয়েছেন তাঁর আত্মীয়রা। বুধবার। ছবি:‌ অভিজিৎ মণ্ডল

জনপ্রিয়

Back To Top