শুভাশিস চট্টোপাধ্যায়: ‘এই নে তোর আগাম ভ্যালেন্টাইন গিফট’। এই বলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস যখন কলেজ–কন্যার হাতে তুলে দিল ছেলেটি তখন দুজনের চোখের ভাষা পড়ে মনে হল একটাই কথা, আসছে বছর আবার হবে। এদিকে জয় জয় দেবী চরাচর সারে, ওদিকে বসন্ত জাগ্রত দ্বারে। ভ্যালেন্টাইনের প্রাক্কালে সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্কে মাঘ শেষের বইমেলা আর ‘সরস্বত্যৈ নমো’ এবার যেন মোবাইলের ডুয়াল সিমের মতো—তাতা থৈথৈ, জমে দই-দই। সেলফি, গ্রুফি, ফুড কর্নার, আঙুলে আঙুল জড়িয়ে ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া, এসব না থাকলে কীসের বইমেলা। পৃথিবীর মানচিত্রে আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা একনম্বর আসন পাওয়া কী চাট্টিখানি কথা!‌ গিল্ডের তথ্য গেল বার ২২ লক্ষ মানুষ এসেছিলেন। বিক্রি হয়েছিল ২০ কোটি টাকার বই। এবার শনিবার পর্যন্ত ১৫ লক্ষ মানুষ এসেছেন। বিক্রি হয়েছে ১৪ কোটির বই। আমার সহকর্মী–বন্ধুরা তো ৪৩তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা নিয়ে গত ন’দিন ধরে  ইতিমধ্যেই যা–যা লেখার লিখে দিয়েছেন। সাইডলাইট ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। মোদ্দা কথা, থিম প্যাভেলিয়ন গুয়াতেমালা থেকে আজকাল–এর প্যাভেলিয়ন–সহ গোটা বইমেলার হালহকিকত কেমন সবটাই বলা হয়ে গেছে। 
রবিবার বলে কথা। থিকথিক করছে ভিড়। কী করি আজ ভেবে না পাই পথ হারিয়ে কোন স্টলে যাই, এককোণে দাঁড়িয়ে এইসব  ভাবছি, ঠিক তখনই সরস্বতীর সঙ্গে হঠাৎ দেখা। ভাবিইনি সম্ভব হবে কোনওদিন। আগে ওকে বহুবার দেখেছি বইপাড়ায় চটি ফ্যাটফ্যাটিয়ে পুরনো বইয়ের দোকানে বই ঝাড়তে, কফিহাউসে তর্কের টেবিলে, কালো–‌কফি আর সিগারেটের ধোঁায়ায়, জিন্‌স আর কুর্তিতে, আজ পরেছে সাদা সারারা আর কালো টপ। হালকা ডাবল চিন মুখখানি ঘিরে রেব্যান তুলেছে মাথায়। কেস খাওয়া চোখের নিচে ঘন–ঘাঁটা কাজল, গলায় দোল খাচ্ছে বটুয়ায় রাখা অ্যান্ড্রয়েড। উফ্‌ফ। মাইরি বলছি ঝক্কাস লাগছিল। খেয়াল করলাম ফ্রিতে জল, লিফলেট আর বাইবেল ছাড়া আর কিছুই নেই মেলায়। জানবেন ওইগুলোই মেলা ঘুরে আসার প্রমাণপত্র। বই কেনেননি সেটা ভিন্ন কথা। সবাই তো আর বই কিনতে যান না। কেউ নতুন বইয়ের গন্ধ নিতে যান, কেউ পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে হঠাৎ দেখার অপেক্ষায় থাকেন, কেউ ঠাকুর দেখার মতো ঘুরেঘুরে স্টলের কারুকাজ দেখেন, কারোর কাছে এটাই ভ্যালেন্টাইন স্পট। এককথায় মেলা মানে মাল্টিপারপাস মস্তি, সর্বঘট। তবে এবারও যেমন মেলা ভর্তি ‘রঙিন ফুল’ তেমনই জাগ্রত পকেটমাররা। মাইকে ঘোষণা শুনে উপযুক্ত প্রমাণ নিয়ে ডেবিট কার্ড নিতে ছুটছেন খাঁ–খাঁ পকেটের মানুষজন। 
‌একে রবিবার তাই অনুষ্ঠান, সভায় মেলা জমজমাট। এসবিআই মিলনায়তনে এদিন বইমেলায় ছিল বাংলাদেশ দিবস। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বাংলা সাহিত্য ও বঙ্গবন্ধু‌’। ছিলেন বাংলাদেশের সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, বিশিষ্ট সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, কলকাতায় বাংলাদেশের উপরাষ্ট্রদূত তৌফিক হাসান, গিল্ড সম্পাদক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়, বাংলাদেশের সাংসদ অসীমকুমার উকিল, সে দেশের সংস্কৃতি মন্ত্রকের প্রাক্তন সচিব বেগম আকতারি মমতাজ, বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রকের সচিব ড.‌ মোহম্মদ আবু হেনা মোস্তাফা কামাল, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী প্রমুখ।‌ ‌‌অন্য একটি অনুষ্ঠানে প্রেস কর্নারে ‘টাইমলি অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্ট’ শীর্ষক আলোচনাসভায় অংশ নেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, সর্দার আমজাদ আলি প্রমুখ। এদিন বাংলাদেশের অভিনেতা আরেফিন শুভকে নিয়ে ভরদুপুরে আজকাল–এর স্টলে ঘুরে যান ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। ‌লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নে প্রকাশিত হল ফারুক আহমেদ সম্পাদিত বইমেলা ২০১৯ সংখ্যা ‘উদার আকাশ’। বিষয় প্রান্তিক সমাজ।‌ গিল্ডের পক্ষ থেকে সংগ্রামপুরের সপ্তগ্রাম হাই স্কুলের স্কুলশিক্ষিকা বাণী দাসের হাতে এদিন বিকেলে তুলে দেওয়া হল বই–লটারির তিন নম্বর পুরস্কারটি। 
মেলা ছেড়ে যখন বেরিয়ে আসছি তখন ভরসন্ধে, মাইকে বাজছে গান ‘আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাব। মেলামাঠের ভেতরে ও বাইরে তখন জনস্রোত।‌

জনপ্রিয়

Back To Top