আজকালের প্রতিবেদন: বৃহস্পতিবার যাদবপুরে এবিভিপির একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তুলকালাম ঘটনা ঘটল। বিশ্ববিদ্যালয় অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। কেন্দ্রিয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়কে প্রায় ৪ ঘন্টা ঘেরাও করে রাখলেন পড়ুয়াদের একাংশ। রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় চলে আসেন। তাঁকেও আটকে দেওয়া হয়।  রাত ৮টায় পারদর্শিতার সঙ্গে দুজনকেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে নেয় পুলিস। পড়ুয়াদের সঙ্গে কোনওরকম সংঘাত ছাড়াই পুলিস বিচক্ষনতার সঙ্গে এই কাজ করতে সক্ষম হয়। 
 বিক্ষোভকারী পড়ুয়াদের মধ্যে নকশালপন্থী এবং এসএফআই সমর্থিতরাও ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে প্রায় ৪ ঘন্টা কেন্দ্রিয় মন্ত্রীকে ঘিরে তুমুল বিক্ষোভ হয়। এই বিক্ষোভের গোড়াতেই উপাচার্য সুরঞ্জন দাস এবং সহ উপাচার্য প্রবীন কুমার ঘোষ ‘‌অসুস্থ’‌ হয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কেন্দ্রিয় মন্ত্রীকে পড়ুয়ারা আটকে রেখেছেন এই খবর পেয়ে রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় রাজভবন থেকে নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন। তিনি পুলিস বেষ্টিত হয়ে মন্ত্রীর কাছে পৌঁছান। তাঁকে নিয়ে গিয়ে নিজের গাড়িতে বসান। তখন পড়ুয়ারা গাড়ির সামনে বসে পড়েন। সেইসময়ে অন্য গেট দিয়ে এভিবিপির সমর্থকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে ঢুকে এসএফআইয়ের ইউনিয়নরুম ভাঙচুর করেন। বাইরে রাস্তার ওপরেও আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। রাত ৮টা বেজে ১০ মিনিটে হঠাৎই  বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩নম্বর গেট দিয়ে রাজ্যপালের। কনভয়কে পুলিস বের করে দেয়। বিক্ষোভকারীরা বসে থাকেন ৪ নম্বর গেটেই। তাঁরা পুলিসের এই পরিকল্পনা বুঝতেও পারেনি। দক্ষতার সঙ্গে পুলিস রাজ্যপাল, কেন্দ্রিয়েমন্ত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে নিয়ে যায়। 
ঘটনা শুরু বিকেলবেলা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবর্ষে ভর্তি হওয়া পড়ুয়াদের সংবর্ধনা দেওয়ার কর্মসূচী ছিল বিজেপি ছাত্র সংগঠন এবিভিপি। অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় কেপিবসু মেমোরিয়াল হলে। এই অনুষ্ঠানে স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের শাসনব্যবস্থা বিষয়ে একটি আলোচনাচক্রেরও আয়োজন ছিল। প্রধান অতিথি ছিলেন কেন্দ্রিয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়। এবিভিপির তরফ থেকে বুধবারই জানানো হয়েছিল, বাবুল সেখানে একজন শিল্পী হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। অতিথি ছিলেন বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্রা পালও। বিকেলে বাবুল সুপ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঢোকার পরই ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। তাঁদের দাবি ছিল, কেন্দ্রিয় মন্ত্রীকে অনুষ্ঠানে যেতে পারবেন না। মন্ত্রীর নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙেই বিক্ষোভকারীরা মন্ত্রীর কাছাকাছি চলে যায়। শুরু হয় তুমুল ধ্বস্তাধ্বস্তি। কেন্দ্রিয় মন্ত্রীর অভিযোগ এইসময়ে পড়ুয়ারা তাঁকে নানাভাবে হেনস্থা করেছেন। চড়–থাপ্পর মেরেছেন। খামচে দিয়েছেন। জামা ছিঁড়ে দিয়েছেন। এবং তাঁকে ধাক্কা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা হয়। অন্যদিকে পড়ুয়াদের অভিযোগ কেন্দ্রিয় মন্ত্রী তাঁদের কটুকথা বলেছেন, ছাত্রীদের অপমান করেছেন, অ্যারেস্ট করবার হুমকি দিয়েছেন। ধ্বস্তাধস্তি এমন পর্যায়ে যায়, যে একসময় কেন্দ্রিয় মন্ত্রীর অস্ত্র থেকে বুলেট ভর্তি ম্যাগাজিন পড়ে যায়। মন্ত্রী নিজেও হুমড়ি খেয়ে পড়েন। একসময় মন্ত্রীকে পড়ুয়াদের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘‌তোমাদের নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তোমার সম্মান বজায় রাখ। গায়ে হাত দিচ্ছ কেন !‌ গায়ে হাত দেবে না।’‌ পড়ুয়াদের মধ্যে থেকে কেউ একজন বলে ওঠেন, ‘‌আমি এসএফআই করিনা।’‌ মন্ত্রী জিজ্ঞেস করেন, ‘‌তাহলে তোমরা কী কর?‌’‌ পড়ুয়াদের কাছ থেকে উত্তর ভেসে আসে,‘‌ নকশাল করি। আমরা সব করতে পারি।’‌ উত্তেজনা চরম ছড়াতে থাকে। মন্ত্রীকে ঘিরে পড়ুয়ারা ভিড় করতে থাকেন। ধস্তাধস্তি শুরু হয় নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে। ‘‌গো ব্যাক’‌ স্লোগান ওঠে। এর মাঝখানেই উপাচার্য আসেন পরিস্থিতি শান্ত করতে। বিক্ষোভরত পড়ুয়াদের শান্ত করা যায় না। তিনি মন্ত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলেও যেতে অনুরোধ করেন বলে মন্ত্রীর তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে মন্ত্রী যাবেন না বলে জানান।তবে মন্ত্রী যাবেন না বলে জানান। এইসময়ে অতীতের বেশ কয়েকটি ঘটনার মতো উপাচার্য আবার এদিনও অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি সাংবাদিকদের বলতে থাকেন, পুলিশ ডাকব না। দরকার হলে পদত্যাগ করব। এরপরই তিনি হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেন। 
অনুষ্ঠানের পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বেরিয়ে এলে সিআরপিএফ তাঁকে নিয়ে বাইরে যাবার গেটের দিকে এগোতে থাকে। আবার পড়ুয়ারা ঘিরে ধরেন। তুমুল বিক্ষোভ চলতে থাকে। পড়ুয়াদের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়ার দাবি ওঠে। দেখা যায় মন্ত্রী কোনও পড়ুয়াকে বলছেন, ‘‌তোমাকে টিসি দেওয়া উচিত। আইনি পথেই তোমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি। তিনদিনও সময় লাগবে না। পার্লামেন্ট জ্বালিয়ে দেব বলে দেশদ্রোহিতার কাজ করছ।’‌ উত্তেজনা বেড়ে যায়। মন্ত্রী সংবাদ মাধ্যমের ওবি ভ্যানের বনেটে উঠে বসেন। বিক্ষোভ চলতে থাকে। 
এদিকে তখন বাইরে প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। রাজভবন থেকে রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় বিবৃতি দেন, আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। মুখ্যসচিব মলয় দে–‌‌র সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে উদ্ধার করতে বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেননি বলেই পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তিনি মুখ্যসচিবের সঙ্গেও কথা বলেন। এর কিছুক্ষণ পরেই তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় উদ্দেশে রওনা দেন। সেখানে পৌঁছে, গাড়ি থেকে নেমে, পুলিশ বেষ্টিত হয়ে সোজা চলে যান বাবুল সুপ্রিয়র কাছে। পুলিশ ঘিরে থাকে তাঁকে। কার্যত এই সুযোগেই পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে। সাধারণভাবে উপাচার্য না চাইলে পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢোকে না। রাজ্যপালের নিরাপত্তাকে সামনে রেখে পুলিশ এবার ঢুকে যায়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও ওবি ভ্যানের বনেট থেকে নেমে পুলিশ বেষ্টনীতে ঢুকে পড়েন। রাজ্যপাল তাঁকে নিয়ে এসে নিজের গাড়িতে ঢুকে পড়েন। এবার বিক্ষোভকারী পড়ুয়ারা গাড়ির সামনে বসে পড়েন। তাঁদের দাবি, মন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে হবে। তবেই ছাড়া হবে। তাঁরা লিখিতভাবে এই দাবির কথা রাজ্যপালের গাড়ির ভিতরে পৌঁছেও দেন। পুলিশ অফিসাররা বিক্ষোভকারীদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। এদিকে তখন ৪ নম্বর গেট দিয়ে বাইরে থেকে এবিভিপি সমর্থকরা লাঠি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢুকে পড়ে। এসএফআই–এর ইউনিয়ন রুম ভাঙচুর করা হয়। আলো–পাখা, কম্পিউটার, ক্যারম বোর্ড, ফল্‌স সিলিং, সাইকেল পিটিয়ে ভেঙে ফেলা হয়। গেটের বাইরে বাঁশ, কাঠ, টায়ার, সাইনবোর্ডে আগুন লাগিয়ে পথ অবরোধ করা হয়। 
এইসময়ে নাটকীয় ঘটনা ঘটে ৩ নম্বর গেটে। 
পুলিশ অফিসার গাড়ির সামনে বসে থাকা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলতে থাকেন, আর সেই ফাঁকে রাজ্যপালের গাড়িটি নিমেষের মধ্যে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে নেওয়া হয়। বিক্ষোভকারীরা কিছু বোঝার আগেই পুলিশ রাজ্যপালের গাড়ি ৪ নম্বর গেট দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে বের করে দেয়। অনেকেই আশঙ্কা করছিল, রাজ্যপাল এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে নিরাপদে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বের করতে পুলিশকে হয়তো লাঠি চালাতে হবে, জোর জবরদস্তি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় রণক্ষেত্র হয়ে উঠবে। কিন্তু পুলিশের বিচক্ষণতায় কোনওরকম সঙ্ঘর্ষ ছাড়াই দুজন বেরিয়ে আসেন। 
এদিকে রাজ্যের মন্ত্রী তাপস রায় বলেছেন,‌ যাদবপুরে এবিভিপি ছাত্ররা যে তাণ্ডব করল, তার তীব্র নিন্দা করছি। একজন প্রাক্তন ছাত্রনেতা হিসেবে বলতে পারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই জঘন্যতম কাজ কোনওমতেই বরদাস্ত করা যায় না। একজন মন্ত্রীকে যেভাবে হেনস্থা করা হয়েছে, তা সমর্থনযোগ্য নয়। কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্র বলেছেন, যাদবপুরের ঘটনা সমর্থন করছি না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেভাবে ভাঙচুর করা হয়েছে, তা মেনে নেওয়া যায় না।‌ 
সিপিএম নেতা, যাদবপুরের বিধায়ক সুজন চক্রবর্তী এদিন বলেন, ছাত্ররা কালো পতাকা দেখাতে পারেন। কিন্তু গায়ে হাত তোলাকে সমর্থন করি না। প্রতিবাদের একটা ধরন আছে।  তিনি বলেন, ‘‌দিলীপবাবুরা যখন গিয়েছিলেন যাদবপুর দখল করতে তখন ছাত্ররা প্রতিহত করেছিলেন। সেই স্পিরিট সমর্থনযোগ্য। একজন একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন, কালো পতাকা দেখানো যেত। কিন্তু গায়ে হাত দিয়ে হেনস্থা করলে তাঁকেই সুবিধা করে দেওয়া হয়। এমন আচরণ সমর্থনযোগ্য নয়। এসএফআই রাজ্য সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য বলেন, আমাদের ঘোষিত অবস্থানই ছিল, নীতিগতভাবে বিজেপি বা এবিভিপি–‌র বিরোধিতা করবই। তবে একজন মন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও অনুষ্ঠানে আসতেই পারেন। মন্ত্রীকে হেনস্থার যে ঘটনা ঘটেছে তাতে এসএফআই–‌এর কেউ ছিল না। তবে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে উস্‌কানি, শাসানি দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে গেলেন। এরপর যা হল তা নিন্দার ভাষা নেই। বাইরে থেকে এবিভিপি–‌র ছেলেরা ঢুকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাঙচুর চালাল। আমাদের ইউনিয়ন অফিস ভাঙচুর করল। হঠকারী কোনও কিছুতে এসএফআই জড়িত নয়। তবে এবিভিপি–‌র এই গুন্ডামির বিরুদ্ধে এসএফআই–‌এর ছেলেমেয়েরা প্রতিবাদ করবে।

 

ছাত্রদের বিক্ষোভের মুখে বাবুল সুপ্রিয়। তঁাকে বোঝানোর চেষ্টা উপাচার্য সুরঞ্জন দাসের।বৃহস্পতিবার, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছবি: বিজয় সেনগুপ্ত

জনপ্রিয়

Back To Top