আজকালের প্রতিবেদন- এটিএম প্রতারণা করে পর্যটক সেজে দিল্লিতে বাড়ি ভাড়া নিয়ে ভালই ছিল রোমানীয় প্রতারক। সোমবার টাকা তুলতে যাওয়ার পথে একেবারে নাটকীয় কায়দায় ধাওয়া করে তাকে ধরে ফেলল কলকাতা পুলিশ। কলকাতায় পরপর এটিএম প্রতারণা করে পালিয়েছিল রোমানীয় নাগরিক সিলিভিউ ফ্লোরিন স্পিরিডন। ২৮ বছর বয়সি এই যুবকের বাড়ি রোমানিয়ার কনস্ট্যান্টায়। টাকা প্রতারণার সঙ্গেই শখ ছিল, নানা ধরনের রঙিন টুপি পরা। সেইসঙ্গে ঝকমকে সানগ্লাস। সিলিভিউয়ের ঝকঝকে গায়ের রং, কেতাদুরস্ত পোশাক। ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে সে এদেশে এসেছে তৃতীয় বার। এমন পর্যটককে খুঁজে বার করতে কলকাতা পুলিশের বিশেষ দল দিল্লি গিয়ে পড়েছিল। প্রায় ২০০ রোমানীয় নাগরিকের সঙ্গে কথা বলে অবশেষে সিসি টিভি ফুটেজে পাওয়া মুখের সঙ্গে মুখ মিলিয়ে সিলিভিউকে ধরল পুলিশ।
সিলিভিউ সোমবার দুপুরে রোদচশমা, টুপি পরে এটিএম কাউন্টারে যাচ্ছিল টাকা তুলতে। পুলিশ পিছু নিয়েছে বুঝতে পেরেই সে দিল্লির গ্রেটার কৈলাস এলাকার নানা গলি ধরে ছুটতে থাকে। পুলিশ তার পিছু নেয়। শেষে অটোয় চেপে ধাওয়া করে প্রতারক পর্যটককে ধরা হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে বহু স্কিমিং ডিভাইস, ম্যাগনেটিক চিপস, ব্যাটারি, পিনহোল ক্যামেরা চিপ। এ ছাড়াও পাওয়া গেছে অন্যান্য জিনিসপত্র। এর অন্য দুই সহযোগীর সন্ধান চলছে। তাদেরও খুব শিগগিরই ধরা যাবে বলে পুলিশ আশাবাদী।
কলকাতা পুলিশের যুগ্ম নগরপাল (‌অপরাধ দমন)‌ মুরলীধর শর্মা জানান, ‘‌অভিবাসন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০ মার্চ, ১৯ জুলাই এবং ১৪ অক্টোবর এরা এদেশে ঢুকেছে।’‌ তদন্তে পুলিশ বিমানের ক্রু মেম্বারদের কার্ড পেয়েছে। এই কার্ড তাদের হাতে কী করে গেল, তাও একটি বড় প্রশ্ন। মিলিছে ২৪টি টুপি। কয়েকটি ল্যাপটপ, সানগ্লাস, ফেভিবন্ড, বিভিন্ন মডেলের কাঁচি ও ফরসেপ, স্ক্রু ড্রাইভার, টর্চ। সিলিভিউ গ্রেটার কৈলাসে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে। ফ্ল্যাট নম্বর ই–‌২৪৭। এর দু’‌জন সঙ্গী অবশ্য পলাতক। সবই ঠিক ছিল, কিন্তু বিভিন্ন এটিএম থেকে ঘন ঘন টাকা তুলতে গিয়েই কাল হল।
সোমবার সকাল থেকে নাটকীয় ঘটনাই ঘটল দিল্লির গ্রেটার কৈলাসে। এহেন ধনী পর্যটক সকাল ৮টা নাগাদ টাকা তুলতে যায়। তখনই চতুর সিলিভিয়ার নজর পড়ে গোয়েন্দাদের দিকে। সে লক্ষ করে, এটিএমের বাইরে থাকা কয়েকজন লোক তার গতিবিধি মোবাইলে তুলছে। সাদা পোশাকের গোয়েন্দাদের দেখে সে বুঝতে পারে, তার জন্য গ্রেটার কৈলাসে ফাঁদ পাতা রয়েছে। এবার জ্যাকেট পরা, চশমা পরা, মাথায় টুপি দেওয়া রোমানীয় নাগরিকটি পাগলের মতো ছুটতে শুরু করে। বেশ কিছুটা গলির ভেতর দৌড়ে বড় রাস্তায় এসে সে অটোতে উঠে পড়ে। পুলিশও অন্য একটি অটোতে ওঠে।
দ্বিতীয় দৃশ্য, পর্যটকের অটো ছুটতে শুরু করেছে, পেছনে পুলিশের অটো। এমন কী ঘটেছে, ভাবার আগেই পুলিশের অটো গিয়ে রোমানীয় পর্যটকের অটোর সামনে দাঁড়ায়। ধরার চেষ্টা হয় তাকে। অটো থেকে সে নেমে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। এরপর ধরা পড়ে।
জানা গেছে, দিল্লিতে চলতি মাসেই এই দলটি এটিএম প্রতারণা করে। ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার একটি এটিএম কাউন্টার থেকে সিলিভিয়ার মুখের ছবি চলে আসে। এরা এদেশে এসে মাসখানেকের জন্য থাকে। তারপর প্রতারণা করে পালায়। দামি দামি ঘর ভাড়া নেয়। যাতে সাধারণ মানুষের মনে হয়, এরা খুবই ধনী পর্যটক।
কলকাতা পুলিশের এক কর্তা বলেন, সবই ঠিকঠাক হচ্ছিল। কিন্তু একটাই ভুল করে এই রোমানীয়। আগের মোডাস অপারেন্ডি ছিল অন্য রকম। যখন যে জায়গায় থাকত, তখন তার আশপাশের কাউন্টার থেকেই টাকা তুলত। কিন্তু এবার একটু দূরের কাউন্টারে এসে টাকা তোলার চেষ্টা করে। কিছু টাকাও পাওয়া গেছে এদের কাছ থেকে। সিলিভিউকে আগেও দেখা গিয়েছে টাকা তুলতে। দিল্লিতে প্রথমে এসে, তারপর কলকাতায় আসে এই দলটি।
কলকাতা থেকে অপারেশন চালিয়ে তথ্য নিয়ে এবার দিল্লিতে বসেই প্রতারণা করছিল। পুলিশ জানার চেষ্টা করছে, এরা কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করত। সিলিভিউ এটিএম প্রতারণার একজন বড় বিশেষজ্ঞ বলেই মনে করছে পুলিশ। গত কয়েক দিন আগে কলকাতার ৫টি থানা এলাকা থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয় এরা। বিভিন্ন সূত্রে এবং একই কাণ্ডে গ্রেপ্তার হওয়া আর এক রোমানীয়কে জেরা করেই অবশেষে কলকাতা পুলিশের ‘‌ব্রেক থ্রু’‌। আজ, মঙ্গলবার ধৃতকে কলকাতায় আনা হবে।‌‌

সিলিভিউ ফ্লোরিন স্পিরিডন।‌

জনপ্রিয়

Back To Top