মারুফ হোসেন

কারা যেন কালরাত্রে এসে
আমার এ প্রদীপের সলতে গেছে কেটে.‌.‌.‌
কী করে জানাই তবে আমন্ত্রণ আলোর উদ্দেশে?
(কাব্যগ্রন্থ ‘‌আলো আরো আলো’‌)

কবি, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক ভাবুক অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ছিলেন আমার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অভিভাবক। শুধু আমার সঙ্গেই নয়, অলোকদা যে–‌কোনও মানুষকে মুহূর্তে আপন করে নিতে পারতেন— তা সে চুঁচুড়া বইমেলায় গিয়ে প্রথম–‌আলাপিত এক পাঠকই হোক বা খড়্গপুরে এক রাত কাটানো হোটেলের রুম সার্ভিসের ছেলেটিই হোক। অলোকদার জাদুকথায় মোহিত হয়ে উঠতে দেখেছি যে–‌কোনও সভায় উপস্থিত হাজার হাজার মানুষকে। এক সময় বারাসতের একটি টেলিফোন বুথ থেকে অলোকদাকে নিয়মিত ফ্যাক্স–‌চিঠি পাঠাতাম। অলোকদা তার প্রত্যুত্তর করতেন। সেই বুথের কর্ণধার বরুণদার সঙ্গেও অলোকদা প্রতিটি ফ্যাক্স পাঠাবার আগে জার্মানি থেকে ফোন করে কুশল বিনিময় করতেন। কলকাতায় এলে যখন ফ্যাক্স পাঠাবার প্রয়োজন হত না, তখন আলাদা করে তাঁকে ফোন করতেন। অলোকদার যাদবপুরের ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে রাতে–‌দিনে যখনই বার হয়েছি, বার বার করে বলতেন, বাড়ি ফিরে যেন অবশ্যই তাঁকে ফোন করি, যত রাতই হোক। কোনও দিন হয়তো বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হওয়ায় তাঁর ঘুমের অসুবিধে হবে ভেবে ফোন করিনি। তখন তিনিই রাতে ফোন করে জেনে নিতেন ঠিকঠাক বাড়ি ফিরেছি কি না।
মনে পড়ে যাচ্ছে ২০১২ সালের একটা ঘটনার কথা। একটি বিষয়ে অলোকদা আমাকে একটু ভুল বোঝেন। আরও সহজ করে বললে, একজন ব্যক্তি অলোকদাকে আমার সম্পর্কে ভুল বোঝান। একটা দূরত্ব তৈরি হয় আমার সঙ্গে অলোকদার। সেই দূরত্ব আসলে অভিমানের। আমার বিশ্বাস, ভুল যদি আমি না করে থাকি, তা হলে অলোকদা নিশ্চয়ই সে–‌কথা বুঝবেন। সেটা না হয়ে অন্য আর–‌একজনের কথা গুরুত্ব পাওয়ায় আমার অভিমান হয়। অলোকদার সঙ্গে ফোনে কথা হয়, কিন্তু কোথাও একটা দূরত্ব যেন থেকে যায়। এবং আমাকে অবাক করে, প্রায় মাস ছয়েক বাদে অলোকদা একদিন বলেন, অন্য ব্যক্তির কথা বিশ্বাস করাটা তাঁর ভুল হয়েছিল। এত বড় একজন মানুষের আমার মতো একজন তুচ্ছ মানুষের কাছে নির্দ্বিধায় এই ভুল স্বীকারে আমি মাটিতে মিশে যাচ্ছিলাম। আর এর ফলে পরবর্তীতে আমার কাছে অলোকদার সিংহাসন ঠিক ততটাই রত্নখচিত হয়ে উঠেছিল।
২০০৮ সালের মার্চে এক শেষ–‌হয়ে–‌আসা শীতের ‌বিকেলে একটি বইয়ের প্রস্তাব নিয়ে কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ। সঙ্গে ছিলেন কবি সুবীর মণ্ডল। অলোকরঞ্জনকে প্রণাম করতেই তিনি বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরেছিলেন আমাকে। তাঁর সেই বুকের ওম আমার জন্য রাখা ছিল আমৃত্যু। আমার ব্যক্তিগত সকল খোঁজখবর থেকে শুরু করে, আমার প্রকাশনার কী কী বই বার হবে, এ–‌সবই ছিল তাঁর কৌতূহলের বিষয়। এমনকী সমসময়ের রাজ্য, দেশ, বাংলাদেশ, সাহিত্য, কবি, কবিতা, রাজনীতি— সমস্ত বিষয়েই তিনি জানতে চাইতেন যখনই কথা হত। কোনও পরাজয়ের খবর, দুঃখের খবর তাঁকে কষ্ট দিত বুঝতাম, কিন্তু তাঁকে ভেঙে পড়তে দেখিনি। মুহূর্তেই নতুন স্বপ্নে আশ্বস্ত করতেন আমাকে। আমাদের সকল শুভ চিন্তার যৌথ শক্তিতে বিশ্বাস করতেন। বলতেন, এখনও অনেক কাজ বাকি, আমাদের এক সঙ্গে সেই সব কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
আবার এই মানুষটিকেই দেখেছি, বার বার আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, তাঁর আগামী বইটি আমি ছাপব কি না। তাঁর মতো একজন কবির প্রকাশকের অভাব তো নয়, বরং সে–‌অর্থে বললে, তাঁর বই করতে–‌চাওয়া প্রকাশকের তালিকা দীর্ঘ। কিন্তু তাঁর এই প্রশ্নের উত্তরে আমি যত বার বলতাম আমরা যদি বছরে একটি বইও ছাপি তা হলে সেটি হবে আপনার বই, তিনি সদ্য–‌কবিতা–‌লেখা তরুণের মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতেন। আসলে বোধ হয় তাঁর বুকের ভেতর বাস করত এক কিশোর। দুষ্টু। সরল। আবেগী। মাঝে মাঝে তাঁর দুষ্টুমির নিদর্শন আমরা উপভোগ করতাম যাদবপুরের ফ্ল্যাটবাড়িতে। আড্ডায় হাজির কাউকে কাউকে এমন দুষ্টুমি–‌মেশানো কথা বলতেন, তা চুপ করে শোনা ছাড়া উত্তর করার মতো ক্ষমতা থাকত না। যেদিন যার উদ্দেশে এই সব অলোক–‌বাণী বর্ষিত হত, তিনি জানতেন যে একটু বাদেই অলোকদার আরও অনেক–‌অনেক বেশি ভালবাসা তিনি পাবেন। হয়তো কোনও পাঠকের আনা গোলাপের পাপড়ি তুলে দেওয়া হবে তাঁর হাতে বা কোনও খাবারের অতিরিক্ত অংশ। অলোকদার সঙ্গে প্রতিটি সঙ্গ–‌মুহূর্ত হয়ে উঠত আনন্দময়। কোনও উদ্দেশ্য বা বিষয় ছাড়াই কথায় কথায় কেটে যেত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আর সেই সব কথার ভেতর দিয়ে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ত জার্মানি থেকে শান্তিনিকেতন, রিখিয়ার হাট থেকে ইতালির রাস্তায়, আফ্রিকার মিথ থেকে বাংলাদেশের সাহিত্যে।
একবার খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য অলোকদা কলকাতায় এসেছেন, দেখা হয়েছে আমাদের। বললেন, হাতে খুব সময় কম, কিছু ইউরো ভাঙিয়ে দিতে হবে। হঠাৎ ইউরো ভাঙাতে হবে, ভাবলাম ব্যক্তিগত কোনও টাকার প্রয়োজন। বললাম, দাদা নিঃসঙ্কোচে আপনার যত টাকা প্রয়োজন, বলুন, ব্যবস্থা করব। উনি যত বার বলেন, না, এটা তাঁর ব্যক্তিগত প্রয়োজন নয়, আমি তত বার চেপে ধরি। শেষে উপা‌য়ান্তর না দেখে তিনি সঙ্কোচের সঙ্গে জানালেন, এই টাকাটা তিনি একটি অনাথ বাচ্চাদের সেন্টারে প্রতি বছর দিয়ে থাকেন, সে–‌বছর সময়ের অভাবে ভাঙানো হয়নি, কিন্তু পরের দিন তারা আসবে, তাই বাধ্যত আমাকে বলা। এই ভাবে গোপনে সহায়তা প্রদান, সে তো একমাত্র মহামানবেরাই পারেন। আমার সৌভাগ্য, অলোকদার মতো একজন মহামানবের সংস্পর্শে আমি কিছুক্ষণ থাকতে পেরেছি। যা আমার সারা জীবনের সঞ্চয়।
‘‌না, এখন থেকে প্রকাশ্য কোনো আলোচনাচক্রে যোগ দিতে আমি যাব না আর।... ধরিত্রী আমার ভঙ্গুর ভ্রূযুগল সন্ধিক্ষণে তার বরণডালা ছুঁইয়ে দিয়ে এক লহমা তাকাতেই আমার শিরা–‌উপশিরায় বেজে উঠল আমার সমগ্র বাঁচার সজল পিছুটান।’‌ (কাব্যগ্রন্থ 
‘‌বাস্তুহারার পাহাড়তলি’‌)

(‌লেখক ‘‌অভিযান’‌ প্রকাশনীর কর্ণধার)‌

জনপ্রিয়

Back To Top