আজকালের প্রতিবেদন: গুপ্তধনের সিন্দুকে থাকে মণিমুক্তো–জহরত। সংস্কৃত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাব্দী প্রাচীন সিন্দুক থেকে মণিমুক্তোর থেকেও মিলল বেশি মূল্যবান জিনিস। পাওয়া গেল বাংলার নবজাগরণের ইতিহাস। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সুকীর্তির উজ্জ্বল নথি। 
শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের গুদাম ঘর থেকে উদ্ধার হয় প্রাচীন একটি সিন্দুক। সেই সিন্দুক থেকে মিলল নানা মূল্যবান নথি, তিনটি রুপোর পদক, গালা দিয়ে সিল করা সাতটি খাম, যার ওপরে লেখা ১৮৩০ থেকে ১৮৫৬ পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সম্পত্তির হিসেব। মূল্যবান নথিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল বিধবাদের জন্য বিদ্যাসাগরের তৈরি, ‘‌মুক্তকেশীদেবী বিধবা ফান্ড‌।’‌ এছাড়াও একটি দেওয়াল সিন্দুক থেকে মিলেছে ৮৫টি পাসবই। এই সিন্দুক থেকে না হলেও সেই সময়ের সংস্কৃত কলেজের একটি হাজিরা খাতারও খোঁজ মিলেছে। যাতে ১৮২৯ থেকে ১৮৩২ সালের উল্লেখ রয়েছে। হাজিরা খাতায় নাম রয়েছে বিদ্যাসাগরের। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৮২৯ সালে সংস্কৃত কলেজে ব্যাকরণের তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। ১৯৩১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর কলেজের পক্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে মহামহোপাধ্যায় সম্মান জানানো হয়। তার নথিও মিলেছে। 
বিধবা বিবাহ চালু করেছিলেন বিদ্যাসাগর। কিন্ত সেখানেই থেমে থাকেননি তিনি। বিধবাদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন। তারই প্রমাণ মিলেছে এদিন উদ্ধার হওয়া সিন্দুকের নথি থেকে। মুক্তকেশী দেবীর নামে বিধবাদের সেই তহবিল থেকে কতজন মহিলা সেই সময় সাহায্য পেতেন তার উল্লেখ রয়েছে। নথিটিতে বর্ধমান জেলার শ্রীধরপুর নামে একটি জায়গা এবং মুর্শিদাবাদ জেলার উল্লেখ রয়েছে। নথিটিতে ১৯৫৬ সালের উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ তহবিলটি যে দীর্ঘদিন চালু ছিল তারই প্রমাণ বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। উদ্ধার হওয়া নথিতে ৮ জন মহিলার নাম রয়েছে। ৬ জনের টিপ সই।  বাকি দুজন সুমনাবালাদেবী এবং পতিতপাবনীদেবী সই করে ভাতা নিতেন, তার উল্লেখ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সোমা ব্যানার্জি বলেন, ‘‌এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে, ওই সময় সংস্কৃত কলেজে শুধু পড়াশোনাই হত না, কলেজটি সামাজিক কর্মকাণ্ডের পীঠস্থান ছিল। সমাজ সংস্কারের কাজকর্মও চলত। একাজে বিদ্যাসাগরের অবদান ভোলার নয়। যে নথি উদ্ধার হয়েছে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অসীম। মণিমাণিক্যের থেকেও হয়তো দামি। উদ্ধার হওয়া নথি বিদ্যাসাগরকে নিয়ে আরও গবেষণায় অনুপ্রেরণা দেবে। সংগ্রহশালা গড়ে সব নথি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।’‌ 
আরও বেশ কিছু সম্পত্তির হিসেব সংক্রান্ত মূল্যবান নথিও মিলেছে। মিলেছে সাতটি মুখবন্ধ খাম। যা বিশেষজ্ঞদের সামনে পরে খোলা হবে বলে জানিয়েছেন উপাচার্য। শ্রী এ ভেঙ্কটরমন শাস্ত্রীর নামে ১৯৪৬ সালে অর্থ জমার কাগজপত্র পাওয়া গিয়েছে। এছাড়াও পাওয়া গিয়েছে তিনটি রুপোর মেডেল। দুটি গঙ্গামণিদেবীর নামে, একটি এ এন মুখার্জি বলে একজনের নামে। গঙ্গামণিদেবীর নামের পদকটি সংস্কৃত ও প্রেসিডেন্সি কলেজ মিলিয়ে সংস্কৃতের প্রথম স্থানাধিকারীকে দেওয়া হত। এ এন মুখার্জি রুপোর পদকটি দেওয়া হত ইংরেজি ভাষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপককে। স্বপনকুমার দাস নামে এক ব্যক্তি কোনও কারণে গঙ্গামণিদেবীর নামাঙ্কিত 
পদকটি নিতে পারেননি বলে সেটি রাখা রয়েছে। যে ৮৫টি পাসবই মিলেছে তা পোস্ট অফিসের। ১৯৩০ সালের। এখান থেকে বৃত্তির টাকা দেওয়া হত বলে মনে করা হচ্ছে। 
এদিন দুপুর থেকে চার ঘণ্টার চেষ্টায় সিন্দুকটি খোলা হয়।  চাবি তৈরি করেও খোলা যায়নি। চারটি চাবি ভেঙে যায়। শেষে ছেনি–হাতুড়ি দিয়ে সিন্দুকের ডালা ভাঙতে হয়। কাজটি করেন রাজেন্দর মিশ্র। কলেজ স্ট্রিট চত্বরেই থাকেন তিনি। পুরনো সিন্দুক খুলতে সিদ্ধহস্ত। এত ভারী সিন্দুক যে একতলার গুদাম ঘর থেকে উপাচার্যের ঘরে আনতে ১০ জনকে হাত লাগাতে হয়। পুরনো নথিপত্র ঘাঁটতে গিয়েই সিন্দুকটির সন্ধান পান উপাচার্য। গায়ে ১৯৯৫ সালের উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ ওই সময় সিন্দুকটি কলেজের সম্পত্তিতে নথিভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু খোলার চেষ্টা হয়নি। উপাচার্য বলেন, ‘‌সিন্দুকটি 
লন্ডনের চাব্‌ কোম্পানির। বেশ পুরনো। সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৮২৪ সালে। সিন্দুকটি কবেকার, নথি এবং পাওয়া বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে তা–‌ও দেখা হবে।’‌ ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top