বুয়েনস এয়ার্সের উত্তরে সান আন্দ্রেসের বাড়ির চৌকাঠে তখন ন’‌টি অ্যাম্বুল্যান্সের গোঙানি। কিন্তু তাঁকে বাঁচানো যায়নি। লিওনেল মেসি লিখলেন, ‘‌উনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু যাননি। কারণ উনি অবিনশ্বর।’‌
দিয়েগো মারাদোনা সত্যিই তাই। ফুটবলের সাম্রাজ্যে তার রাজপুত্রের জায়গাটা ঠিক কোথায়, তা নিয়ে শতকের পর শতক তর্ক চলবে। ‘‌সৌমিত্র, না উত্তম’‌–‌এর মতো ‘‌পেলে, না মারাদোনা’‌ এই প্রশ্নের জবাব আজীবন অধরাই থেকে যাবে। কিন্তু সহজ, সরল এবং অবিনশ্বর সত্যটা হল, একটা বৃহৎ প্রজন্মের কাছে ফুটবল মানেই মারাদোনা। তাদের কাছে দ্বিতীয় কোনও প্রতিশব্দ শুধু বেমানান নয়, দুষ্প্রাপ্য।
বিশেষ এই প্রজন্ম মারাদোনার ছবিকে বুকে আঁকড়ে শুয়ে থেকেছে। কেউ তাঁকে নকল করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। কেউ রকে বসে মিথ হয়ে যাওয়া ‘‌‌হ্যান্ড অফ গড’‌–‌এর তুমুল সমালোচনা করেছে। কেউ তাঁর অন্ধকার জগতে আলো ফেলে বেশি তৃপ্তি পেয়েছে। কিন্তু ২৫ নভেম্বর, ২০২০–‌র পর সব আড্ডায় মারাদোনা মানেই ফুটবল। দিয়েগো মানেই জিনিয়াস। 
১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর বুয়েনস এয়ার্স থেকে ২৫ মাইল দূরে ভিলা ফিয়োরিতোয় মারাদোনার জন্ম। পরিত্যক্ত ইট আর টিন দিয়ে বাবা চিতোরো বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। তাতে ছিল তিনটি চিলতে ঘর। ঠাঁই ছিল ১০ জনের। জল, বিদ্যুৎহীন কলোনিতে সংস্কৃতি বলতে ছিল বস্তির ভাষা এবং একের পর এক অপরাধ। এই প্রবল অনিশ্চয়তাই মারাদোনাকে উদ্বুদ্ধ করেছে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। এই অনুপ্রেরণাকেই মারাদোনা ওই আর্জেন্টিনীয় বস্তির ভাষায় বলতেন ‘‌ব্রঙ্কা’‌।
ব্রঙ্কা। তার এমনই মাহাত্ম্য যে, একটা গোটা দেশের পরিচিতি তৈরি করে দিয়েছিল একজনের মাধ্যমে। সেই একজন নাপোলিকে এমন উচ্চতায় তুলে দিয়েছিলেন, যেখানে ইতালির এই ক্লাব তার আগে পৌঁছনোর কথা কখনও ভাবেনি, তার পরেও ভাবেনি। এই ব্রঙ্কার জন্যই তো ‘‌হ্যান্ড অফ গড’‌–‌এর ঠিক পরে তাঁর দ্বিতীয় গোলটা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা গোল হয়ে থেকে যাবে। ব্রঙ্কার জন্যই তিনি পেলেকে বলতে পারেন, ‘‌ফিফার দাস’‌। আর্জেন্টিনার কোচ থাকাকালীন তিনি এই জন্যই অবলীলায় বলতে পারেন, ‘‌আমার বিশ্বকাপ দলে শুধু চারজন নিশ্চিত’‌। না, সেই চারজনে ছিলেন না লিওনেল মেসি। 
তবু সেই মেসিই রাজপুত্রের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে লিখে ফেলেন, ‘‌তুমি অবিনশ্বর’‌। ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top