ধ্রুবজ্যোতি নন্দী: লক্ষ্য করেছেন, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে পেট্রোল-ডিজেলের দাম আর তেমন খবরে নেই? কারণ, প্রায় এক মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম কমে চলেছে। ভারত যে তেল আমদানি করে, ৭ অক্টোবর তারিখে সেই ইন্ডিয়ান বাস্কেট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেল পিছু ৫৫৫৯ টাকা। আজ ৮ নভেম্বর এই লেখার সময় তার দাম চলছে ৪৫৫৪ টাকা। দাম কমেছে প্রায় ২০%। তার চেয়েও স্বস্তির খবর, আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোল-ডিজেলের দাম আবার বাড়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে, বরং আগামী কয়েক মাস আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা দাম কমতেই দেখব।
কথাটা অবিশ্বাস্য শোনাবে, কিন্তু আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বলে বসেছেন, দাম কমেছে আমার জন্যে। আমি চাইনি যে অশোধিত তেলের ব্যারেল ১০০ ডলার, কী ১৫০ ডলারে পৌঁছক। সেইজন্যেই কয়েকটা দেশকে ইরান থেকে পেট্রো-তেল আমদানির ব্যাপারে ৬ মাসের ছাড় দিয়েছি!
লক্ষ্য করুন, ট্রাম্প আমেরিকার কথা বলেননি। তা হলে হয়তো আমরা বলতেন। বলেছেন, ‘আমি’। খবরটা পড়ার পর থেকে বেশ ভয়ে ভয়ে আছি। আমার জন্যেই পেট্রোল-ডিজেলের দাম কমছে, এরকম কথা বলার মতো নেতা তো আমাদের দেশেও আছেন, যিনি পেট্রোল-ডিজেলে কেন্দ্রীয় কর না-কমানোয় গত কয়েক মাস বেশ চাপের মধ্যে ছিলেন। না, এখনও এরকম কিছু বলেননি তিনি, তবে তাঁর ভক্তকুল কি আর মুখ বুজে থাকবেন? কিন্তু যা-ই বলুন তাঁরা, সত্যিটা হল, মোদি-সরকার কিচ্ছুটি না করলেও এখন তেলের দাম কমবে। পেট্রোল-ডিজেলে কেন্দ্রীয় কর তাঁর জমানায় মোদি ৩ গুণ বাড়ালেও নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে তার তীক্ষ্ণতা কমবে বলে আশা করবে শাসকদল। তবে দাম কমছে দেখে আবার যদি করের বোঝা বাড়াতে শুরু করে মোদি-জেটলির নিঃস্ব সরকার, তার ধাক্কা সামাল দেওয়া সম্ভবই হবে না।
কিন্তু, আসল প্রশ্নটা হল অশোধিত তেলের দাম কমছে কেন? আর, তেলের দাম এখন কমতেই বা থাকবে কেন? ট্রাম্পের উত্তরটা অর্ধসত্যও নয়, কারণ তিনি সাফ বলেছেন কিছু দেশ আর্জি জানিয়েছিল বলে তাদের আরও ৬ মাস সময় দিলাম। এই ৬ মাসের মধ্যে ইরান থেকে পেট্রো-তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। তাতে পেট্রো-তেলের দাম এমন ঝপ করে পড়তে শুরু করার কথা নয়। দাম কমছে, কারণ দুনিয়াজুড়ে পেট্রো-তেলের মজুত অনেকখানি বেড়ে গেছে। মজুত বেড়েছে, কারণ আমেরিকায় পেট্রো-তেলের উৎপাদন অনেকটাই বেড়েছে। আমেরিকার পেট্রো-তেল মানে পাথরের খাঁজে আটকে থাকা তেল। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পেট্রো-তেলের ব্যারেল ৩০ ডলারেরও নিচে নেমে যাওয়ার পর যে তেলের উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমেরিকার পেট্রো-তেল মহল তার নাম দিয়েছিল ‘ফ্র্যাক হলিডে’। গত আড়াই বছর ধরে পেট্রো-তেলের উৎপাদন বন্ধ রেখে আমেরিকার বেশ কিছু তেল কোম্পানি নতুন পাইপ-লাইন বসিয়ে বাজারে সেই তেল পৌঁছে দেওয়ার খরচ কমিয়েছে। কিছু লাইন বসানোর কাজ শেষ, কিছু শেষ হবে ২০১৯ সালে, কিছু ২০২০ সালে। সুতরাং, ফ্র্যাক-হলিডে শেষ। আবার পূর্ণ উদ্যমে শুরু হয়েছে পাথরের খাঁজে আটকে থাকা তেল বাজারে আসা। তাতে পেট্রো-তেলের চাহিদার চেয়ে এখন সরবরাহ বেশি। ফলে মজুত বাড়ছে, দাম কমছে।
আরেকটা প্রশ্ন এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ২০১৬ সালে পেট্রো-তেলের দাম যখন তলানিতে ঠেকেছিল, তখন তেল-উৎপাদক ১৫টা দেশের জোট ‘ওপেক’ সমবেত সিদ্ধান্তে তাদের তেলের উৎপাদন কমিয়েছিল। তার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রো-তেলের দাম বাড়তে শুরু করে। জোটে না-থাকলেও রাশিয়া সামিল হয়েছিল সেই সিদ্ধান্তে। এবারও যদি তেমন কিছু হয়? বস্তুত তেলের দাম নামতে শুরু করার পরিপ্রেক্ষিতে ওপেক এই শনি-রবি তাদের সভা ডেকেছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি আলাদা। আমেরিকার তেলের উৎপাদন এবং সরবরাহ এখন দিনে দিনে বাড়বে। এক ব্যারেল পেট্রো-তেলের দাম এখনকার ৭৫ ডলার থেকে ৩০ ডলারের নিচে নেমে গেলেও এবার আর অয়েল ফ্র্যাকিং থামবে না। এই অবস্থায় ওপেক-দেশগুলো তেলের উৎপাদন কমানো মানে পুরোনো খদ্দের হারানোর ঝুঁকি নেওয়া। সে বোধহয় সম্ভব নয়।

জনপ্রিয়

Back To Top