বয়স এখনও ৪০ হয়নি। কিন্তু রাষ্ট্রনেতা হিসেবে দেশের সঙ্কটসময়ে জেসিন্ডা আর্ডার্ন দেখালেন আশ্চর্য পরিণতিবোধ।  লিখলেন দেবারতি দাশগুপ্ত।

কালোর ওপর সোনালি–লালের সাদামাঠা কারুকা‌‌‌‌জের হিজাবে ঢাকা মাথা। অবনত দু’‌টি নীল চোখ। উদ্বেগে বাঁকা ভ্রুযুগল। থমথমে মুখ। সহজে ভাষা পড়া যায়। যেন মনে মনে বলে চলেছেন সেই চারটি শব্দ। যা তিনি বারবার বলেছেন, ‘‌আই অ্যাম সো সরি’‌। কখনও অস্ফুটে, কখনও জোরালোভাবে। ছবির মতো সুন্দর, শান্ত নিউজিল্যান্ডকে ১৫ মার্চ  কালো দাগে দাগিয়েছে সন্ত্রাস। ঠিক তার পরদিন হামলার শহর ক্রাইস্টচার্চে মৃতদের সমব্যথী, সহমর্মী প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডার্নকে এই রূপে দেখে মু্গ্ধ, বিস্মিত তামাম বিশ্ব। 
ঠিক যেমন ক্রাইস্টচার্চে দু’‌টি মসজিদে জোড়া হামলায় ৫০ জনের মৃত্যুর ঘটনাকে তড়িঘড়ি সন্ত্রাসবাদী হামলা বলে দেওয়া তাঁর বয়ানে চমকিতও হয়েছে। 
জোড়া মসজিদে জোড়া হামলা ঘটিয়েছিল এক শ্বেতাঙ্গ। বিরল হলেও শ্বেত সন্ত্রাসকে শ্বেত সন্ত্রাস বলতে পিছপা হননি ৩৮ বছরের রাষ্ট্রপ্রধান। সন্ত্রাসিদের উদ্দেশে আবেগে কাঁপাকাঁপা গলায় কিন্তু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাঁর বার্তা ছিল, ‘‌‌তোমরা হয়তো আমাদের বেছে নিয়েছো। কিন্তু আমরা তোমাদের খারিজ করছি। নিন্দা করছি।’‌ বন্দুকবাজ ব্রেন্টন ট্যারান্ট শ্বেতাঙ্গ নিউজিল্যান্ডের মূল্যবোধ বা নিউজিল্যান্ডের মতাদর্শের নয়। সুতরাং, ‘‌ও আমাদের নয়।’‌ জাতি–ধর্ম–সম্প্রদায় নির্বিশেষে যাঁরা নিউজিল্যান্ডকে ঘরবাড়ি করেছেন, তাঁরাই দেশের অংশ। তাঁরাই ‘‌আমাদের’‌। এই জরুরি বার্তাও নিউজিল্যান্ডের ঘরে ঘরে পাঠিয়েছেন তরুণী প্রধানমন্ত্রী। আর তাই শান্ত নিউজিল্যান্ড বিচলিত হলেও শোক এবং উদ্বেগের সময় শান্তই থেকেছে। হিংসা–বিদ্বেষকে প্রশ্রয় দেয়নি। বরং এই বিশ্বাস রেখেছে যে, বন্ধু হয়ে, সমব্যথী হয়ে পাশে থাকতে হয়। 
হামলার এক সপ্তাহ না পেরোতে পেরোতেই সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা স্বাগত ভাষণ শুরু করেছিলেন ‘‌আসসালাম ওয়ালেইকুম’‌ বলে। নেহাতই প্রতীকী?‌ নাহ্‌। কাজের কাজও। নিউজিল্যান্ডে যাতে অবাধে স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র না পাওয়া যায়, সেজন্য কড়া আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জঙ্গি হামলায় মৃতদের সমাহিত করার খরচ বহন করেছে তাঁর সরকার। মৃতদের আত্মীয়দের অন্ত্যেষ্টিতে শামিল হতে সহজে ভিসার বন্দোবস্ত করেছেন। 
জেসিন্ডার দৃঢ় নেতৃত্ব দেখে তাঁকে ‘‌মাদার অফ দ্য নেশন’‌–‌এর শিরোপা দিয়েছেন দেশের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ পল বুকানন!‌ ‘জাতির মাতা’ বাস্তবেও এক সন্তানের জননী। কন্যা নেভের বয়স সবে ৯ মাস। গত সেপ্টেম্বরে মেয়েকে কোলে নিয়েই রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে উপস্থিত থেকে শিরোনাম কেড়েছিলেন জেসিন্ডা। ঠিক যেমন অন্তঃস্বত্ত্বা অবস্থায় সাইকেলে চেপে সংসদে এবং দপ্তরে হাজিরা দিয়ে খবরে ছিলেন। 
একরত্তি মেয়ে আর সঙ্গী ক্লার্ক গেফোর্ডকে নিয়ে সংসারী নিউজিল্যান্ডের লেবার পার্টির নেত্রী জেসিন্ডার প্রধানমন্ত্রী পদপ্রাপ্তি ২০১৭–‌র ২৬ অক্টোবর। রাজনীতিতে আসা ২০০৮–‌এ। লেবার পার্টির সাংসদ হিসেবে। জন্ম ১৯৮০–‌র ২৬ জুলাই, হ্যামিলটনে। বাবা ছিলেন পুলিশ আধিকারিক। মা একটি স্কুলের প্রশাসনিক কাজ দেখতেন। ২০০১–‌এ নিউজিল্যান্ডের ওয়াইকাটো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়ে জেসিন্ডা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হেলেন ক্লার্কের দপ্তরে গবেষণার কাজ শুরু করেন। অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পর ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের নীতি উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। ‘‌ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ সোশ্যালিস্ট ইউথ’‌ সংগঠনের প্রেসিডেন্ট হন ২০০৮–‌এ। সেবারই নিউজিল্যান্ডের লেবার পার্টির সাংসদ মনোনীত হন। পরপর উত্থান। ২০১৭–‌র ১ মার্চের উপনির্বাচনে লেবার পার্টির উপপ্রধান নির্বাচিত। ওই বছরই দলের প্রধান অ্যানেট কিংয়ের পদত্যাগের পর তিনিই নেত্রী। স্বভাবতই। ২০১৭–‌র ২৩ সেপ্টেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ন্যাশনাল পার্টিকে পেছনে ফেলে ক্ষমতায় আসে লেবার পার্টি। নিউজিল্যান্ড ফার্স্ট পার্টির সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গড়ে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতৃবৃন্দের স্বতঃস্ফূর্ত পছন্দ ছিলেন তখন ৩৭ বছরের জেসিন্ডা। 
সামাজিক গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল ভাবমূর্তির নিউজিল্যান্ডে প্রধানমন্ত্রীর নিন্দুকের অভাব নেই। দেশের অর্থনীতি নিয়ে তাঁর নীতিতে কোনও দিশা নেই,আমলাতন্ত্রকে চালিত করায় তাঁর বিস্তর খুঁত— মাত্র দেড় বছরের শাসনকালে এমন নিন্দামন্দ বিরোধী শিবির, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের থেকে আকছার শুনতে হয় জেসিন্ডাকে। তবু সঙ্কটের সময় যেভাবে ঠান্ডা মাথায় যোগ্য নেতৃত্ব  দিয়েছেন, তাতে চমৎকৃত বিশ্ব। 
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ পল বুকানন যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জেসিন্ডার তুলনা করে বলেছেন, ‘‌সন্ত্রাস হামলার পরপর কড়া কড়া কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তাঁর কথাবার্তায় আমেরিকার দুর্বলতাকে আড়াল করেন। বেশিরভাগ সময়েই প্রতিহিংসার স্পৃহা বেরিয়ে পড়ে। জেসিন্ডা কিন্তু তেমন কিছু করেননি। তাঁর নেতৃত্ব নিউজিল্যান্ডের জন্য একেবারে ঠিকঠাক। নিউজিল্যান্ডে বিদ্বেষের বাতাবরণ নেই। তা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আগেই মনের ভেতরের শয়তানগুলোর মোকাবিলা করতে শিখিয়ে দিয়েছেন জেসিন্ডা।’‌
মনের অন্দরে ঘাপটি মেরে থাকা শয়তানদের কাবু করা যে সহজ নয়, ভারতে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে পুলওয়ামা জঙ্গি হামলা। আধাসেনারা জঙ্গিবাদের বলি হওয়ায় ভারতের সর্বত্র কমবেশি বিদ্বেষের মুখে কাশ্মীরিরা। 
‘কাশ্মীর শুধু নয়, কাশ্মীরীরাও আমাদের’— বার্তা দিতে ১০ দিন সময় নিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। জেসিন্ডা আর্ডার্নের সঙ্গে তাঁর তুলনা তাই এসেই পড়ে। সৌজন্য, আত্মসম্মান এবং সাহস দেখিয়ে ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডার্ন প্রমাণ করে দিলেন— এখনও সত্যিকারের রাষ্ট্রনেতা জন্মান‌। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top