তপশ্রী গুপ্ত, বাল্টিমোর, ৬ জুলাই: পঁাচ বছর পার করল আজকাল এনএবিসি সম্মান। বদলে গেল তার আঙ্গিক। আন্তর্জাতিক মঞ্চের কথা ভেবে এতদিনের ‘‌সেরা বাঙালি’‌ তকমা ঝেড়ে ফেলে নাম হল আজকাল এনএবিসি উৎকর্ষ সম্মান। এ ছাড়া এবারই প্রথম দেওয়া হল জীবনকৃতি সম্মান। পরিবর্তন এসেছে পুরস্কার অনুষ্ঠানেও। অন্যবারের মতো পুরস্কার প্রাপকদের নিয়ে অডিও–‌ভিস্যুয়াল প্রেজেন্টেশন তো ছিলই, সেই সঙ্গে পুরস্কারের ফঁাকে ফঁাকে গানে–‌আবৃত্তিতে বর্ণাঢ্য হয়ে উঠেছিল মঞ্চ।
আজকাল এনএবিসি জীবনকৃতি সম্মান যিনি পেলেন, সেই পদ্মভূষণ স্বদেশ চট্টোপাধ্যায়কে যে শুধু প্রবাসী বাঙালিরা মাথায় করে রাখেন, তা কিন্তু নয়। তঁাকে সমীহ করে মার্কিন প্রশাসন। ওবামা থেকে ট্রাম্প সবাই জানেন, ভারত–‌আমেরিকা সম্পর্কের ওঠাপড়ায় তঁার ভূমিকা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। স্বদেশ চট্টোপাধ্যায়ের হাতে স্মারক তুলে দিলেন আর এক কৃতী অনাবাসী বাঙালি ডঃ পরিতোষ চক্রবর্তী। ধুতি–‌পাঞ্জাবিতে আদ্যন্ত বাঙালি এই ইন্ডিয়ান আমেরিকান পুরস্কার হাতে নিয়ে এক লহমায় ফিরে গেছিলেন স্মৃতির সরণি বেয়ে সত্তরের দশকে। সোনামুখীর ছেলে কোনওদিন ভাবেননি, আমেরিকা পাড়ি দেবেন। বারবার উল্লেখ করলেন তঁার সাফল্যে স্ত্রীর ভূমিকার কথা। মাতৃভূমি বাংলা তঁাকে কত কিছু শিখিয়েছে, বললেন সেই কথাও। তঁার আহ্বান, প্রবাসী বাঙালিরা এগিয়ে আসুন বাংলার জন্য, ভারতের জন্য কিছু করতে। যে চারজন পেলেন আজকাল এনএবিসি উৎকর্ষ সম্মান— তঁারা সবাই যে শুধু নিজের নিজের ক্ষেত্রে দিকপাল, তাই নয়, তঁারা নিত্যনতুন দিগন্ত সৃষ্টি করেন। যেমন বিজ্ঞানী গৌতম চট্টোপাধ্যায়। নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা তঁার কর্মস্থল, তাই খানিকটা অন্তরালে থেকে বিজ্ঞান সাধনা করেন। চরম দারিদ্র‌্যের সঙ্গে লড়াই করে কোন্নগরের নবগ্রাম থেকে নাসা পর্যন্ত পৌঁছনো যে কতখানি দুরূহ ব্যাপার, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু আজ এত সাফল্যের মাঝখানে দঁাড়িয়েও তিনি ভোলেন না ফেলে আসা দিনগুলোকে। সে জন্যই গৌতম চট্টোপাধ্যায় বলতে পারেন, ‘‌কঁাচা বাড়ির ফুটো চাল দিয়ে যখন আকাশ দেখতাম, নাসার কথা ভাবতাম। কিন্তু ভাবিনি সেখানে একদিন চাকরি করব।’‌ তুমুল হাততালিতে হল ভরে গেল, যখন তিনি বললেন, ‘‌বাংলা থেকে বাঙালিকে বের করে আনা যায়, কিন্তু বাঙালির ভেতর থেকে বাংলাকে বার করা যায় না।’‌ গৌতম চট্টোপাধ্যায়কে সম্মানিত করলেন সঞ্জীব গোয়েঙ্কা গোষ্ঠীর শিল্প পরিচালক গৌতম রায়। পুরস্কার প্রাপকদের মধ্যে পণ্ডিত তন্ময় বসুই একমাত্র, যিনি বাংলার বাসিন্দা। কলকাতার ছেলে। কিন্তু খ্যাতি  তঁার বিশ্বজোড়া। পণ্ডিত রবিশঙ্কর থেকে উস্তাদ আমজাদ আলি খান, কিংবদন্তিদের সঙ্গে সঙ্গতে তিনি। দুপুরের পর পা রেখেছেন বাল্টিমোরে। তাই ক্লান্ত। অবশ্য বোঝা গেল না যখন পুরস্কার নিতে উঠলেন মঞ্চে। বন্ধু অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের হাত থেকে স্মারক নিয়ে বললেন, ‘‌মিউজিকের জন্য বহু দেশে ঘুরি। কিন্তু নিজের ঘরের বাংলা কাগজের পুরস্কার বিদেশের মাটিতে দঁাড়িয়ে নেওয়ার অনুভূতি অন্যরকম।’‌ ঋতুপর্ণার আর এক বন্ধুও তঁার হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে আপ্লুত। বিশিষ্ট অনাবাসী শিল্পোদ্যোগী প্রসূন মুখার্জি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন তঁার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে। ‘‌২০০৩ সালে ঢাকা গেছিলাম ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গী হয়ে। সেখানে আজকাল–‌এর সাংবাদিক আমার ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন। শিল্পোদ্যোগী হিসেবে আমাকে বাংলায় প্রথম পরিচিত করাল আজকাল। মনে আছে, আজকাল দেখে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।’‌
শেষে যিনি পুরস্কার নিতে উঠলেন মঞ্চে, তঁার জন্য এত হাততালি পড়াটাই স্বাভাবিক কারণ তিনি আমেরিকা প্রবাসী বাঙালিদের খুব কাছের মানুষ। অশোক মোতায়েদ। ইঞ্জিনিয়ার তথা ব্যবসায়ী এই প্রবীণ মানুষটি প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করেন। আজকাল চেয়ারম্যান সত্যম রায়চৌধুরী যখন তঁাকে জানিয়েছিলেন পুরস্কারের মনোনয়নের খবর, অশোক মোতায়েদের বিনয়ী অনুরোধ ছিল, ‘‌আমাকে বাদ দিলে হয় না?‌’‌ এনএবিসি–‌র প্রাণপুরুষ প্রবীর রায়ের হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে তঁার সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া, ‘‌আমি কৃতজ্ঞ। সম্মানিত বোধ করছি।’‌
সুরে–‌কথায় আজকের পুরস্কার অনুষ্ঠান ভরিয়ে দিলেন যঁারা, তঁারা সবাই বঙ্গ সম্মেলনের তারকা শিল্পী। ঋতুপর্ণা আবৃত্তি করলেন নির্মলেন্দু গুণের কবিতা। শৌনক চট্টোপাধ্যায়, কমলিনী মুখোপাধ্যায় আর শুচিস্মিতা দাস গানে গানে মাতিয়ে দিলেন।‌‌‌                                                

 

 

ছবি: অর্য্যাণী ব্যানার্জি

জনপ্রিয়

Back To Top