দিলীপ চক্রবর্তী, লং আইল্যান্ড (‌আমেরিকা)‌: ‘মেমোরিয়াল ডে উইক এন্ড’ নিয়ে জোর আলোচনায় কাটল সপ্তাহটা। আমার সন্দেহ, ক’জন মানুষ মনে রাখেন এর তাৎপর্য। যুদ্ধে নিহত সেনাদের স্মরণে মে মাসের শেষ সোমবার মেমোরিয়াল ডে পালিত হয় আমেরিকায়। আসলে আমজনতা এই সপ্তাহান্তে মেতে ওঠে আনন্দে। এই সময় সরকারি ভাবে গ্রীষ্ম শুরু। শীতপ্রধান দেশে সামার নিয়ে বাড়াবাড়ি রকম আদিখ্যেতা দেখে প্রথম প্রথম অবাক হতাম। আমরা যারা গরমের দেশ থেকে এসেছি, তারা রোদ চড়া হলে ছায়া খুঁজি আর সাহেব–মেমরা সানবাথ নিতে ছোটে। তাই প্রতি বছর এই সময়টায় সব সৈকতে শনি–রবিবার তুমুল ভিড়। এবার অবশ্য তেমন হওয়ার জো নেই। তাও পাবলিকের চাপে লং আইল্যান্ডে কয়েকটা বিচ খুলে দেওয়া হচ্ছে। তবে নিউ ইয়র্কে কোনও বিচই খুলছে না। সেখানে একেবারে বেড়া দিয়ে দেওয়া হয়েছে ঢোকার গেটে। যেহেতু নিউ ইয়র্কের শহরতলি বলা যায় লং আইল্যান্ডকে, তাই প্রশাসন আশঙ্কা করছে, নিউ ইয়র্কের মানুষ ‘মেমোরিয়াল ডে’ সেলিব্রেট করতে দলে দলে গাড়ি নিয়ে চলে আসতে পারেন এখানে। সেইজন্য আগেই ঘোষণা করা হয়েছে, লং বিচে স্থানীয় লোক ছাড়া আর কেউ যেতে পারবেন না। এর আগে ইস্টারের সময় দেখেছি, এখন মেমোরিয়াল ডে–তেও দেখছি, মানুষ যেন করোনা সঙ্কটের কথা ভুলে যাচ্ছে, মেতে উঠতে চাইছে উৎসবের মেজাজে। এটাই হয়তো মানুষের স্বভাব, দীর্ঘ বন্দিদশা তাদের এমন মরিয়া করে তুলেছে। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলাম, কলকাতায় এই সময় দুর্গাপুজো হলে কি এভাবেই পথে নামতে চাইত মানুষ?
নিউ ইয়র্ক থেকে ট্রেনে–গাড়িতে এক থেকে দেড় ঘণ্টার দূরত্বে লং আইল্যান্ড, কিন্তু একদম উল্টো চরিত্র। নিউ ইয়র্ক যেমন ঘিঞ্জি, দূষণ মারাত্মক, অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য, লং আইল্যান্ড তেমনই ফঁাকা, উদার প্রকৃতি, নিরুপদ্রব পরিবেশ। এক–একটা জায়গা তো এত সুন্দর যে সেলেব্রিটিরা অবসর কাটানোর বাড়ি তৈরি করে রেখেছেন। কিন্তু নিউ ইয়র্ক করোনা হটস্পট হওয়ায় রেহাই মেলেনি একই স্টেটের অংশ লং আইল্যান্ডের। নিউ ইয়র্ক স্টেটে চার লক্ষের কাছাকাছি সংক্রমণের হিসেবের মধ্যে ঢুকে গেছে লং আইল্যান্ডের নামও। আমাদের মতো অবসরপ্রাপ্তদের থাকার চমৎকার জায়গাটি এখন তাই আতঙ্কের মাস্ক পরে আছে। আমার মনে হয়, মৃত্যুভয়ের চেয়েও অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তা বেশি করে ভাবাচ্ছে প্রবীণদের। বহু বছর আগে দেশ ছেড়ে এসেছিলাম বেশি রোজগারের আশায়। বিদেশের মাটিতে অনেক পরিশ্রম করে জীবনে কিছুটা সাফল্য পেয়েছি। আর্থিক সচ্ছলতা এসেছে। এখন অবসরের পর সেই সাচ্ছল্য উপভোগের সময়। কিন্তু করোনা এসে যেন সব তছনছ করে দিল। স্টক মার্কেটে বিশাল ধস, সঞ্চয়ে টান পড়ছে। ভবিষ্যতের কথা ভেবে দুশ্চিন্তায় রয়েছি। সামাজিক জীবন তো অনেকদিন হল শূন্য। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দেখা নেই, এমনকী নাতি–নাতনিকে কাছে পাওয়ার উপায়ও নেই। ঘরবন্দি হয়ে বসে আরও বেশি করে ঘিরে ধরছে হতাশা। একদিকে মনে পড়ছে কৈশোরের কথা। গ্রামে কলেরা আর স্মল পক্স মহামারী দেখেছিলাম। গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছিল। সেই দুঃস্বপ্ন যেন ফিরে এসেছে এত বছর পর, আমেরিকার মতো উন্নত দেশে। আর একবার আতঙ্ক গ্রাস করেছিল আমেরিকার জনজীবন, ২০০১ সালে নাইন ইলেভেনের সময়। জঙ্গি হানায় মারা গেছিলেন ২৯৭৭ জন নিরীহ মানুষ। কিন্তু এই করোনার বলি তার অনেকগুণ। যেমন নাইন ইলেভেনের পর আর আগের জীবনে ফিরতে পারেনি আমেরিকা, তেমনই করোনার পরের জীবনও হবে অন্যরকম। তফাত একটাই, শুধু আমেরিকা নয়, সারা পৃথিবীকেই মেনে নিতে হবে এই ‘আফটার করোনা লাইফ’।
জীবনে যে কোনও সঙ্কটেই যেমন, এখনও তেমনিই আমার আশ্রয় শ্রীমদ্ভাগবত গীতা। অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ অন্ধকারে আলোর রেখা হয়ে পথ দেখায়। আমিও সেইভাবেই মন শান্ত রাখার চেষ্টা করছি।‌

জনপ্রিয়

Back To Top