রাজ্যশ্রী মুখার্জি
কেভেলেয়ার (জার্মানি), ১৬ মে‌


আমি যে ছোট্ট শহরটায় থাকি, সেটা ক্যাথলিকদের তীর্থক্ষেত্র। মা মেরির কাছে প্রার্থনা জানাতে ইওরোপের নানা শহর থেকে লোকে আসেন। এখন অবশ্য সে প্রশ্ন নেই। অথচ ঝকঝকে নীল আকাশ। সোনালি রোদে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রির আশেপাশে। ইওরোপের যে কোনও দেশের যে কোনও শহরের লোককে জিজ্ঞাসা করুন, এর থেকে মনোরম আবহাওয়া আর হতে পারে কি? কিন্তু আমরা করোনার হাতে বন্দি। স্বেচ্ছাবন্দী বলা ভাল। কারণ, কেউ লকডাউন ঘোষণা করেনি, কোনও জোরাজুরিও নেই। দেশে ফোন করে জানতে পারি, মানুষকে ঘরবন্দি রাখার জন্য পুলিশকে লাঠিপেটা করতে হচ্ছে, কান ধরে ওঠবোস করাতে হচ্ছে, এমনকী গ্রেপ্তারও। আমাদের শহরে কেউ এ–সব ভাবতেই পারে না।
এখন তো আস্তে আস্তে সব কিছু খুলছে। আন্তর্জাতিক উড়ান হয়তো জুনের মাঝামাঝির আগে খুলবে না। কিন্তু জার্মানির মধ্যে বিমান চলাচল অদূর ভবিষ্যতে ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে আশা করা যায়। চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল ধাপে ধাপে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছেন। বিভিন্ন প্রদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বলে দিয়েছেন, পরিস্থিতি বুঝে লকডাউন শিথিল করতে। যেমন, কোথাও কোথাও স্কুল খুলে গেছে, ফ্রাঙ্কফুর্টে দেখলাম মিউজিয়াম পর্যন্ত খুলেছে! তবে মাস্ক পরা বা সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিংয়ের মতো নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে সবাইকে।
যখন শুনলাম, ১৬ মে থেকে ফের শুরু হবে প্রথম সারির ফুটবল লিগ বুন্দেশলিগা, অবাক হয়েছিলাম। করোনার প্রকোপ কিছুটা কমলেও এখনও জার্মানিতে প্রতিদিন অন্তত কয়েকশো লোক আক্রান্ত হচ্ছেন। ফলে ফুটবল পাগল জার্মানরাও কি আর মাঠমুখী হবে? কিন্তু শুনলাম, খেলা হবে দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে। যাকে সাহেবরা বলছে ‘গোস্ট গেমস’। সরকার পরিকল্পনা করেছে, মে মাস জুড়ে ধাপে ধাপে সব কিছু খুলবে। যেমন, ৯ তারিখ থেকে দোকানপাট খুলেছে। কিন্তু অনেক নিয়ম। ২০ বর্গমিটার এলাকায় একজনই মাত্র ক্রেতা থাকতে পারবেন। ১১ তারিখ থেকে খুলল বিউটি সঁালো, ১৫ তারিখ ধার্য হয়েছে ক্যাফে–রেস্তোরঁা, স্পোর্টস ক্লাব খোলার জন্য, ২৫ তারিখ খুলবে হোটেল আর ২৯ মে–র মধ্যে স্কুল–কলেজ খুলে যাবে। আর একটা ভাল ঘোষণা, এখন দুটি পরিবার সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং বিধি মেনে একসঙ্গে সময় কাটাতে পারবে যে কোনও পাবলিক প্লেসে। এতদিন একই পরিবারের লোক ছাড়া একসঙ্গে ঘোরাফেরা নিষিদ্ধ ছিল। তবে একটা কথা মাথায় রাখতে হচ্ছে সবাইকে, যদি করোনা সংক্রমণ আবার বাড়ে, তা হলে ফিরে আসবে পুরনো লকডাউন।
এক বন্ধুর মুখে ‘করোনা ট্যাক্সি’ কথাটা শুনে অদ্ভুত লেগেছিল। আমাদের ছোট শহরে দেখিনি, কিন্তু বার্লিনে ‘করোনা ট্যাক্সি’ যে কত মানুষের প্রাণ বঁাচিয়েছে, তার ঠিক নেই। পিপিই পরা স্বাস্থ্যকর্মী এই ট্যাক্সি চালিয়ে এসে পরীক্ষা করেছে মানুষকে, দরকারে হাসপাতালে নিয়েও গেছে। এ রকম অজস্র ট্যাক্সি ঘুরছিল বার্লিনের রাস্তায়। এটা একটা উদাহরণ জার্মানির অতি উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবার। তাই ইওরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় জার্মানিতে মৃত্যুর হার কম। হাসপাতালগুলোতে রাতারাতি আইসিইউ বেড প্রচুর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আর একটা ব্যাপার হল, এখানে সংক্রমিতদের গড় আয়ু কম। ৪৯ বছর। যেখানে ফ্রান্স আর ইতালিতে ৬০ বছরের বেশি। ফলে সেখানে মৃত্যুর হার বেশি। এই মুহূর্তে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের যোগ্য বলে মনে করছে সরকার। টেস্টের বিশাল ব্যবস্থা মজুত রয়েছে দেশে, সপ্তাহে প্রায় ১০ লক্ষ। যদিও অত প্রয়োজন হচ্ছে না। ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণার জন্যেও প্রচুর টাকা খরচ করছে সরকার। তবে অর্থনীতি যে ধাক্কাটা খেয়েছে, তা সামাল দিতে লেগে যাবে আগামী বছরটাও, বলেছেন মার্কেল।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top