ডাঃ পল্লব বসুমল্লিক: প্রশ্ন মোটেই সহজ নয়, উত্তরটাও একেবারেই অজানা!‌ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (‌হু)‌ ‘‌আজকাল’‌ পাঠানো বার্তার জবাবে সবে জানিয়েছে, তারা কোনও পরিস্থিতিতেই রুশ করোনা টিকাকে এখনই ‘‌ফার্স্ট বয়’–‌এর‌ ‌মর্যাদা এবং মান্যতা দেবে না। প্রয়োজন আরও ‘‌ক্লিনিক্যাল এভিডেন্স’। লন্ডনের গুরুত্বপূর্ণ এক সূত্র থেকেও জানা গেল, আগস্টের শেষ সপ্তাহে মস্কোর গ্যামেলিয়া ইনস্টিটিউট তাদের হিউম্যান ট্রায়ালের প্রথম এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের যাবতীয় গবেষণা বিশ্বের সেরা মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশ করছে। পশ্চিমি দুনিয়া যথারীতি ভ্লাদিমির পুটিনের গোল্ড মেডেল জেতার দাবি এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে। ক্রেমলিনের অবশ্য তাতে কিছু যায় আসে না। গোটা রাশিয়া এবং বাকি বিশ্ব তারিয়ে তারিয়ে ‘‌স্পুটনিক’‌ মুহূর্ত উপভোগ করে করোনা যন্ত্রণামুক্তির স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। অবিভক্ত সোবিয়েত ইউনিয়ন ১৯৫৭ সালে বিশ্বে প্রথমবার মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ সফল উৎক্ষেপণের ৫ দিন পরে দুনিয়ার সামনে সে নিউজ ‘‌ব্রেক’‌ করে। মহাকাশ অভিযানে প্রথম সাফল্যের স্বীকৃতি অবশ্য ‘‌ডাউনপ্লে’‌ হয়েছিল।
প্রথাগত বৈজ্ঞানিক এবং যাবতীয় ধাপ–‌মানা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের আগেই মানবদেহে প্রয়োগের উপযুক্ত করোনা টিকা তৈরির দাবিকে স্বীকৃতি দিতে হলে আদপে সোনার মুকুট পাওয়ার দাবিদার কিন্তু আরেক বৃহৎ শক্তি চীন। বেজিং ইনস্টিটিউট অফ বায়োটেকনোলজি এবং ক্যানসিনো বায়োলজিক্স যৌথভাবে যে টিকা বানায় তা চীনের সামরিক দপ্তরের সরকারি সিলমোহর পায় এ বছরের ২৫ জুন। অনেকেই জানেন না, পিপলস লিবারেশন আর্মির অধিকাংশ সৈনিক ইতিমধ্যে সে টিকা পেয়ে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। তাঁদের কয়েকজন লাদাখে এখন ভারতীয় সেনার মুখোমুখি। পশ্চিম লবি কর্কশভাবে জানাচ্ছে, গোটা প্রক্রিয়া চূড়ান্ত অনৈতিক। অনৈতিক কাজ তো রাশিয়াতেও দেদার হয়েছে। সেন্ট পিটার্সবার্গে কর্মরত আমার এক সহপাঠী চিকিৎসক জানালেন, স্পুটনিক টিকা ফেজ ওয়ান হিউম্যান ট্রায়ালে যাওয়ার ঢের আগেই নাকি ওখানে প্রয়োগ শুরু হয়। কারা নিয়েছেন?‌ আর্মি, রাজনীতিক, বড় ব্যবসায়ী এবং সমাজের প্রভাবশালীরা। সবচেয়ে মজার কথা, গবেষণায় যুক্ত প্রত্যেক বিজ্ঞানীকেও বাধ্যতামূলক নিতে হয় ‘‌অন ট্রায়াল’‌ টিকা!‌
স্পুটনিক আসলে অ্যাডিনোভাইরাস টিকা, লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড। অর্থাৎ সজীব ভাইরাসকে ক্রমাগত প্রক্রিয়াকরণে অনেকটা নির্জীব করা হয়েছে, যেমনভাবে তৈরি হয় ইয়েলো ফিভার, মিজল্‌স, মাম্পস, রুবেলা, টাইফয়েড, প্লেগ বা টিবি ভ্যাকসিন। 

অক্সফোর্ড, চীন এবং জনসন জনসনের টিকাও অ্যাডিনোভাইরাস থেকেই তৈরি হচ্ছে। রুশ পরিকল্পনা বাণিজ্যিকীকরণের পর প্রতি বছর অন্তত ৫০০ মিলিয়ন টিকা উৎপাদন। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ব্রাজিল এবং ফিলিপিন্সের সঙ্গে নাকি চুক্তিও পাকা। হু অবশ্য জানাচ্ছে, চাপের মুখে গ্যামেলিয়া স্বীকার করেছে তাদের ফেজ থ্রি হিউম্যান ট্রায়াল নাকি আজ, বুধবার রাশিয়া জুড়ে শুরু হচ্ছে। ৮৫টি অঞ্চলের মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১৫ অঞ্চলে ‘‌ক্লাস্টার ট্রায়াল’‌ সম্পন্ন হবে। গত কয়েকটি অলিম্পিকে মেডেল তালিকায় রাশিয়ার চেয়ে দ্বিগুণ পদক জেতা আমেরিকা অবশ্য ‘‌দ্য ডিউক্‌স’‌ বা ‘‌কোজি বিয়ার’‌কে ইতিমধ্যে দুষতে শুরু করেছে। তারা আবার কারা?‌ পশ্চিম লবির মতে, অপিটি২৯ নামক রুশ হ্যাকার গোষ্ঠীর ছদ্মনাম, যারা নাকি টিকা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও কানাডার ল্যাবরেটরি থেকে চুরি করেছে!‌ রুশ কর্তৃপক্ষ জবাব দেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেননি। 
কলকাতায় অ্যাপোলো গ্লেনইগলস হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান এবং মেডিক্যাল সার্ভিস অধিকর্তা ডাঃ শ্যামাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, আর্মি হসপিটাল এবং শেচেনভ নামক ইনস্টিটিউটে স্টাডি হয়েছে শুনেছি। সবার জন্য তথ্য সহজলভ্য নয়। কোনও সায়েন্টিফিক জার্নালে প্রকাশিতও হয়নি। মন খুলে তাই কিছু বলা মুশকিল। যদি সত্যি হয়, তবে একটা ল্যান্ডমার্ক বটেই। প্রখ্যাত কার্ডিয়াক সার্জেন ডাঃ কুণাল সরকার জানালেন, খুব পজিটিভ ডেভেলপমেন্ট। রাশিয়ায় সবসময় কাজ করে ‘‌সেন্স অফ ন্যাশনাল প্রাইড’‌। একটা ধারা আছে ওখানে, হঠাৎ বৈজ্ঞানিক কিছু আবিষ্কার করে চমক দেওয়ার। যেমন সবাইকে চমকে ইউরি গ্যাগারিনকে মহাকাশে পাঠিয়েছিল। আশা করি সব বৈজ্ঞানিক তথ্য ক্রমশ সামনে আসবে। রাশিয়ায় এ মুহূর্তে যেহেতু কেসের সংখ্যা কম, ওখানে ভ্যাকসিনের ট্রায়াল বা অ্যাপ্লিকেশন সহজ নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে এ ধরনের আবিষ্কারকে দূরে সরিয়ে রাখাই ভাল। বৈজ্ঞানিক সাফল্যকে কখনওই ছোট করে দেখা ঠিক নয়। সায়েন্টিফিক ভেরিফিকেশনের আগে অন্যান্য দেশে প্রয়োগের সম্ভাবনা খুবই কম। আইপিজিএমইআর, কলকাতার কোভিড স্ট্র‌্যাটেজি সদস্য ক্যান্সার সার্জেন অধ্যাপক ডাঃ দীপ্তেন্দ্র সরকার জানান, প্রি–ম্যাচিওর ট্রায়ালের ওপর ভিত্তি করেই ভ্যাকসিন। চারটে ভ্যাকসিন প্রায় একসঙ্গে ফেজ থ্রি–তে ঢুকেছিল। চ্যাডক্স১, মোডেরনা, সিনোভ্যাক এবং গ্যামেলিয়া। এর মধ্যে প্রথম তিনটির অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্বের ২০০ কোটি মানুষ ভ্যাকসিন পেতে চলেছেন, তাই টিকাকরণ শুরুর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিক্রিয়া পাওয়া জরুরি। রাজ্য কোভিড স্ট্র‌্যাটেজি দলের বরিষ্ঠ সদস্য মেডিসিন অতি–‌বিশেষজ্ঞ ডাঃ সুকুমার মুখার্জি জানালেন, বড্ড তাড়াহুড়ো হয়ে গেল না কি? উপযুক্ত ট্রায়াল না সেরে কি আদৌ মানুষের শরীরে প্রয়োগ সম্ভব? সেটা নিরাপদ নয়।‌ রাশিয়া, চীন বহির্বিশ্বকে বিশেষ কিছু জানায় না। যেহেতু করোনা ভ্যাকসিন‌, প্রত্যেকের জানার নৈতিক অধিকার অবশ্যই রয়েছে। উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার আগে সন্দেহটুকু থেকেই যাচ্ছে।
ভারতবাসীর হাতে কী পড়ে থাকল?‌ শুধুই পেনসিল?‌ বন্ধু ‘‌পোটাস’‌ ট্রাম্পের লম্ফঝম্পের আপাতত বিরতি। ১৫ আগস্ট লালকেল্লা থেকে ৫৬ ইঞ্চি থাবড়ে বলার সুযোগ নেই, ‘‌বিশ্বে আমরাই প্রথম’। দেশকে ‘‌আত্ম‌নির্ভর’‌ করার জন্য কিন্তু রয়েছে ভারতীয় সব নামী ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক সংস্থা। ২০১০–‌এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী গোটা বিশ্বে আমরা ৬০%‌ ভ্যাকসিন নিয়মিত জোগান দিই। এক দশক আগে আয় হয়েছিল ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই ভয়াবহ বৈশ্বিক অতিমারীতে মন্দিরে রুপোর পাথর গাঁথার বদলে বরং টিকা প্রস্তুতকারকদের পালে হাওয়া দেওয়াটাই আশু কর্তব্য। তাতে ভারত এবং বিশ্বের মঙ্গল।
তথ্য সহায়তা:‌ প্রীতিময় রায়বর্মন‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top