সংবাদ সংস্থা, প্যারিস: এমন দৃশ্য প্যারিস বোধ হয় দেখেনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও। আর্ক টি ট্রায়োম্পের সামনে পর্যটকদের ভিড় উধাও। কার্যত জনশূন্য সঁাজে লিজে। বিশ্ববিখ্যাত অ্যাভিনিউয়ের দু’পাশের দোকানপাট বন্ধ। বন্ধ ওয়ে সাইড ক্যাফে। ফুটপাথে লোক নেই। কখনও সখনও ইতিউতি দেখা যাচ্ছে দু–একজন পথচারীকে। দ্রুত পদক্ষেপে তঁারা চলে যাচ্ছেন গন্তব্যে। হাতে পুলিসের অনুমতিপত্র, যা না থাকলে চড়া হারে জরিমানা দিতে হবে। আইফেল টাওয়ারের সামনের লাইনটাই নেই। শুধু উড়ে বেড়াচ্ছে পায়রাগুলো। ল্যুভের মিউজিয়ামের সামনের স্কোয়ারটা খঁা–খঁা করছে। করোনার দ্বিতীয় সংক্রমণের দাপটে জারি হওয়া দেশজোড়া লকডাউনে শুক্রবার থেকে প্যারিসকে দেখা গেল সম্পূর্ণ অপরিচিত এক চেহারায়।
কোভিড সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ ঠেকাতে ফ্রান্সের ৬ কোটি ৭০ লক্ষ বাসিন্দাকেই চার সপ্তাহ গৃহবন্দি থাকার নির্দেশ দিয়েছে ফরাসি সরকার। কারও বাড়িতে কেউ দেখা করতে আসতে পারবেন না। লকডাউন ঘোষণার পর বৃহস্পতিবার থেকেই দলে দলে লোকজন প্যারিস ছেড়ে রওনা দেন গ্রাম ও শহরতলির উদ্দেশে। সেখানেই নিশ্চিন্তে লকডাউনের চার সপ্তাহ কাটাতে চান তঁারা। কারণ তঁাদের মতে, প্যারিসের ফ্ল্যাটে দিনের পর দিন বন্দি হয়ে থাকাটা স্রেফ ভয়াবহ। অনেকে আবার শুক্র, শনি ও রবিবারের উইক এন্ড কাটাতে চান প্যারিসের বাইরে। এর জেরে বৃহস্পতিবার রাতে সাড়ে চারশো মাইল দীর্ঘ হাইওয়ে জুড়ে গাড়ির লাইন পড়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ জ্যামে আটকা পড়তে হয় মানুষজনকে। বৃহস্পতিবার লকডাউন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে শহরতলির ট্রেনে টিকিট কাটার ধুম পড়ে যায়। টিকিটের চাপ এতটাই ছিল যে, সবকটি অনলাইন কাউন্টার বসে গিয়েছিল। যঁারা বৃহস্পতিবার টিকিট পাননি তঁারা শুক্রবার সকালে টিকিটে কেটে রওনা দিয়েছেন বার্গান্ডির মতো এলাকাগুলিতে। যাত্রীদের সবারই মুখে মাস্ক ও ফেসশিল্ড। ৫৪ বছরের এক ইন্টিরিয়র ডেকোরেটরের কথায়, ‘এভাবে প্যারিস ছেড়ে চলে যাওয়াটা একটা ‘ঐতিহাসিক মহাপ্রস্থানপর্ব’।’ অন্যদিকে, রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কার্ফু জারি হয়েছে প্যারিসে। ৯টার আগে বাড়ি ফেরার জন্য শুক্রবার রাতে পশ্চিম প্যারিসের রাস্তাগুলিতে গাড়ির লাইন লেগে যায়। এখানেও ট্রাফিক জটে ভুগতে হয় মানুষজনকে। দেখেশুনে মনে হচ্ছিল, শুক্রবার দিনটা যেন ছিল প্যারিসের কোনও ছুটির দিন। তবে ভিড় লেগেই রয়েছে মুদির দোকান ও বাজারে। নাগরিকদের অবশ্য এক ঘণ্টা রাস্তায় নেমে শরীরচর্চার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে বাড়ি থেকে আধ মাইলের বেশি দূরে যাওয়া চলবে না। এছাড়া অফিসে যাওয়া, ওষুধ কেনাতেও ছাড় রয়েছে। ওদিকে, ইতালিতে নতুন করে সংক্রমিত ৩১ হাজার। মৃত ১৯৯। বিশেষজ্ঞরা চাইছেন, ফ্রান্সের মতো লকডাউন জারি হোক ইতালিতেও।
দ্বিতীয় পর্বে সংক্রমণ বাড়ছে ব্রিটেনেও। দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা চার হাজার ছাড়াতে বলে আশঙ্কা প্রশাসনের। দৈনিক সংক্রমিত ১২ থেকে ১৩ হাজার। পরিস্থিতি সামাল দিতে সোমবার থেকে চালু হতে পারে স্টে অ্যাট হোমের নির্দেশ। একই সঙ্গে শোনা যাচ্ছে ব্রিটেনেও পুরো একমাস লকডাউন ঘোষণা করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। দ্বিতীয় দফার কোভিড সংক্রমণ ছড়াচ্ছে ইউরোপের অন্যত্রও। বেলজিয়ামে প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যায় সংক্রমিত ১৫০ জন। চালু হতে পারে আধা লকডাউন। সংক্রমণ বাড়ায় একমাস সব রেস্তোরঁা, পানশালা, থিয়েটার ও অন্যান্য পরিষেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জার্মানি। চেক প্রজাতন্ত্রে জরুরি অবস্থা জারি থাকছে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত। প্রথম দফার সংক্রমণের ধাক্কা কাটিয়ে কিছুটা ছন্দে ফিরছিল ইউরোপের অর্থনীতি। বৃদ্ধির হার ফিরেছিল প্রায় ১২ শতাংশে। তবে দ্বিতীয় দফার লকডাউন শুরু হতেই অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার আশা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। ফরাসি অর্থমন্ত্রী ব্রুনো লে মেইরের মন্তব্য, এবছর জিডিপি কমবে ১১ শতাংশ।‌

জনপ্রিয়

Back To Top