অরূপরতন বন্দোপাধ্যায়
কোভিড–‌১৯, যা করোনাভাইরাস নামে পরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ে এই ভাইরাসের দাপট থেকে রক্ষা পায়নি কোনও দেশ। এশিয়া থেকে উদ্ভূত এই সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। নৃতাত্ত্বিক, মহামারী সংক্রান্ত বিদ্যা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে এই সংক্রামক রোগের দ্বারা আক্রান্তের, সুস্থতার এবং মৃত্যুর হারের একটি বৈচিত্র এবং বৈষম্য লক্ষ করা যায়। সাম্প্রতিককালে এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের সুস্থতার পরিসংখ্যান বেশ আশাপ্রদ।
জুনোটিক অসুখ অর্থাৎ পশুবাহিত রোগ পৃথিবীর বুকে কোনও নতুন ঘটনা নয়। সুদূর অতীত থেকেই মানব এবং পশুর মেলবন্ধনে অনেক রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছে। যেমন ১৭২০ সালের বিউবিনিক প্লেগ, কলেরা (‌১৮২০)‌, ইনফ্লুয়েঞ্জা (‌১৯২০)‌ এবং সাম্প্রতিককালের সার্স–‌কোভ–‌২ সবই জুনোটিক রোগের অন্তর্গত। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে মানবসভ্যতার ইতিহাসে নব্যপ্রস্তর যুগে যখন খাদ্য উৎপাদন এবং পশুপালন শুরু হয়, সম্ভবত সেই সময় থেকেই পশুবাহিত রোগের উৎপত্তি। তদুপরি বিভিন্ন ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে মানুষের পরিযান বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের পশুবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবের নিদর্শনও আছে প্রচুর।
প্রথমদিকে ফুসফুসের প্রদাহজনিত শ্বাসকষ্টকে করোনা রোগের অন্যতম মৃত্যুর কারণ বলে মানলেও সম্প্রতি সংক্রমিত মৃতদের ময়নাতদন্তের বিবরণ থেকে উঠে এসেছে নানারকম চাঞ্চল্যকর তথ্য। শুধু শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা নয়, করোনাভাইরাস পর্যায়ক্রমে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা অনিয়ন্ত্রিত করে সমস্ত অঙ্গ–‌প্রত্যঙ্গকে অকেজো করে দেয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় ‘‌মাল্টি অর্গান ফেলিওর’‌ যার ফলে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।
বিশ্বব্যাপী ভৌগোলিক এবং আর্থ–‌সামাজিক অবস্থা অনুযায়ী করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত, মৃত্যু ও সুস্থতার পরিসংখ্যানের একটি বহুরূপতা পরিলক্ষিত হয়। পর্যবেক্ষণমূলক দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে তুলনামূলকভাবে যেসব দেশ আর্থ–‌সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে অনুন্নত অর্থ্যাৎ মাথাপিছু আয়ের পরিসংখ্যান যেসব দেশে কম, অপুষ্টিজনিত রোগ মূলত অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতার প্রাদুর্ভাব সেখানে অনেক বেশি (‌বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা–‌র প্রতিবেদন অনুযায়ী)‌ এবং করোনাভাইরাস দ্বারা মৃত্যুর হার সেই সব দেশে অনেক কম। যেমন আর্থ–‌সামাজিক অবস্থার দিক থেকে উন্নত পাশ্চাত্যের দেশগুলির (‌মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইওরোপ)‌ মধ্যে এই ভাইরাস দ্বারা সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা ভারত ও আফ্রিকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
রক্তাল্পতা বা শরীরে লোহিত রক্তকণিকার স্বল্পতা কীভাবে করোনাভাইরাসের বিস্তারের পথে অন্তরায় হয়ে উঠছে সে বিষয়ে কোনও তথ্য না পাওয়া গেলেও, অন্যান্য ভাইরাস (‌সার্স, মার্স, HIV, TB)‌ দ্বারা সংক্রমণগুলি নিয়ে যেসব গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে তা থেকে সাম্প্রতিককালের সার্স–‌কোভ–‌২ দ্বারা অ্যানিমিয়া প্রবণ অঞ্চলে মৃত্যুর হারের এই বৈষম্যতার সঙ্কেত পাওয়া যায়। লোহিত রক্তকণিকায় হিমোগ্লোবিন নামক প্রোটিনের মধ্যে থাকে লৌহকণা সমৃদ্ধ রঞ্জক। এই লৌহকণার লভ্যতার, অপুষ্টিজনিত এবং বংশানুক্রমিক জাতিগত বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য এই লৌহকণার উপস্থিতি অপরিহার্য। সম্প্রতি একটি গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়েছে করোনাভাইরাস লোহিত রক্তকণিকায় থাকা হিমোগ্লোবিনকে নষ্ট করে দেহে লৌহকণার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় যা ভাইরাসের বংশ বিস্তারকে দ্রুত করে শারীরিক অবস্থার অধঃপতন ঘটায়। শরীরে লোহিত রক্তকণিকার স্বল্পতা ভাইরাসের বংশ বিস্তারে বাধা সৃষ্টি করে, যা সম্ভবত সংক্রমণের বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষামূলক বলে ভাবা যেতে পারে। 
মাথাপিছু আয়ের পরিসংখ্যান এবং অপুষ্টিজনিত রক্তাল্পতা করোনাভাইরাসের সংক্রমণের বৈচিত্র তথা চিকিৎসার ক্ষেত্রে গবেষণার নতুন  দিকনির্দেশ করতে পারে।‌‌

লেখক:‌ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান
 

জনপ্রিয়

Back To Top