সমীর দে, ঢাকা: পশ্চিমবঙ্গের উপকূলের জেলাগুলিতে তাণ্ডব চালিয়ে, রাতভর বাংলাদেশেরও উপকূল এলাকার জনজীবন তছনছ করল ঘূর্ণিঝড়‌ ‌আমফান। ঝড়ের হামলায় বাংলাদেশের উপকূল এলাকার প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ বিপর্যস্ত। ৭ জেলায় অন্তত ১২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন ওই এলাকার জনপ্রতিনিধিরা। তবে সরকারি ভাবে ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। প্রায় এক কোটি মানুষ বিদ্যুৎহীন। বিভিন্ন জায়গায় বিদ্যুতের স্তম্ভ উপড়ে পড়েছে। প্রশাসন বলছে, বিদ্যুৎ–‌ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে এক সপ্তাহ সময় লেগে যাবে। ঝড়ে অর্ধলক্ষাধিক কঁাচা ও আধা–‌পাকা বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু বাগেরহাটের ৪ হাজার ঘর ভেসে গেছে জোয়ারের জলে। উপকূল এলাকায় তীব্র খাদ্য–‌সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
সুপার সাইক্লোন আমফান শক্তি কিছুটা হারিয়ে অতি–‌প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের চেহারা নিয়ে বুধবার দুপুরের পর পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আঘাত হানে। পরে রাতের দিকে ঝড় ঢুকে পড়ে বাংলাদেশে। গাছপালা ভেঙে পড়ে, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন উপকূলের মানুষ। তবে এ–‌পর্যন্ত যঁাদের মৃত্যুর খবর মিলেছে, তঁাদের বেশির ভাগই ঝড়ে গাছ বা ঘর চাপা পড়ে মারা গেছেন। এর মধ্যে পিরোজপুর ও যশোরে তিনজন করে, পটুয়াখালিতে দু’‌জন এবং ঝিনাইদহে, সাতক্ষীরা, ভোলা ও বরগুনায় একজন করে মারা গেছেন। আমের মরশুমে এই ঝড় সাতক্ষীরা ও রাজশাহিতে বিরাট ক্ষতি করেছে। অধিকাংশ গাছের আম পাকার আগেই পড়ে গেছে। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে লিচুরও।
ঝড়ের মধ্যে রাতে যশোরের চৌগাছা উপজেলার চঁাদপুর গ্রামে ঘরের ওপর গাছ ভেঙে পড়ে মা খ্যান্ত বেগম (৪৫) ও মেয়ে রাবেয়া (১৩) ঘটনাস্থলেই মারা যান, ছেলে আল–‌আমিন (২২) আহত হন। শার্শায় ঝড়ের মধ্যে গাছ চাপা পড়ে মুকতার আলি নামে ৬৫ বছরের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় দু’‌জন এবং ইন্দুরকানি উপজেলায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। এই তিনজন হলেন মঠবাড়িয়া উপজেলার দাউদখালি ইউনিয়নের গিলাবাদ গ্রামের মজিদ মোল্লার ছেলে শাহজাহান মোল্লা (৫৫) ও আমড়াগাছিয়া ইউনিয়নের ধুপতি গ্রামে মুজাহার ব্যাপারির স্ত্রী গোলেনুর বেগম (৭০) এবং ইন্দুরকানি উপজেলার উমিদপুর এলাকার মতিউর রহমানের ছেলে শাহ আলম (৫০)। এ ছাড়া ঝিনাইদহে ঘরের ওপর গাছ ভেঙে পড়ে নাদিরা বেগম নামে ৫৫ বছরের এক মহিলার মৃত্যু হয়েছে। সাতক্ষীরা সদরে গাছ ভেঙে পড়ে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। পটুয়াখালিতে গাছ পড়ে রাশেদ নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া নৌকাডুবিতে নিখেঁাজ ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) সদস্য শাহ আলমের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ভোলার চরফ্যাশনে ঝড়ে গাছ চাপা পড়ে সিদ্দিক ফকির নামে ৭০ বছরের এক বৃদ্ধ, বরগুনার সদর উপজেলার আশ্রয় কেন্দ্র যাওয়ার পথে শহিদুল ইসলাম নামের ৬৪ বছরের এক ব্যক্তি মারা যান।
অন্য দিকে, আমফানের মূল আঘাত না–‌পৌঁছোলেও, এর তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে। বিশেষ করে বেড়িবঁাধ, মৎস্য ঘের ও বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। বুধবার সন্ধে থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত জেলা জুড়ে দমকা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়। রাতের জোয়ারের অতিরিক্ত চাপে বেড়িবঁাধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে জেলা সদর এবং উপকূলীয় উপজেলা শরণখোলার বিভিন্ন এলাকা।
আমফান ঘায়েল করে দিয়েছে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও। বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বুধবার রাতে ঘূর্ণিঝড়টি যখন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে উত্তরবঙ্গের দিকে এগোচ্ছিল, তখন ২ কোটি ২০ লাখের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎ–‌বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, যা দেশের মোট গ্রাহকের প্রায় ৬০ শতাংশ। ঝড়ের তীব্রতা কমার পর বৃহস্পতিবার ভোর থেকে দুর্গত এলাকায় সংযোগ পুনঃস্থাপনের কাজ শুরু করে বিতরণ সংস্থাগুলি। তবে দুপুর পর্যন্ত এক কোটির বেশি গ্রাহকের বিদ্যুৎ ফিরিয়ে দেওয়া যায়নি। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানাচ্ছে, উপকূল ছাড়িয়ে স্থলভূমির ভেতরে ঢোকার পর ক্রমে শক্তি হারিয়েছে আমফান। আবহাওয়াবিদরা জানাচ্ছেন, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যপ্রাচীরে ধাক্কা খেয়েই শক্তি খুইয়েছে ঘূর্ণিঝড়টি।
ঘূর্ণিঝড় আমফান থেমে গেলেও, এখনও স্তব্ধ দক্ষিণবঙ্গ ও বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা। ঝড়ের তীব্রতা দেখে বিহ্বলতা কাটেনি অনেকেরই। প্রকৃতির এমন তাণ্ডব শেষ কবে দেখেছিলেন, মনে করতে পারছেন না কেউ। স্থানীয় ভাবে ঝড়ের প্রকোপ নয়, একের পর এক জেলা তছনছ করে এগিয়েছে আমফান। আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব এখনও দেখা বাকি রয়েছে বিশ্ববাসীর। বিশ্ব উষ্ণায়ন যত বাড়বে, তত বাড়বে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা। যাতে আরও ঝুঁকি বাড়বে উপকূলে। দ্য গার্ডিয়ান–‌এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গবেষকেরা বলছেন, ১৯৭৯ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত উপগ্রহ–‌চিত্র বিশ্লেষণ করে স্পষ্ট দেখা গেছে, ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়গুলি। একের পর এক রেকর্ড ভেঙে চলেছে তারা। বিশেষ করে ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার বা তার বেশি শক্তির ঘূর্ণিঝড়গুলি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শক্তি সংগ্রহ করে ঘূর্ণিঝড়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা যত বাড়বে, ততই বাড়বে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা। পরিসংখ্যান বলছে, ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটারের বেশি বাতাসের গতিসম্পন্ন ঝড়গুলির তীব্রতা গত ৩৯ বছরে ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
 

জনপ্রিয়

Back To Top