প্রবীর রায়, নিউ ইয়র্ক, ৪ জুন- জানাই ছিল, প্রতিবাদের জবাব আসবে হিংসায়। আমেরিকার পুলিশ কতখানি নির্দয়, জানে সারা পৃথিবী। শুধু মিনিয়াপোলিস কেন, এমন নির্মমতা এর আগে অনেক দেখেছে স্ট্যাটেন আইল্যান্ড, নিউ ইয়র্ক। সেসব নিয়ে মিডিয়া তোলপাড় করেছে। তবু সেই ট্র‌্যাডিশন সমানে চলেছে। ২০১২ সালে এরিক গারনার, ২০১৪–‌তে মাইকেল ব্রাউন, ২০১৫–‌তে ফ্রেডি গ্রে—‌ সবকটি হত্যাকাণ্ডেরই নায়ক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ। শুধু গত বছরই আমেরিকায় হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন পুলিশের হাতে, যার ২৪%‌ কৃষ্ণাঙ্গ। অথচ মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৩%‌ কৃষ্ণাঙ্গ। সমীক্ষা বলছে, আমেরিকায় যত হত্যাকাণ্ড হয়, তার ৯০%‌–‌এর জন্য দায়ী পুলিশ, অন কিংবা অফ ডিউটি। গুলি, মারধর, জোরজবরদস্তি, গাড়ি দিয়ে ইচ্ছাকৃত ধাক্কা, স্প্রে কিংবা অন্য কোনও উপায়ে। এ ‌ব্যাপারে সব সময় শীর্ষে লস এঞ্জেলস, প্রতি পাঁচ দিনে একজন নাগরিক পুলিশের গুলিতে মারা যায়। গত বছর তো চরমে উঠেছিল। প্রতিদিন অন্তত তিনজন করে লোককে মেরে ফেলেছে পুলিশ। অদ্ভুত ব্যাপার হল, ২০১৩ থেকে ২০১৯—‌ এই সময়কালের তথ্য বলছে, এইসব হত্যাকাণ্ডের ৯৯%‌ ক্ষেত্রেই পুলিশের শাস্তি হয়নি। প্রতিবারই পুলিশ বলেছে, গ্রেপ্তার করার সময়  সম্ভাব্য অপরাধী বাধা দেওয়ায় বাধ্য হয়ে জোর খাটাতে হয়েছে।
গত ২৫ মে মিনিয়াপোলিসে যা ঘটেছে, তার জন্য দায়ী শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার ডেরেক শভিন অবশ্য রেহাই পায়নি। জর্জ ফ্লয়েডকে ৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড ধরে ঘাড়ে পা চেপে দম বন্ধ করে মেরে ফেলার দায়ে তার বিরুদ্ধে সেকেন্ড ডিগ্রি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তার সহযোগী তিন পুলিশকর্মীও অভিযুক্ত সেকেন্ড ডিগ্রি মার্ডারে সহায়তা করার জন্য। গত দশদিন ধরে প্রতিবাদে উত্তাল গোটা দেশ তো বটেই, সারা বিশ্ব বললে ভুল হবে না। করোনা আতঙ্ক ভুলে সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং বিধি শিকেয় তুলে পথে নেমে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। এমনকী টিন এজাররাও বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায় ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, অচিরেই ফের করোনা সংক্রমণের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হবে। ম্যানহাটান, ব্রুকলিনের বাতাস স্লোগানে মুখর। পুলিশ আর ন্যাশনাল গার্ড পাহারা দিচ্ছে দিনরাত। প্রথমে বুঝিয়ে সুঝিয়ে, তারপর ভয় দেখিয়ে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করছে বিক্ষোভকারীদের। অনেক জায়গায় অবশ্য শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হচ্ছে। কোথাও কোথাও তো পুলিশ অফিসাররাও বিক্ষোভে শামিল হয়েছে। কিন্তু মুশকিল হল, পৃথিবীর সব শহরেই যা হয়ে থাকে, নিউ ইয়র্কেও তাই হচ্ছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সুবিচারের দাবিতে, বর্ণবৈষম্যের প্রতিবাদে এই লড়াইতে জুটে গেছে সমাজবিরোধীর দল। তারা সুযোগ বুঝে অফিস বিল্ডিং, বড় বড় দোকান, শপিং মলে ভাঙচুর করছে, লুঠপাট চালাচ্ছে। ইতিমধ্যেই কোটি কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে। নিউ ইয়র্কে টাইমস স্কোয়্যারের কাছে ল্যান্ডমার্ক ম্যাসি’‌স মলে ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে তারা। ভিতরের ব্র‌্যান্ডেড স্টোরগুলো থেকে লুঠ করে নিয়ে গেছে দামি দামি জিনিস। একেই করোনার জেরে মুখ থুবড়ে পড়েছে অর্থনীতি, তার ওপর এই নৈরাজ্য যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। অসহনীয় হয়ে উঠেছে আমজনতার জীবনযাত্রা। আর একটা খবরে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ওয়াশিংটনে ভারতীয় দূতাবাসের সামনে গান্ধীমূর্তি ভেঙে দিয়েছে দুষ্কৃতীরা। কেউ হয়তো তাদের কানে বলেছিল, গান্ধীজি অহিংসার পূজারী ছিলেন।
আমার এতখানি বয়স হল। মার্কিন মুলুকেও কমদিন কাটালাম না। নিউ ইয়র্কে কার্ফু ভাবাই যায় না। গত ৭৫ বছরে এই প্রথম এই শহরে কার্ফু জারি হয়েছে। রাত আটটা থেকে পরদিন ভোর পাঁচটা পর্যন্ত। আপাতত ঘোষণা হয়েছে, সোমবার ভোর পাঁচটায় কার্ফু উঠবে। গত মঙ্গলবার রাতে ব্রুকলিনে কার্ফু অগ্রাহ্য করে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। তবে সেই বিক্ষোভ ছিল শান্তিপূর্ণ। কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের দেখানো পথে অহিংস আন্দোলন চলতেই পারে যে–‌কোনও গণতান্ত্রিক দেশে, সেই সঙ্গে সরকারের উচিত, পথে নামানোর আগে পুলিশকে আচরণবিধির প্রশিক্ষণ দেওয়া।‌

জনপ্রিয়

Back To Top