পার্থসারথি চ্যাটার্জি, হিউস্টন- নজরুলের সেই কবিতা মনে পড়ে যাচ্ছে— ‌‌‘‌যুগযুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান’‌। ফ্লয়েড হত্যার পর আমেরিকা জুড়ে যে বিক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়েছে, তাতে আমার মনে হয়, এর থেকে ভালভাবে তাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। দিনের পর দিন কৃষ্ণাঙ্গের ওপর অবিচার, প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈষম্য, কথায় কথায় অপমান তাদের ঠেলে দিয়েছে খাদের কিনারে। জর্জ ফ্লয়েডের ঘটনাটি সেই বারুদের স্তূপে আগুন ধরিয়েছে। আমেরিকার পুলিশ বরাবরই সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচারের জন্য কুখ্যাত। সে জন্য ক্ষোভ আছেই। তার ওপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নানা বর্ণবৈষম্যমূলক মন্তব্য, সংখ্যালঘু–বিরোধী নীতিতে সমালোচনার ঝড় ওঠে প্রায়ই। আর এইসবের বহিঃপ্রকাশ হল কৃষ্ণাঙ্গ ফ্লয়েডের ওপর শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার শোভেনের নির্মম অত্যাচার। তা–ও লঘু পাপে গুরু দণ্ড। 
অভিযোগ, ফ্লয়েড মিনিয়াপোলিসের এক পাড়ার দোকানে নাকি একটা জাল কুড়ি ডলারের নোট চালানোর চেষ্টা করেছিল। সে জন্য তাকে ৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড ধরে ঘাড়ে হাঁটু দিয়ে চেপে দম বন্ধ করে মেরে ফেলায় শুধু আমেরিকা নয়, সারা পৃথিবীর মানুষ চরম বিস্মিত, ক্ষুব্ধ। এই ঘটনা আসলে কিন্তু এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের সিরিজে নয়া সংযোজন। সারা বছর আমেরিকার নানা প্রান্তে এরকম ঘটেই চলে। কোনওটা আমরা জানতে পারি, কোনওটা না। ফ্লয়েড হত্যার যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়াতে, সবার ক্ষেত্রে হয়তো সেই সুযোগ থাকে না। নয়তো অত্যাচারের ঘটনা ঘটে গোপন কোনও জায়গায়, যেখানে সাক্ষী থাকে না। শোভেন ও তার সঙ্গী পুলিশেরা এতটাই বেপরোয়া ও বর্ণবিদ্বেষী যে প্রকাশ্যে এই বর্বরোচিত আচরণ করতে তাদের বুক কাঁপেনি।
হিউস্টনের বাসিন্দা হিসেবে কোথায় যেন ফ্লয়েডের সঙ্গে আত্মীয়তা বোধ করছি, কারণ সেই ৪৬ বছরের মানুষটি আসলে এই শহরের লোক। এখানকার থার্ড ওয়ার্ডে তাঁর বাড়ি। সেখানে তাঁর পরিবারের লোকেরা থাকেন। তাঁকে আমি চিনতাম না। চেনার কথাই নয়। তবু যখন খবরে দেখলাম তাঁর ছোটবেলার স্কুলশিক্ষকের সাক্ষাৎকার, যিনি বলছেন ফ্লয়েড নাকি সেকেন্ড গ্রেডে পড়ার সময় রচনা লিখেছিল, সে বড় হয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হতে চায়, তখন চোখ ভিজে উঠল। এটা না হয় অনেক বড় চাওয়া, কিন্তু সাধারণভাবে খেয়েপরে বেঁচে থাকার অধিকার তো যে কোনও নাগরিকের থাকা উচিত। সেটা না পেলে তো মানুষ খেপে উঠবেই। খবরেই জানলাম, ফ্লয়েড কিশোর বয়স থেকেই ভাল বাস্কেটবল আর ফুটবল খেলত, স্কলারশিপও পেয়েছিল। এছাড়া বহু কৃষ্ণাঙ্গ ছেলের মতো সে–ও ভাল র‌্যাপ গাইত। খেলা আর গানে তার কিছু নামডাকও হয়েছিল একসময়। পরে হয়তো রুটিরুজির দায়ে এ সব প্রতিভা চাপা পড়ে গেছিল। কিন্তু সে তো আর পাঁচজন যেমন চায়, সেরকম নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিল। তাকে নিঃশ্বাসই নিতে দেওয়া হল না।
হিউস্টনে ফ্লয়েডের শেষকৃত্য আগামী ৯ জুন। তার আগে এখানে রোজই প্রতিবাদ মিছিল বেরোচ্ছে। তবে শান্তিপূর্ণ। যেমন গত মঙ্গলবার ফ্লয়েডের আত্মীয়রা যে মিছিলের ডাক দিয়েছিলেন, তাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাজার হাজার মানুষ শামিল হয়েছিলেন। ডিসকভারি গ্রিন থেকে সিটি হল পর্যন্ত সেই মিছিল ছিল একেবারেই শান্তিপূর্ণ। প্রচুর পুলিশও মোতায়েন ছিল। মিছিলে স্লোগান ওঠে, ‘‌নট আ ড্রপ অফ ব্লাড ইন হিউস্টন’‌। গন্তব্যে পৌঁছে সবাই হাঁটু মুড়ে বসে ৩০ সেকেন্ড নীরবতা পালন করেছেন ফ্লয়েড স্মরণে। মিছিলে কৃষ্ণাঙ্গদের সংখ্যা বেশি থাকলেও বহু শ্বেতাঙ্গকেও দেখা গেছে। অনেকের হাতেই ছিল পোস্টার, কাট আউট। একটি শ্বেতাঙ্গ পরিবারকে দেখা গেল ‘‌উই রিপেন্ট’‌ লেখা পোস্টার তুলে ধরতে। কৃষ্ণাঙ্গ মহিলারা মাস্ক, জলের বোতল বিলি করছিলেন। কোনও গন্ডগোলের খবর না থাকলেও নিউজে দেখলাম, রাত এগারোটার পরও পথে থেকে যাওয়ার কারণে বেশ কিছু প্রতিবাদীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।  আমেরিকার নানা প্রান্তে গত ক’‌দিনে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন অন্তত তেরো–চোদ্দো হাজার মানুষ।
একটা জিনিস দেখে খারাপ লাগে। সাইক্লোন হোক কি বন্যা কি প্রতিবাদ বিক্ষোভ, কিছু সমাজবিরোধী সেই সুযোগে দোকানে, শপিং মলে লুঠতরাজ চালায়। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। দামি জামাকাপড় থেকে ইলেকট্রনিক পণ্য, অবাধে লুঠ করছে তারা। এটা কিন্তু বন্ধ করা উচিত পুলিশের।
সম্প্রতি ফ্রান্সে এক কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরের মৃত্যু ঘিরে বিক্ষোভ চলছে। সারা পৃথিবীকে বুঝতে হবে— গায়ের রং, ধর্ম, দেশ কোনও কিছুর ভিত্তিতে বৈষম্য করাটা মানবতার অপমান। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে সব নাগরিকের সমান অধিকার। নয়তো ফ্লয়েডের ঘটনা  ঘটেই চলবে।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top