সংবাদ সংস্থা, ওয়াশিংটন, ৫ জুন- ৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। জর্জ ফ্লয়েডের গলা হঁাটু দিয়ে চেপে রেখেছিল মিনিয়াপোলিসের চারজন পুলিশ অফিসার। বৃহস্পতিবার ফ্লয়েডের স্মরণসভায় যঁারা হাজির হয়েছিলেন, তঁাদের ঠিক অতক্ষণই নীরবতা পালনের অনুরোধ জানিয়েছিলেন রেভারেন্ড আল শার্পটন। বলেছিলেন, ফ্লয়েড কী অসম্ভব যন্ত্রণার মধ্যে ওই ৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড কাটিয়েছিলেন, কী কাতর গলায় নিজের প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলেন, সেটা অনুভব করার চেষ্টা করুন। ভায়োলেন্স ইন বস্টন ইনকর্পোরেটেড নামে যে–‌সংস্থা গত মঙ্গলবার ফ্লয়েডের স্মরণে একই ভাবে ৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডের নীরবতা পালন করেছিল, তার প্রতিষ্ঠাতা মনিকা ক্যানন গ্রান্ট বলেন, ‘‌এই সামান্য সময় অবাস্তবকে বাস্তবে বদলে দিয়েছে। বুঝিয়েছে, কারও হঁাটু দিয়ে আপনার গলা চেপে রাখার পক্ষে এটা একটা দীর্ঘ সময়। এটা চলতে দেওয়া যায় না। বঁাচা যায় না এভাবে।’‌
এদিন ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে, মার্কিন সেনেটের এমানসিপেশন হলে ডেমোক্র্যাট সেনেটররাও সমবেত ভাবে ওই ৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডের নীরবতা পালন করেন। সেনেটরদের অনেকেই হঁাটু গেড়ে বসেন মার্বেল দিয়ে তৈরি   হলঘরের মেঝেয়। তবে গভীর শোকের আবহ ছিল মিনিয়াপোলিসে। সেখানে দেওয়ালে অঁাকা হয় ফ্লয়েডের ছবি, তার সামনে রাখা ফ্লয়েডের শবাধারে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হয়েছিলেন সেলেব্রিটি থেকে মানবাধিকার কর্মী, রাজনৈতিক নেতা থেকে সাধারণ মানুষ। সেই সমাবেশের বার্তা ছিল:‌ ‘‌এবার ফ্লয়েড নিঃশ্বাস নিতে পারছেন’‌।‌ সবাইকে আরও একবার মনে করিয়ে দিতে শোনানো হয় ফ্লয়েডের শেষ আকুতি:‌ ‘‌আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না!‌ আমাকে উঠে দঁাড়াতে দিন!‌’‌
মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদরা বলছেন, এভাবেই একটি মৃত্যুর খুঁটিনাটি প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। এর আগেও আমেরিকায় এমনটা ঘটেছে। ২০১৪ সালে পুলিশের গুলিতে খুন হয়েছিলেন ১৮ বছরের কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ মাইকেল ব্রাউন। শোনা যায়, পুলিশের উদ্যত বন্দুকের মুখে মাইকেল বলেছিলেন, ‘‌আমি মাথার ওপর হাত তুলে আছি। আমাকে গুলি করবেন না।’‌ তার পরেও গুলি চলে এবং মারা যান মাইকেল। সেই ঘটনার কোনও ভিডিও নেই। কাজেই জানা যায়নি, মাইকেল সত্যিই হাত তুলেছিলেন কি না, এবং তা সত্ত্বেও পুলিশ গুলি চালিয়েছিল কি না। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে মাইকেল ব্রাউনের সেই শেষ কথা। এবারেও ফ্লয়েডের হত্যার বিরুদ্ধে বিক্ষোভরত জনতার মুখে শোনা গেছে পুলিশের উদ্দেশে গর্জন:‌ ‘‌গুলি করবেন না। মাথার ওপর হাত তুলে আছি।’‌ ফ্লয়েডের ৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডও সেভাবেই আমেরিকার মানুষের প্রতিবাদ, আন্দোলনের ইতিহাসে জায়গা পেয়ে গেল।
মিনিয়াপোলিস ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে আমেরিকার সব ক’‌টি বড় শহরে এদিন নীরব বিক্ষোভে স্মরণ করা হয়েছে জর্জ ফ্লয়েডকে। লোকের হাতে হাতে ঘুরেছে পোস্টার:‌ কৃষ্ণাঙ্গদেরও জীবনের দাম আছে। ন্যায়বিচার না পেলে শান্তিও পাওয়া যাবে না। লস এঞ্জেলেস শহরে ক্রুদ্ধ জনতার স্লোগানের তালে–‌তালে বেজেছে ড্রাম। লোকে সমবেত কণ্ঠে গান গেয়েছে। মিছিলে পথ আটকেছে গাড়ির। সেই সারিবদ্ধ গাড়ির জানলা থেকেও লোকে ‘‌জাস্টিস’‌ লেখা প্ল্যাকার্ড তুলে ধরেছেন। বিরাট বিরাট মিছিল হয়েছে নিউ ইয়র্কে, শিকাগোয়। হাজার হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণ ভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।‌‌ আসলে জর্জ ফ্লয়েডের এই ঘটনা এমনতর সব ঘটনার বিচ্ছিন্নতাকে সহসাই এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর যেমন, তেমনই অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষেরা ফ্লয়েডের ঘটনার প্রতিবাদকে তাঁদের ওপর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলতে থাকা বঞ্চনা ও বৈষম্যের এক আধার হিসেবে বেছে নিয়েছেন। আধেয় খুঁজে পেয়েছে এক সঙ্গত আধার। আর মানুষ ফেটে পড়েছে প্রতিবাদে।

জনপ্রিয়

Back To Top