আজকালের প্রতিবেদন- আজ, মঙ্গলবার সুইডেনের স্টকহলমের কনসার্ট হলে ‘‌মর্তের সেরা সম্মান’‌ নোবেল পুরস্কার দেওয়া হবে। এবারের নোবেল ঘিরে বাঙালি ফুটছে উত্তেজনায়। কারণ তার ঘরের ছেলে সেই পুরস্কার পাবে। অনেক বছর সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে থেকেও যে–‌ছেলের বাঙালিত্বে খাদ মেশেনি। স্টকহ‌লমের রাস্তায় দ্রুত পায়ে হঁাটতে–হঁাটতে ঝরঝরে বাঙলায় জানান দিতে পারেন নিজের ভাল লাগা মন্দ লাগা। একটুও হেঁাচট না খেয়ে আউড়ে যেতে পারেন জীবনানন্দ বা শক্তি চট্টোপাধ্যায়। অবলীলায় বলে দিতে পারেন বাঙালি হালুয়া আর মারাঠি হালওয়া–‌র তফাতের রেসিপি। জানিয়ে দিতে পারেন, কোন্‌ রান্নায় ঠিক কতটা ঘি লাগে। অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জি মনে করেন, মাতৃভাষা ভোলা অত সহজ নয়। দীর্ঘ দিন বিদেশে বসবাসের কারণে যঁারা বলেন, বাঙলাটা ঠিক আসে না, সেটা অজুহাত ছাড়া আর কিছুই নয়।
আজ ভারতীয় সময় সন্ধে সাড়ে ৬টায় স্ত্রী এস্থার দুফলোকে সঙ্গী করে অভিজিতের হাতে উঠবে দুনিয়ার সেরা সম্মান। যদিও এজন্য একেবারেই গর্বে ডগমগ নন অভিজিৎ। সোজাসাপ্টা জানিয়ে দেন, অর্থনীতিতে তাঁর কাজই শেষ এবং সর্বোত্তম নয়। যত দিন যাবে, ততই বেরোবে নতুন পথ। নতুন চিন্তা–‌চেতনা সব সময়ই পুরনোকে ঠেলা দেয়। আর তখন নতুন আবিষ্কারের ভিত্তিভূমিতে আর পুরনো তত্ত্ব খাটে না। তবু একজন ভারতীয় এবং বাঙালি হিসেবে এই সম্মান পেয়ে তঁার ভাল লাগছে। কারণ অতীতে ভারতীয়দের কাজ গুরুত্বই পেত না। মনে করা হত প্রাথমিক কাজটি অবশ্যই কোনও ইউরোপিয়ানই করেছেন। আর এ ধারণারই হয়তো খেসারত দিয়েছেন জগদীশচন্দ্র বসু। এখনকার সময় হলে নিশ্চয় মার্কনির সঙ্গে যৌথ ভাবে নোবেল পেতেন জগদীশও। এই মানসিকতাতেই হয়তো মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কাজও সমাদর পেল না। তবে অভিজিৎ আত্মবিশ্বাসী, আগামীতে আরও অনেক বাঙালি নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন। পদার্থবিদ্যার সমর বন্দ্যোপাধ্যায় তেমনই একজন।  
অবাক কাণ্ড!‌ বিশ্বসেরা এক মানুষের নাকি ছাত্রজীবনে কেরিয়ার নিয়ে কোনও ভাবনা–‌চিন্তাই ছিল না!‌ এমনকী দিল্লির জেএনইউ–তে পড়ার সময়ও ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা ছিল না তাঁর। সেজন্যই ছাত্র–‌রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে তিহার জেলে রাত কাটাতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা দুশ্চিন্তার কারণ হয়নি। মনে হয়নি, জেল খাটার কারণে আটকে যেতে পারে লেখাপড়ার রাস্তা। বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রেও আসতে পারে বাধা। নিতান্ত ‘‌করতে হবে বলেই’‌ নাকি শুরু করেছিলেন পিএইডি–র কাজ। নোবেল তো দূর অস্ত্‌, কখনও স্বপ্নেও ভাবেননি যে অর্থনীতি নিয়ে এত গভীর চিন্তায় মগ্ন হবেন কস্মিনকালেও। আর তাই বোধ হয় জেএনইউয়ের সাম্প্রতিক আন্দোলনকে কিছুটা প্রশ্রয়ের চোখেই দেখেন এই ‘‌নোবেল লরিয়েট’‌। বলেছেন, ওই ছেলেমেয়েগুলোকে ‘‌জাতীয়তা–‌বিরোধী’‌ বলে গুরুত্বপূর্ণ শব্দটার অপচয় হচ্ছে। ওই পড়ুয়ারা দেশকে নিজেদের মতো করে ভালবাসে। বয়সের উদ্দীপনায় ওরা যে–‌কাজ করছে, সেটাকে এভাবে হেয় করার কারণ নেই। ওদের উৎসাহ নষ্ট করার কোনও মানেই হয় না। ওরা বামপন্থাকে ভালবাসে। এতে খারাপের কী আছে!‌‌ বামপন্থীরা নিজেদের একটা ভুলে নিজেদের পাঁচরকম ভাবে ভেঙে ফেলেছে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূলই হোক বা বিহারের বিজেডি— সবই বামপন্থী দল ভেঙে তৈরি হয়েছে। 
অভিজিৎ এবং এস্থার— দু’‌জনের পুরস্কার–‌মূল্য বিরাট। কী করবেন এই টাকায়?‌ নিজেদের জন্য রাখবেন না কানাকড়িও। দিয়ে দেবেন পরবর্তী প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের গবেষণার কাজে। যে–‌সমস্ত নতুন ছেলেমেয়ে অর্থনীতি নিয়ে অন্য ধরনের গবেষণা চালাতে চায়, তারা যাতে অর্থের অভাবে কাজ থেকে সরে আসতে বাধ্য না হয়, সেদিকটিই সুরক্ষিত করবে অভিজিৎ–এস্থারের নোবেল–অর্থ। কিন্তু আপাতত বড্ড ক্লান্ত। নোবেল–‌প্রাপক হিসেবে নাম ঘোষণার পরই কাজের চাপ বেড়ে গেছে বহু গুণ। এবার একটু বিশ্রাম চাইছেন। পুরস্কার–‌পর্ব চুকে গেলেই ফিরতে চাইছেন নিজস্ব নিরিবিলি জগতে।

 

খাঁটি বাঙালি। নোবেল পুরস্কার প্রাপকের ভাষণে পাঞ্জাবি আর নেহরু জ্যাকেটে অভিজিৎ ব্যানার্জি। রবিবার। ছবি:‌ এএফপি

জনপ্রিয়

Back To Top