আজকালের প্রতিবেদন: বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন দিশাহারা। সেখানে করোনাই কোণঠাসা ভারতের এক ছোট্ট রাজ্যে। সাড়ে তিন কোটি কেরলবাসীর মধ্যে করোনায় মৃত্যু মাত্র চারজনের!‌ এই অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যে এক শিক্ষিকা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দূরদর্শিতা আর সুপরিকল্পনা। সেই কে কে শৈলজা গোটা বিশ্বেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ‘‌দ্য গার্ডিয়ান’‌‌–‌এর মতো পত্রিকাও প্রশংসায় মুখর। কী লেখা হয়েছে সেখানে?‌ তারই এক ঝলক এখানে।
আমাদের প্রাচীন মুনিঋষিরা পইপই করে বলতেন, ‘‌চিন্তনীয়া হি বিপদম আদায়েব কর্তব্য’। মানে, বিপদ আসার আগেই চিন্তা করা দরকার। তাঁদের যুক্তি ছিল, আগুন লাগলে কুয়ো খুঁড়তে যাওয়া কোনো কাজের কথা নয়। এই উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে মনে রেখেছেন কে কে শৈলজা। আর মনে রাখাই নয়, তাকে কাজে প্রয়োগ করেছেন। ফল পেয়েছেন হাতে হাতে। সে কারণেই কেরালার ৬৩ বছরের এই মন্ত্রী কে কে শৈলজা শুধু রাজ্যবাসীরা কাছেই নয়, গোটা দেশেই চর্চিত নাম। কী করেছেন শৈলজা?‌
জানতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে গত ২০ জানুয়ারি। শৈলজার নজর আটকে যায় একটা ছোট্ট খবরে— চীনে নতুন এক ধরনের বিপজ্জনক ভাইরাস ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে। মুহূর্তে বিপদের গন্ধ পান। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেন এমন এক ডেপুটিকে যাঁর চিকিৎসা–‌প্রশিক্ষণ আছে। জানতে চান— ‘‌এই ভাইরাস কি আমাদের এখানেও এসে পড়বে?’‌‌ ডেপুটির উত্তর ছিল, ‘‌নিশ্চিতভাবেই আসবে ম্যাডাম।’‌ ব্যস, আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেন না কেরলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। শুরু করে দেন যুদ্ধকালীন তৎপরতা।
এর চার মাস পর। কেরলে ৫২৪ জনের মধ্যে কোভিড–‌১৯ সংক্রমণ ধরা পড়ে। মৃত্যু হয় চারজনের। শৈলজা জানান, গোষ্ঠী সংক্রমণ হয়নি। কেরলের জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটি। মাথাপিছু জিডিপি ২,২০০ পাউন্ড। অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের মতো দেশকে দেখুন!‌ ‌জনসংখ্যায় দ্বিগুণ, মাথাপিছু জিডিপি ৩৩ হাজার পাউন্ড। মৃত্যু হয়েছে ৪০ হাজার মানুষের। বিশ্বের সর্বশক্তিমান দেশ আমেরিকায়?‌ ‌জনসংখ্যা ১০ গুণ, জিডিপি মাথাপিছু ৫১ হাজার পাউন্ড!‌ সেখানে মৃতের সংখ্যা ৮২ হাজার। দুটো দেশেই যথেচ্ছ গোষ্ঠী সংক্রমণ হয়েছে। 
একটা সময়ে স্কুলে বিজ্ঞানের শিক্ষিকা ছিলেন শৈলজা। এখনও তাঁকে শৈলজা টিচার বলা হয়। রাজ্যবাসী অবশ্য আদরে–‌ভালবাসায় নানা নামে ডাকতে শুরু করেছেন। কেউ বলছেন ‘‌করোনাভাইরাস স্লেয়ার’‌, কারও কাছে তিনি ‘‌রকস্টার হেল্‌থ মিনিস্টার’‌। যদিও সদা হাসিখুশি, চশমা–‌পরা এই মহিলার সঙ্গে একেবারেই বেমানান এই সব বিশেষণ। তবে সর্বত্র ছড়িয়ে–‌পড়া প্রশংসা থেকে এটা পরিষ্কার, গণতান্ত্রিক কাঠামোতেও সংক্রমণকে স্থানবন্দী করে ফেলা যায়, সে দেশ গরিব হলেও।
কেমন করে সাফল্য?‌
২০ জানুয়ারি চীনে নতুন ভাইরাস সংক্রমণের খবরটা পড়ার তিনদিন পর এবং কেরালায় প্রথম করোনা–‌আক্রান্ত ধরা পড়ার আগে শৈলজা প্রথম বৈঠক করেন র‌্যাপিড রেসপন্স টিমের সঙ্গে। পরের দিন, ২৪ জানুয়ারি, এই টিমটা একটা কন্ট্রোল রুম খুলে ফেলে। একই সঙ্গে কেরলের ১৪টি জেলার মেডিক্যাল অফিসারদের নির্দেশ পাঠায় স্থানীয় পর্যায়ে কন্টোল রুম খুলে ফেলতে। এসবের মধ্যেই ২৭ জানুয়ারি প্রথম করোনা–‌আক্রান্ত উহান থেকে বিমানে কেরলে এসে হাজির হন। রাজ্য ততক্ষণে মোকাবিলায় পুরো দস্তুর তৈরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা মেনে যাত্রীদের হয় পরীক্ষা, চিহ্নিতকরণ, বিচ্ছিন্ন করা এবং সহায়তা দেওয়া। বিমান থেকে নামতেই শারীরিক তাপমাত্রা পরীক্ষায় তিনজনের জ্বর ধরা পড়ে। তাঁদের বিচ্ছিন্ন করে স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়। বাকিদের বাড়িতেই কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। সেখানে পৌঁছে দেওয়া হয় কোভিড–‌১৯ সংক্রান্ত প্রচারপত্র। যেগুলো স্থানীয় মালয়ালাম ভাষায় আগেই ছাপিয়ে রাখা হয়েছিল। হাসপাতালে পাঠানোদের করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। তাতে কি!‌ রোগ ততক্ষণে বন্দী হয়ে পড়েছে!‌ শৈলজা জানালেন, যুদ্ধজয়ের এটাই প্রথম পর্ব। ওদিকে ভাইরাস চীন ছাড়িয়ে দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে আসে উটকো বিপদ। ভেনিস থেকে এক মালয়ালি পরিবার বিমানে দেশে ফেরে। ওরা কৌশলে ভ্রমণ–‌তথ্য চেপে গিয়ে শৈলজার নজরদার দলের চোখকে ফাঁকি দিলেও মেডিকেল টিম ওদের একজনের করোনা পজিটিভ পায়। ততক্ষণে বিপদ যা ঘটার ওরা ঘটিয়ে ফেলেছে। কয়েকশো লোকের সঙ্গে মেলামেশা করেছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা হল ছাড়েন না। বিজ্ঞাপন ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে খবরটা ছড়িয়ে ওদের সবাইকে খুঁজে বের করে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়। ওঁদের ছজনের মধ্যে কোভিড–‌১৯ ছড়িয়েছিল।
এরকম আরেকটা দলকেও স্থানবন্দী করা হয়েছিল। কিন্তু পরের দিকে গাল্‌ফ অঞ্চলে কাজ করতে যাওয়া বহু কর্মী কেরলে ফিরতে শুরু করে। ওদের অনেকেই করোনাভাইরাস বহন করছিল। ফলে ২৩ মার্চ রাজ্যের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সমস্ত উড়ান থামিয়ে দেওয়া হয়। এরই দু দিন পরে ভারত জুড়ে শুরু হয় লকডাউন।
তবে ভারতে কোভিড–‌১৯ এসে পৌঁছনোর আগেই শৈলজা সেলিব্রিটি হয়ে উঠেছিলেন। গত বছর ‘‌ভাইরাস’‌ নামে একটি ছবি মুক্তি পায়। ২০১৮–‌য় আরও ভয়ঙ্কর নিপা ভাইরাস মোকাবিলায় ওঁর ভূমিকা নিয়ে তৈরি। ছবিতে ওঁর ভূমিকায় যিনি অভিনয় করেন, তাঁকে উদ্বিগ্ন দেখানো হয়েছিল। শৈলজা জানান, তিনি মোটেই চোখেমুখে উদ্বেগ ফুটিয়ে তোলা পছন্দ করেন না। শুধু কর্মদক্ষতার কারণেই নয় শৈলজা যেভাবে ভাইরাস–‌আক্রান্ত বিভিন্ন গ্রামে সশরীর হাজির হন, তাও উচ্চ প্রশংসিত হয়। শৈলজা জানান, গ্রামবাসীরা আতঙ্কে গ্রাম ছেড়ে পালানোর তোড়জোড় করছিল। তিনি যাওয়ায় তারা সাহস পায়। তিনি গ্রামবাসীদের কী করতে হবে, কোনটা করা যাবে না বুঝিয়ে দেন। রোগের মোকাবিলা করা সহজ হয়।
রাজস্থানের ভিলওয়াড়া মডেল নিয়ে অনেক প্রচার হচ্ছে। কিন্তু শৈলজার এই লড়াই এখন গোটা দেশের কাছেই এক বিরল দৃষ্টান্ত।‌

জনপ্রিয়

Back To Top