সাগরিকা দত্তচৌধুরি: আষাঢ় মাস পড়লেও দহনজ্বালা কমছে না। গত কয়েকদিন ধরেই ৩৮, ৩৯ এমনকী ৪০ ডিগ্রি ছুঁয়েছে তাপমাত্রার পারদ। চড়া রোদে, শুকনো হাওয়ায় প্রাণ ওষ্ঠাগত রাজ্যবাসীর। আবহাওয়া দপ্তরের সতর্কবাণী বলছে, আপাতত জোর বৃষ্টি হবে মিলবে না। কলকাতা–সহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করেছে হাওয়া অফিস। প্রখর গরমে ডিহাইড্রেশন, সানস্ট্রোক, মাথা ঘোরা, পেটের গোলমাল ছাড়াও ত্বকের সমস্যা বেশি হয়। তাই সাবধান হওয়ার পরামর্শ চিকিৎসকদের। প্রয়োজন না পড়লে বাইরে না বেরোনোর নিদান দিচ্ছেন তাঁরা। বিশেষত শিশু এবং বয়স্কদের ও বাইরে রোদে কর্মরতদের বেশি সাবধান হতে হবে। 
আরএন টেগোরের জেনারেল মেডিসিনের চিকিৎসক অরিন্দম বিশ্বাস বলছেন, ‘‌অতিরিক্ত ঘামের ফলে শরীরে সোডিয়াম, পটাশিয়ামের মাত্রা কমে যায়। তা পূরণে হেল্‌থ ড্রিঙ্ক, ওআরএস, নুন–চিনি মিশ্রিত জল খাওয়া দরকার। সাধারণত এক লিটার ঘামে শরীর থেকে ৫৫০ কিলোক্যালরি তাপ এবং ৩ লিটার ঘাম উৎপন্ন হলে ১৭০০ কিলোক্যালরি তাপ নির্গত হয়। কিন্তু প্রচণ্ড গরমে হিটস্ট্রোক হলে শরীর ঘামে না। মানুষ অচৈতন্য হয়ে পড়ে, কিডনিতে চাপ পড়ে, হার্ট ফেলিওর হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়াও গরমে হিট এক্সজশন হয়ে বমি ভাব, অস্বস্তি, মাথা ঘোরা, ঝিমিয়ে পড়ার মতো অবস্থা হয়। তখন সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা জায়গায় বসিয়ে বগল, কুচকি, চোখে–মুখে জলের ঝাপটা, আইস প্যাক দিতে হবে।’‌ 
এনআরএসের গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি বিভাগের ডাঃ মানস মণ্ডলের কথায়,‘‌প্রচণ্ড গরমে গ্যাস, অম্বল, পেটের সমস্যা নিয়ে বেশিরভাগ রোগী আসছেন। পরিস্রুত জল, ডাবের জল খেতে হবে।’‌ শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ প্রভাসপ্রসূন গিরি বলছেন,‘‌এখন স্কুল খুলে যাচ্ছে। শিশুরা যাতে বেশি করে জল, ওআরএস খায়, েসদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে শিক্ষক–শিক্ষিকাদের। রোদে খেলাধুলা না করাই ভাল। এই সময়ে ভাইরাল ফিভার, জ্বর, টাইফয়েড অর্থাৎ বর্ষা ও গরম দুই ঋতুর রোগের লক্ষণই দেখা যাচ্ছে।’‌ 
বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সের নিউরো মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডাঃ শ্যামলকুমার দাস জানাচ্ছেন, মস্তিষ্কের মধ্যে হাইপোথ্যালামাস গ্রন্থি দ্বারা শরীরের ভিজে ভাব নিয়ন্ত্রিত হয়।‌ ‌অতিরিক্ত তাপমাত্রায় মস্তিষ্কে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় অনেক সময় কেউ কেউ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। শরীর গরম হলে ঘাম না হলে শরীরের তাপমাত্রা আরও বেড়ে গেলে মস্তিষ্কে প্রভাব পড়ে। যাঁরা সারাদিন বাইরে রোদে কাজকর্ম করেন, তাঁদের সানস্ট্রোক বা হিটস্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এক ধাক্কায় ১০৩–১০৪ ডিগ্রি শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়।’‌
হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, হিটস্ট্রোক সরাসরি হার্টের সঙ্গে সম্পর্কিত না–হলেও একেবারে বিপদের ঝুঁকি উড়িয়েও দেওয়া যায় না। শরীরের তাপমাত্রা আচমকা অনেক বেড়ে গেলে বিভিন্ন অঙ্গে প্রভাব পড়ায় সেগুলি কার্যকারিতা হারাতে থাকে। হৃৎস্পন্দন অনেক গুণ বেড়ে যায়। তাই যাঁদের হার্টের সমস্যা আগে থেকেই রয়েছে, গরমে তাঁদের হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বেশি থাকে।

কী করবেন:
 সুতির ঢিলেঢালা পোশাক
 সহজপাচ্য খাবার খাবেন
 বেশি জল, ফলের রস
 শরীরে ইলেক্ট্রোলাইট মাত্রা রাখতে জলের সঙ্গে লেবু, নুন, চিনি মিশিয়ে খান
 দিনে দু–তিন বার স্নান
 ভিজে কাপড় দিয়ে মাঝে মাঝে চোখ–মুখ–গা স্পঞ্জ
 ছাতা, স্কার্ফ, সানগ্লাস ব্যবহার করুন
 গুরুত্বপূর্ণ কাজ সকালে সেরে নিন
 পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন থাকুন
 জ্বর হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

কী করবেন না:
 কোল্ড ড্রিঙ্ক, আইসক্রিম, তেল–ঝাল, ভাজাভুজি মশলাদার খাবার নয়
 বাইরের খাবার, জল, কাটা ফল নয়
 প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার বেশি নয়
 রোদ থেকে এসেই এসির মধ্যে বা এসি থেকে বেরিয়েই রোদে নয়
 অপ্রয়োজনে রোদে বেরোবেন না 
 পাউডার, কোনও মলম বা জীবাণুনাশক সাবান নয়
 জ্বর হলে নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক নৈব নৈব চ‌

জনপ্রিয়

Back To Top