উদ্ভাবন ও উদ্যোগ, এই দুই বিষয়ের ওপর টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপ এবং সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটি পড়ুয়াদের সামনে বক্তব্য পেশ করতে এমনটাই জানালেন টাটা ইএলএক্সএসআই–এর চিফ স্ট্র‌্যাটেজিস্ট কৌশিক মণ্ডল। লিখছেন অর্য্যাণী ব্যানার্জি।

 

তুমি একজন উদ্যোগপতি হতে চাইবে কেন?‌ পড়ুয়াদের সঙ্গে কথার শুরুতেই এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন কৌশিকবাবু। পড়ুয়াদের উত্তর শুনে মুচকি হেসে তাঁর প্রত্যুত্তর, ‘‌কাস্টমার সার্ভিস, মার্কেটিং রিসার্চ এবং প্রোগ্রামিং–এর পুরো ধারণাটা আজ অটোমেটেড (‌স্বয়ংক্রিয়)‌ হয়ে পড়েছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে ডেটা সায়েন্টিস্ট এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইঞ্জিনিয়ারের মতো নতুন কর্মক্ষেত্র প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে। আগামি দুই বা তিন দশক পর সম্ভবত আমরা দেখতে পাব, বড় কোম্পানিগুলোর বদলে ছোট কোম্পানিগুলোই মুখ্য নিয়োগকারীর ভূমিকা পালন করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে ইতিমধ্যেই এই দিনবদলের পালা শুরু হয়ে গেছে। তাই, নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরির ভূমিকা কেবল বড় ব্যবসায়ীরাই পালন করবেন, এমনটা আর বলা যায় না। সেই জায়গা নিতে শুরু করেছেন নতুন দশকের উদ্যোগপতিরা।’‌
কিন্তু, একজন কর্মচারী আর উদ্যোগপতির মধ্যে পার্থক্যটা কোথায় হয়?‌ এই প্রশ্নের উত্তরে কৌশিকবাবু বললেন, ‘‌পড়ুয়াদের কাছে নিজের কোনও বক্তব্য পেশ করার সময় সবার আগে আমি এই ব্যাপারটা নিয়েই আলোচনা করি। একজন উদ্যোগপতি হতে গেলে সবার আগে তোমায় কোনও সমস্যা সমাধানে অসম্ভব আগ্রহী (‌‘‌প্যাশনেট’ বলাই ভাল‌)‌ হতে হবে, যা উদ্যোগপতি হিসেবে জীবন শুরুর একেবারে প্রথমেই তোমায় সামলাতে হবে। এই সমস্যার সমাধান করতে পারলে তোমার সামলাতে হবে যে সমাধানটা তুমি বার করেছ, তা প্রয়োগ করার উপযুক্ত বাজার খোঁজার সমস্যা। কোনও সমস্যায় তোমার দেওয়া সমাধান আরও বেশি করে মানবকল্যাণে কাজে আসুক, সেটা নিশ্চয়ই চাইবে। তাহলে তোমাকে মানুষ বা মানব–চাহিদা সম্পর্কেও উৎসুক (‌‘‌অবসেসড’‌ কথাটাই বললে ভাল)‌ থাকতে হবে। একজন কর্মচারী আর উদ্যোগপতির মধ্যে মৌলিক ফারাকটা থাকে চিন্তাভাবনার পদ্ধতিতে। গ্রাহকের মানসিকতা বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়াটাই ব্যবসায়িক সাফল্যের প্রধান উপাদান।’‌
নিজের বক্তব্যের সমর্থনে তিনি কয়েকজন অসম্ভব সফল উদ্যোগপতির দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ তুলে ধরেন। এঁদের একজন ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের প্রতিষ্ঠাতা রাহুল ভাটিয়া, অপরজন অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস। কৌশিকবাবুর ব্যাখ্যা, ‘‌এঁরা শুধুমাত্র ভবিষ্যতেও চাহিদা স্থির থাকবে এমন ব্যাপারের ওপর লক্ষ্যস্থির রেখেই বিশ্বের অন্যতম বড় দুটো ব্যবসা চালাচ্ছেন।’‌
প্রথাগত ব্যবসার সঙ্গে প্রযুক্তির ঠিকঠাক মেলবন্ধন ঘটানোই যুগের চাহিদা। একটু বিশদে তাঁর ব্যাখ্যা, ‘‌আজকের ডিজিটাল যুগে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে কাজ করে। ব্যবসার মডেল যেমনই হোক না কেন, এটা সফল করতে গেলে প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগটাও বাছতে হবে। প্রতিনিয়ত বদলে চলা দুনিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে গেলে তোমাকেও সারা জীবন ধরে শেখার মানসিকতা রাখতে হবে। সর্বশেষ জ্ঞান আর দরকারি দক্ষতার যথাযথ মিশেলেই তোমার যাবতীয় উদ্যোগ সাফল্যের মুখ দেখবে।’‌
‘‌বলা যেতে পারে একটা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে তোমাকে চলতে হচ্ছে। এখান থেকে বেরোনোর পথ খুঁজে পেলে, সেটাই তোমাকে বেরোনোর পথ দেখিয়ে দেবে। কাজ তৈরি করতেই হবে। যদি কোনও স্টার্ট–আপ শুরু করো, প্রথমে জনা পাঁচেক কর্মীকে কাজ দাও আর উদ্যোগপতি হিসেবে জীবন শুরুর জন্য নিজেকেই বাহবা দাও।’‌
কৌশিকবাবুর এই ‘‌পেপ টকে’‌ সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটি এবং টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের পড়ুয়াদের উদ্ভাসিত চোখমুখই বলে দিচ্ছিল তারা সহজভাবে বলা সাফল্যের পথনির্দেশক এই কথাবার্তায় কতটা উদ্দীপিত।
টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের ডিরেক্টর, এইচআর অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি রিলেশনস ইনা বোস আলোচনাপর্বের সমাপ্তিও করলেন একই পথে, ‘‌কাজ দেওয়ার লক্ষ্যে এগোও, কাজ খোঁজার লক্ষ্যে নয়। কর্মচারী হিসেবেই কাটাতে চাইলে সারা জীবনে এক, দুই বা বড়জোর দশবার তোমায় ইন্টারভিউ সামলাতে হবে। কিন্তু উদ্যোগপতি হলে প্রত্যেকটা দিনই তোমায় একাধিকবার নিজের পণ্য বা পরিষেবা বিক্রির লক্ষ্যে ইন্টারভিউ সামলাতে হবে। এই চ্যালেঞ্জটা নিতে পারবে না?‌’‌

জনপ্রিয়

Back To Top