ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আস্ত একটা হাসপাতাল গড়েছেন। কিন্তু সেখানেই লড়াই শেষ হয়নি ‘পদ্মশ্রী’ প্রাপকের। জেনে নিলেন গৌতম চক্রবর্তী
‌‌ ‌অনেক ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে হাসপাতালটা গড়েছেন। ভারত সরকারের স্বীকৃতি হিসাবে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মান পেয়েছেন। হাসপাতাল নিয়ে আপনার পরবর্তী পরিকল্পনা কী?‌
সুবাসিনী মিস্ত্রী:‌ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বলতে এখন আমার একটাই ইচ্ছে। তা হল এই হাসপাতাল‌ ভাল করে চালানো। তার জন্য যা যা করা দরকার আমি করতে চাই। হাসপাতালের তৃতীয় তল তৈরি হচ্ছে।  চিকিৎসার সবরকমের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই। যাতে হিউম্যানিটি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে এসে একজন রোগীকেও ফিরে যেতে না হয়। যদিও তার জন্য অনেক অর্থের প্রয়োজন। সেই অর্থের যোগাড় হলেই এখানে সব রকমের চিকিৎসার পরিকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে। আমি মনে করি, সব মানুষের জন্যই চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষকে চিকিৎসার সুযোগ দিতেই হাসপাতাল গড়েছি। একসময় বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে রোগীরা চালাঘরে আসতেন। বর্ষাকালে এখানে এতটাই জল জমত। এখন অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। হাসপাতালের পাকাবাড়ি তৈরি হয়েছে। সর্বক্ষণ একজন চিকিৎসক থাকছেন। হাসপাতালের অন্তর্বিভাগে ৪৫টা বেড রয়েছে। কিন্তু এতেই বা কী হবে ! এত কমসংখ্যক বেড বা চিকিৎসক দিয়ে কি সব মানুষকে পরিষেবা দেওয়া যাবে ?‌ যাবে না। তাই এটাকে আরও বাড়াতে হবে। তবেই মানুষ এখানে এসে চিকিৎসার সুযোগ পাবেন। ‌তার জন্যই এখন আমার লড়াই। সেই নতুন লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে। আমার স্বপ্ন, এখানে প্রচুর গরিব রোগী আসবেন। তাঁদের আমরা সেবাযত্ন করে সু্স্থ করে তুলব। ভাল ভাল চিকিৎসকরা এখানে রোগী দেখবেন। তাঁদের চিকিৎসায় মানুষ সুস্থ হয়ে উঠবেন। হাসপাতালে প্রচুর নার্স ও আয়া কাজ করবেন। গরিব মানুষের কাছে এই হাসপাতালই হয়ে উঠবে তাদের রোগমুক্তির পীঠস্থান। এখানে ছাড়াও সুন্দরবনের গোসাবাতে একটা হাসপাতাল গড়ে তোলা হচ্ছে। সুন্দরবনের মানুষের অনেক কষ্ট। আমরা জানতামই না। তাই পিছিয়ে পড়া মানুষকে স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার জন্য ওখানেও একটা হাসপাতাল গড়ার চেষ্টা করছি। আর এই হাসপাতালের জায়গার মধ্যেই ৩০ জন থাকতে পারেন এমন একটি বৃদ্ধাবাসও গড়ে তোলা হয়েছে।
‌‌ ‌এই মুহূর্তে হাসপাতালে সব থেকে বেশি কীসের প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন ?‌
সুবাসিনী:‌ অনেক কিছুরই প্রয়োজন রয়েছে। হাসপাতাল তৈরি করেছি গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য। তাই রোগীদের অল্প টাকায় চিকিৎসা পরিষেবা দিতেই হয়। কিন্তু এখন তো আর কোনও জিনিসই বিনা পয়সায় পাওয়া যায় না। তাই সবকিছুই কিনে চালাতে হচ্ছে। হাসপাতালে কর্মী,  নার্স, চিকিৎসক মিলে প্রায় ৩৭ জন রয়েছেন। তাঁদের বেতন দিতে হচ্ছে। কেউ তো আর বিনেপয়সায় কাজ করবেন না। আগে বিনেপয়সায় ওষুধটা পাওয়া যেত। এখন সেটাও আর পাওয়া যায় না। ওষুধও কিনতে হয়। নামী চিকিৎসকদের আনতে গেলে তাঁরা ভাল পারিশ্রমিক নেন। সেটাও দিতে হয়। তাই বলতে গেলে প্রতিদিন হাসপাতাল চালানোর খরচ যোগাড় করতেই এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই খরচটা যদি কোনও জায়গা থেকে পাওয়া যেত, তাহলে হাসপাতাল চালাতে সুবিধা হত।
‌‌ ‌আপনি ‘পদ্মশ্রী’ সম্মান পাওয়াতে বাংলা ছবির সুপারস্টার দেব খুবই খুশি। কী মনে হচ্ছে এটা শুনে?‌
সুবাসিনী:‌‌ আসলে এই সম্মান আমাকে দেওয়া হলেও আমি মনে করি, এই সম্মান আমার একার প্রাপ্য নয়। এই হাসপাতাল গড়তে যাঁরা সাহায্য করেছেন, এই সম্মান তাঁদের সকলের। আমার দুই ছেলে, দুই মেয়ে থেকে শুরু করে বহু সাধারণ মানুষ এগিয়ে এসেছিলেন হাসপাতালের সাহায্যে। কেউ হয়তো কায়িক পরিশ্রম করেছেন। আবার কেউ আর্থিক সাহায্য করেছেন। কেউ কেউ মানসিক সমর্থন দিয়েছেন। তারপরেই এই হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। তাই এই সম্মান পাওয়ায় তাঁদের সকলেরই ভাল লেগেছে।
‌‌ ‌দেব আপনাকে নিয়ে সিনেমা করবেন বলেছেন। দেবের সঙ্গে কি আপনার কখনও দেখা হয়েছে?‌
সুবাসিনী:‌‌ হয়েছে। কয়েকমাস আগেই উনি একবার আমাদের হাসপাতালে এসেছিলেন। হাসপাতালের এই ঘরে বসেই দেবের সঙ্গে কথা বলেছি। খুবই উজ্বল। ওঁর সঙ্গে কথা বলে ভাল লেগেছে। সবকিছু বলেছি। উনি একটা সিনেমা করবেন বলেছেন। কী সিনেমা জানি না। তবে আমার ছবি দিয়ে সিনেমা হবে বলে শুনেছি। আমার জীবনের প্রেক্ষাপটেই হয়ত সেই সিনেমা তৈরি হতে পারে। ওঁরাই সব করবেন। আমাকে কিছু করতে হবে না। তবে সিনেমা হলে তো ভালই লাগবে।
‌‌ ‌চোখের সামনে স্বামীকে মারা যেতে দেখে তিল তিল করে টাকা জমিয়ে গরিব মানুষের জন্য আস্ত একটা হাসপাতাল গড়লেন। আপনার মতো আর কোনও সুবাসিনীকে তৈরি করতে পেরেছেন?
সুবাসিনী:‌‌ এভাবে প্রশ্ন করে আমায় বিব্রত করবেন না। আমি লেখাপড়া জানি না। মুখ্যুসুখ্যু মানুষ। এমনকী, ঘড়ি দেখতেও পারি না। কাজেই আর কোনও সুবাসিনী তৈরি হয়েছে কি না, আমি তা কী করে বলব। কার মনে কী আছে বলা যায় কি ?‌ মানুষের মন বোঝা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি শুধু নিজেরটাই বলতে পারি। আমার দুই ছেলে, দুই মেয়ে সবসময় আমার পাশে থেকে কাজ করেছে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ছেলে মারা গেছে। এখন ছোট ছেলে অজয়ই হাসপাতালের সব কাজ দেখাশোনা করে। সর্বক্ষণ অতন্দ্র প্রহরীর মতো হাসপাতালের কাজ নিয়ে পড়ে আছে অজয়। তাই ওকে ছাড়া এক মুহূর্তও হাসপাতালের চলে না। এটা বলতে পারি।

জনপ্রিয়

Back To Top