সঙ্ঘমিত্রা মুখোপাধ্যায়: করোনা–আতঙ্কের আবহে স্যানিটাইজার এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপাদান। প্রতি কুড়ি মিনিট অন্তর হাত পরিষ্কার করলে করোনা সংক্রমণ থেকে নিষ্কৃতি মিলবে— বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই নিদান সাধারণ মানুষকে বাধ্য করেছে স্যানিটাইজার ব্যবহারে। কিন্তু মাস তিনেক আগেও সাধারণ মধ্যবিত্তের পরিচিতির গণ্ডির বাইরেই ছিল এই উপাদানটি। হাতে‌–‌গোনা কয়েকটি নামী কোম্পানি স্যানিটাইজার তৈরি ও বিক্রি করত বটে, কিন্তু শুধুমাত্র হাসপাতাল, ক্লিনিক আর উচ্চবিত্তের ট্র্যাভেল কিটেই এর জায়গা ছিল। আর এখন সেই বস্তুটিই গরিব–বড়লোক নির্বিশেষে সবার বিপদ তাড়ানোর একমাত্র সহায়। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে অপরিহার্য তো বটেই, কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর রুটিরুজির উপাদানও হয়ে উঠেছে এই স্যানিটাইজার। লিকুইড, জেল, স্প্রে— নানা রকমের স্যানিটাইজার বাজারে বিকোচ্ছে এখন। বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠী কাঁচা সবজি থেকে গাড়ি— সব কিছুর জন্যই আলাদা রকম স্যানিটাইজার তৈরি করছে।
করোনা–আতঙ্ক শুরুর দিকে স্যানিটাইজার এত সুলভ ছিল না। পাড়ার দোকান থেকে চঁাদনি, বড়বাজারের পাইকারি বিক্রেতা— সবাই ‘‌স্যানিটাইজার নেই’‌ বোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের হাতে বিনামূল্যে স্যানিটাইজার পৌঁছে দিতে ভূমিকা নিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ। সংগঠনের সম্পাদক প্রদীপ মহাপাত্রের কথায়, ১৫ হাজার লিটার স্যানিটাইজার ৮০ হাজার মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তাদের কাছ থেকে শিখে ‘‌উদয়ের পথে’‌, ‘‌স্পর্শ’‌ প্রভৃতি সংস্থা আবার স্যানিটাইজার তৈরি ও বিতরণের দায়িত্ব নেয়। উদয়ের পথে–র সঞ্জয় ঘোষ জানালেন, ইনস্টিটিউট অফ চাইল্ড হেল্‌থ, নিমতলা শ্মশান, সিভিক ভলান্টিয়ার, মানিকতলা বাজার–সহ বিভিন্ন জায়গায় টানা ১২ দিন স্যানিটাইজার বিতরণ করা হয়। 
রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগগুলিও সাধারণ মানুষের জন্য স্যানিটাইজার তৈরি করে। মৌলানা আজাদ কলেজের রসায়ন বিভাগ ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ম্যাকাউট) হরিণঘাটা ক্যাম্পাসে স্যানিটাইজার তৈরি শুরু হয়। উপাচার্য সৈকত মৈত্র জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে তা বিতরণও করা হয়। যাদবপুরের ফার্মাসি বিভাগ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন মেনে স্যানিটাইজার তৈরি ও বিলির ব্যবস্থা করে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে তৈরি হয় স্যানিটাইজার। প্রায় এক হাজার লিটার স্যানিটাইজার এরা তুলে দেয় রাজ্য সরকারের হাতে। গুরু নানক ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিও স্যানিটাইজার তৈরি করে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হাতে তুলে দেয়। সুরেন্দ্রনাথ কলেজও স্যানিটাইজার তৈরি করে স্বাস্থ্য বিভাগকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
স্যানিটাইজার এখন অনেকের আয়ের পথও। সোনারপুরের সরস্বতী কেমিক্যালসের কর্ণধার পার্থপ্রতিম গাঙ্গুলির উদ্যোগে লকডাউনের ঠিক আগেই স্যানিটাইজার তৈরির কাজ শুরু হয়। পার্থপ্রতিমবাবু জানালেন, সম্প্রতি কিছু উদ্যোগী যুবকের সহায়তায় বিক্রির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। কিছু লোকের আয়ের পথ সুগম হচ্ছে। যাদবপুরের এক হেল্‌থকেয়ার কোম্পানির মালিক সুনীপা সাহার মতে, স্যানিটাইজার এখন বেকারদের আয়ের পথ দেখাচ্ছে। হাইড্রোক্লোরাইড, নানা রকম কীটনাশক ও ভেষজ পদার্থের মিশ্রণে তরল তৈরি করে স্প্রে মেশিনের সাহায্যে সুনীপার কোম্পানির ছেলেরা বাড়ি বা ফ্ল্যাট স্যানিটাইজ করে দিয়ে যান। খরচ পড়ে প্রতি বর্গ ফুট ২ টাকা। স্বয়ংক্রিয় স্যানিটাইজিং প্যানেলও বিক্রি করছেন তাঁরা। 
সম্প্রতি ইমামি ইন্ডিয়া, এমনকী ল্যরিয়ল, অ্যামওয়ে–‌র মতো বহুজাতিক সংস্থাও ৯০ শতাংশ অ্যালকোহলযুক্ত স্যানিটাইজার বাজারে এনেছে। তবে এসব ব্র্যান্ডেড স্যানিটাইজারের দাম একটু বেশি। সাধারণের আয়ত্তের মধ্যে স্যানিটাইজার বানিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে উদ্যোগী হয়েছে পঞ্চায়েত দপ্তরের অধীন সামগ্রিক এলাকা উন্নয়ন পর্ষদ। পঞ্চায়েতের অধীনে ২২টি খামারে কৃষিকাজ হয় বিভিন্ন জেলায়। ওই সব খামারে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা তৈরি করছেন হ্যান্ড স্যানিটাইজার। পর্ষদের প্রশাসনিক সচিব সৌম্যজিৎ দাসের দাবি, ১৫, ৩০ ও ৬০ মিলিলিটার আয়তনের স্যানিটাইজারের বোতলে থাকছে ৬০ শতাংশ অ্যালকোহল, ৩০ শতাংশ অ্যালোভেরা ক্রিম ও গ্লিসারিন, আর ১০ শতাংশ নানারকম ভেষজ তেলের মিশ্রণ। এই পরিস্থিতিতে স্যানিটাইজার তৈরি করে গ্রামের মেয়েরা যেমন আর্থিকভাবে উপকৃত হচ্ছেন, তেমনই সাধারণ মানুষও সুলভ মূল্যে স্যানিটাইজার পাচ্ছেন। পর্ষদের ওয়েবসাইট অনুযায়ী ১৫, ৩০ এবং ৬০ মিলিলিটারের দাম যথাক্রমে ২০, ৪০ এবং ৬০ টাকা।‌ এ ছাড়া বিভিন্ন সংস্থাও স্যানিটাইজার উৎপাদন শুরু করেছে।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top