‌অরূপ বসু: ‘‌বাংলা’ এই ধারণাটি একসঙ্গে ভূখণ্ড, ভাষা ও লিপিকে বোঝায়। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের‌ জন্ম বাংলার ইতিহাসে বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। প্রায় ৪ হাজার বছরের বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস নিয়ে গবেষণাধর্মী আকরগ্রন্থ সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হতে চলেছে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্যোগে। দু খণ্ডে ১৬০০ পৃষ্ঠার এই গবেষণাগ্রন্থের সম্পাদনার দায়িত্বে আছেন ইতিহাসবিদ রণবীর চক্রবর্তী এবং আবদুল মোমিন চৌধুরি। মুখবন্ধ লিখেছেন ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার। ভূমিকা লিখেছেন আনিসুজ্জামান। বইটির নাম ‘‌হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশ: আরলি বেঙ্গল‌ ইন রিজিওনাল পারস্পেকটিভস’‌। বইটি বাংলায় প্রকাশিত হবে ২০১৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। প্রাচীন কাল থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা বলে কোনও নির্দিষ্ট এলাকা বা রাষ্ট্র ছিল না। এই বইয়ে দেখানো হয়েছে, যা ছিল তা হল বর্তমান বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা, অসম, ওডিশা এবং বিহার–সংলগ্ন এলাকার কিছুটা অংশ নিয়ে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।
●‌ পুণ্ড্র বা বরেন্দ্র— অবিভক্ত বাংলার উত্তরভাগ।
●‌ রাঢ়— ভাগীরথীর পশ্চিমে অবস্থিত এখনকার মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, নদীয়া, বীরভূম, হুগলি, পুরুলিয়া। এ ছাড়া, পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণাংশ, সুহ্ম, দণ্ডভুক্তি।
●‌ বঙ্গ— বাংলাদেশের ঢাকা, বিক্রমপুর, ফরিদপুর মানে গাঙ্গেয় ব–দ্বীপের মধ্যাঞ্চল। 
●‌ সমতট— বাংলাদেশের নোয়াখালি, কুমিল্লা এবং ভারতের ত্রিপুরা। এ ছাড়াও অসম ও বাংলাদেশের তেহট্ট সংলগ্ন এলাকা।
● হরিকেল— বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও নিকটবর্তী এলাকা।  
মোটকথা রাজমহল থেকে চট্টগ্রাম, এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে রাজনৈতিক, সামাজিক, আর্থিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিতে মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিচার করা হয়েছে। যখন লিপি ছিল না, ভাষাটাও সেভাবে দানা বাঁধেনি, তখন থেকে পুরাতত্ত্ব, প্রাচীন লেখ, মু্দ্রা, শিল্পনিদর্শন, সাহিত্যসম্ভারের মধ্যে বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের অঙ্কুর ছড়িয়ে আছে। ভারত, বাংলাদেশ, জাপান, চীন, ইউরোপ ও মার্কিন দেশের বিশেষজ্ঞরাও এর মধ্যেই খোঁজ করেছেন, ইতিহাসের নবাঙ্কুরের। কালিদাস দত্ত, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, রাধাগোবিন্দ বসাক যে–পথে বাংলার ইতিহাস চর্চার প্রথম পদাতিক হয়েছিলেন, সে–পথেই বলিষ্ঠ পদক্ষেপ রেখেছিলেন রমেশচন্দ্র মজুমদার, নীহাররঞ্জন রায়। আলোচ্য গ্রন্থে গবেষকরা সে–পথেই হেঁটেছেন।
একদা মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌‌, নলিনীকান্ত ভট্টশালী ও আহমেদ হাসান দানীর সম্পাদনায় বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি‌ ১০ খণ্ডে বাংলাপিডিয়া নামে কোষগ্রন্থ প্রকাশ করেছিল। ‌প্রসঙ্গত, তাঁরাই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এশিয়াটিক সোসাইটি গড়ে তোলার প্রধান উদ্যোগ নেন। প্রাচীন বাংলার আঞ্চলিক রূপটি প্রকট হয়েছিল ব্যারি মরিসন এবং দীনেশচন্দ্র সেনের লেখায়। মুঘল আমলে বলা হত সুবে–বাংলা। পর্তুগিজেরা ‘‌বেঙ্গালা’‌ শব্দটা চালু করে। সেই থেকে ‘‌বাঙ্গালা’‌ শব্দটাও চালু হয়। গত শতাব্দীর মধ্যভাগে নীহাররঞ্জন রায় বাঙালির ইতিহাসের আদিপর্ব লেখার পর বাঙালির ইতিহাস চর্চায় আর কোনও বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সেদিক থেকে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্যোগটি উল্লেখযোগ্য।‌

জনপ্রিয়

Back To Top