ডাঃ কুণাল সরকার: দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্বেচ্ছামৃত্যু বা প্যাসিভ ইউথেনেশিয়াকে (‌জীবনদায়ী কোনও ব্যবস্থার মাধ্যমে বাঁচিয়ে না রাখা)‌ আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে ব্যাপারটা একেবারেই নতুন নয়। বলা যায় নতুন প্যাকেজে বিষয়টা এল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা এতটাই খারাপ পর্যায়ে পৌঁছয়, অর্থাৎ মাল্টি‌অর্গ্যান ফেলিওরের মতো ক্ষেত্রে বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলে, মেডিক্যাল বোর্ড প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া করেই থাকেন। অতীতে বহুবার হয়েছে, এখনও প্রয়োজনে করা হয়। এই রায়ের ফলে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া বা নিষ্কৃতিমৃত্যু আইনি স্বীকৃতি পেল। এর আগে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া নিয়ে নানা বিতর্ক দেখা দিত। আশা করা যায়, এবার সেই বিতর্কগুলো থেকে চিকিৎসকরা মুক্তি পাবেন। এই রায় বিতর্কের সমাধানগুলোকে এক সুতোয় বাঁধল।
তবে এই ‘‌লিভিং উইল’‌ নিয়ে একটা ধন্দ থেকেই যাচ্ছে। আমাদের ১৩২ কোটির দেশ, যেখানে মানুষের গড় আয়ু ৬৯ বছর। দেশের আর্থ‌‌–‌সামাজিক পরিস্থিতির কারণে দেশের সিংহভাগ মানু্ষকেই প্রতি মুহূর্তে কীভাবে বাঁচব, তার চিন্তা করতে হয়। আজ খেতে পেলাম, কাল খাবার জুটবে কিনা, সে নিয়ে চিন্তাও ঘুরপাক খায় প্রতিনিয়ত। সেখানে এ ধরনের ‘‌লিভিং উইল’‌ হাঁসজারু ছাড়া আর কী! এই অগ্নিমূল্যের বাজারে সংসার চালানোটাই অধিকাংশের কাছে যখন দুর্বিষহ হয়ে ওঠছে, সেখানে ‘‌লিভিং উইল’‌ জাতীয় চিন্তাটা আদৌ যুক্তিসঙ্গত? সেটা অধিকাংশ মানুষের কাছেই রীতিমতো বিলাসিতা। ভবিষ্যতে আমার মুমূর্ষু দশা হলে, ডাক্তার হাল ছেড়ে দিলে জীবন প্রলম্বিত করব না, এতদূর ভাবনার অবকাশ কোথায়!‌ ভারতের অসংখ্য কৃষক, খেতমজুর, দিন–‌এনে–‌দিন–‌খাওয়া প্রান্তিক মানুষরা শুধু তো বর্তমানেই বেঁচে থাকেন।
‌জীবনের অনিবার্য পরিণতি মৃত্যু। এটাকে আটকানোর ক্ষমতা কারও নেই। আমেরিকার কিছু প্রদেশ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াতে কিছু শর্তসাপেক্ষে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার স্বীকৃতি আছে। হল্যান্ড ও বেলজিয়ামে আবার অ্যাকটিভ ইউথেনেশিয়া চালু আছে। অর্থাৎ রোগীকে কড়া বিষজাতীয় ওষুধ বা রাসায়নিক প্রয়োগ করে মেরে ফেলা যায়। যে সব দেশে সোশ্যাল সিকিউরিটি বা সামাজিক সুরক্ষার কবচ আছে অর্থাৎ উন্নত অর্থবান দেশে ‘‌লিভিং উইল’‌ বিষয়টা থাকতেই পারে। কিন্তু ১৩২ কোটির উন্নয়নশীল দেশে ‘‌লিভিং উইল’‌ ব্যবস্থা একটু মজাদারই লাগে‌!‌ যেখানে প্রতি মুহূর্তে চলছে বেঁচে থাকার লড়াই।
‘‌লিভিং উইল’‌–‌‌এর যে অপপ্রয়োগ হবে না, তার গ্যারান্টি কোথায়?‌ সম্পত্তির লোভে পরিবারের সদস্যদের কোনও খারাপ মোটিভ বা অসাধু উদ্দেশ্য তো থাকতেই পারে। সে ক্ষেত্রে ‘‌লিভিং উইল’‌–‌‌এর অপপ্রয়োগ হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থেকেই যায়। সে দিকটাতেও বিশেষ নজরদারির দরকার। চিকিৎসক বা স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান যেন তেমন ঘটনায় না জড়িয়ে পড়ে, সে ব্যাপারে সর্তকতা জরুরি।
দেশের উচ্চতম ন্যায়ালয় এই রায় ঘোষণার আগে নিশ্চয়ই সব দিক ভেবেচিন্তে তবেই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। এই রায় কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের আইনি জটিলতার হাত থেকে যেমন রক্ষা করবে, তেমনই চিকিৎসকদের প্রতি সমাজের একশ্রেণীর মানুষের যে অন্তহীন অনীহা, এই আইনি স্বীকৃতি সেই অনীহা থেকেও চিকিৎসকদের সামান্য রেহাই দেবে বলেই মনে করি।‌‌ তবে চিকিৎসাক্ষেত্রে সব জটিলতা‌ কেটে গেল, এমন ভাবার কোনও কারণ কিন্তু নেই।‌‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top