সঙ্ঘমিত্রা মুখোপাধ্যায়- শেষ হেমন্তের কুয়াশামাখা ভোর। মাফলার, কানচাপা, ট্র্যাকস্যুট পরিহিত বাবু, বিবিদের দৌড়ঝাঁপে জমজমাট রবীন্দ্র সরোবর পার্ক। পার্কের ভেতরে দলবদ্ধভাবে চলছে শরীরচর্চার নানা কসরত। কোথাও শুধু মহিলাদের জমায়েত। কোথাও বা বয়স্ক পুরুষদের। শরীরচর্চার ফাঁকে ফাঁকেই একে একে চলে যাচ্ছেন গলা ভেজাতে পার্কের রেলিংয়ের ধার ঘেঁষে এক বিক্রেতার কাছে। না, কোনও চায়ের স্টল নয় এটি। নয় কোনও নিষিদ্ধ বস্তু সেবনের ঠেকও। সুদৃশ্য এক বাহারি ছাতার তলায় একটি টেবিলে আট, নয়টি বড় বড় স্টিলের পাত্র, বড় দুটি কলওয়ালা ফ্লাস্ক, ছোট বড় নানা শিশি ও হাতায় সাজানো এই দোকান। 
ঢাকনাওয়ালা ক্যানে নিম, তুলসী, করলা, হরীতকী, কুলেখাড়া, বাসক ইত্যাদি পাতার রস। ফ্লাস্কে রয়েছে মেথি ভেজানো গরম জল। এছাড়াও নানা শিশিতে প্রায় ২০ রকমের গাছের ছালের গুঁড়ো বা পাতার রস। যে সব রসের নিয়মিত সেবনে লিভার ভাল থাকে, রক্তচাপ, শুগার নিয়ন্ত্রণে থাকে, হার্ট ভাল থাকে, সর্দি কাশি, বাত, গাঁটের ব্যথা নির্মূল হয় বলে জানালেন বিক্রেতা হরেকৃষ্ণ দাস। এই রস বিক্রি হচ্ছে কাগজের গ্লাসে। ২০ মিলি মাপের গ্লাসে নিম, হলুদ, তুলসীর রস খেয়ে প্রাতর্ভ্রমণ শুরু করেন রোজ গড়ে ২৫০ লোক, এমনটাই দাবি হরেকৃষ্ণবাবুর। এর মধ্যে পঞ্চাশোর্ধ্বর সংখ্যাই বেশি। ব্যায়াম বা জগিংয়ের ফাঁকেই অনেকে আসেন হেল্‌থ টনিকে শরীর চাঙ্গা করতে। প্রেশার, শুগার বা অন্য কোনও নির্দিষ্ট অসুখের কথা জানালে তার প্রতিকারযোগ্য রস বিক্রেতা নিজেই বেছে দেন। যেমন রক্তচাপের রোগীদের তিনি নিয়মিত থোড়ের রস খাওয়ান। ১০ মিলি ২০ টাকা দামে। শুগারের রোগীদের দেন নিম, করলা, হলুদ, মধু, লেবুর রস। সরোজ দাস নামে একজন ষাটোর্ধ্ব ব্যবসায়ী জানালেন, প্রতিদিন তিনি নিয়ম করে তিন, চার রকমের রস খান। প্যাকেজে খরচ পড়ে ৫০ টাকা রোজ। এর ফলে প্রেশার, শুগার কন্ট্রোলে। ওষুধের খরচ বেঁচেছে। 
বিক্রেতা হরেকৃষ্ণ ও ওঁর ঘরনি কৃষ্ণা দুজনেই দোকান চালান, কাঁচা মাল সংগ্রহের কাজে ওঁদের সঙ্গী ছেলে ও ছেলের বৌ–‌ও। পরিবারের সবাই মিলে দিনে প্রায় আঠেরো ঘণ্টা পরিশ্রম করে শহরবাসীকে প্রাকৃতিক রসের জোগান দেন ওঁরা। যা কি না শরীর সুস্থ রাখার অব্যর্থ দাওয়াই, বলে মনে করেন সুবোধ বৈদ নামে এক জৈন ব্যবসায়ী। সুবোধবাবু রোজ ২০০ টাকার প্যাকেজ নেন। চিরতার রস খেয়ে ভোর ছটায় শরীরচর্চা শুরু করেন ৮২–‌র এই যুবা। মাঝে খান  হুইট গ্রাসের রস (অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট), এরপর নিম, করলা, মেথির রস খেয়ে যাত্রা শেষ। এরপর অঙ্কুরিত ছোলা, শসা, লেবু, লঙ্কা দিয়ে মাখা খান এক বাটি, যার জোগানদারও হরেকৃষ্ণই। এভাবেই চলছে গত আঠেরো বছর সুবোধ বৈদ্যের। রোগ, ব্যাধির বালাই নেই এখনও পর্যন্ত। 
হরেকৃষ্ণ দাসের এই ব্যবসা প্রকৃতিনির্ভর। যেভাবে প্রকৃতি নিধন চলছে, কতদিন যে এই ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবেন সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দিহান তিনি। তবে এই মুহূর্তে সফল ব্যবসায়ী তিনি। সকাল ছ’‌টা থেকে দশটার ব্যবসায়ে আয় নেহাত মন্দ নয়। এই ভেষজ রসের গুণাগুণ কতখানি চিকিৎসক তমাল লাহাকে প্রশ্ন করা হলে ওঁর জবাব, ‘‌গাছের শিকড় বা পাতার রস থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান নিয়ে নানারকম ওষুধ তৈরি হয় বটে, তবে অনেক অপ্রয়োজনীয় উপাদানও আছে এতে, যা শরীরের ক্ষতি করে। বিশেষ করে পাতা, লতায় যে সেলুলোজ আছে তা হজম করার এনজাইম মানুষের শরীরে নেই। তাই পাতার কাঁচা রস খেলে হিতে বিপরীত হওয়ারও আশঙ্কা থাকে।’‌ যাই হোক না কেন দক্ষিণ কলকাতায় কিন্তু হরেকৃষ্ণর হার্বাল জুসের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে।‌‌‌

ছবি: প্রতিবেদক

জনপ্রিয়

Back To Top