ডাঃ পল্লব বসুমল্লিক
‌‘‌মিসটেক, মিসটেক’‌। বাঙালি সিনে–‌দর্শক কখনও ভুলতে পারেন ‘‌সোনার কেল্লা’‌–‌তে ফেলুদাকে শোনানো ‘‌অন্য’‌ মুকুলের দুষ্টু লোক দুটো থেকে উদ্ধারের বর্ণনায় অমর সংলাপের অংশটুকু। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চে বাঙালি বিজ্ঞানীদেরও কি একই কথা মনে পড়ছে না?‌ যেভাবে রোজ কোভিড–‌১৯ টেস্টিং, তার নানা পদ্ধতি, ভুলে ভরা র‌্যাপিড কিট নিয়ে ল্যাজে–‌গোবরে হতে হচ্ছে আইসিএমআর–‌এ তাঁদের বস–‌দের! পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশ করোনা–‌ছোবল রুখতে মরিয়া।‌ মুক্তির অন্য সব উপায় দেখা এবং বোঝার প্রভূত চেষ্টা হয়েছে। এখন একমাত্র বিশল্যকরণী— ভ্যাকসিন। লক্ষ্যের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছনোর চেষ্টায় আজকের দিনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বজুড়ে ভ্যাকসিন গবেষণায় অনেক দেশে উল্লেখনীয় অগ্রগতি শুরু হল। মনে হচ্ছেই, এ শুধু ভ্যাকসিনের দিন।
প্রথমেই নজর ভারতে। নিউ মিলেনিয়াম ইন্ডিয়ান টেকনোলজি লিডারশিপ ইনিশিয়েটিভ–‌এর অঙ্গ হিসেবে কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (‌সিএসআইআর)‌ ‘‌সেপসিভ্যাক’‌ নিয়ে গবেষণা চালু করল। দেহে কোভিড–‌১৯ সংক্রমণ সীমাবদ্ধ করতে এবং আক্রান্তদের দ্রুত আরোগ্য লাভে এই ইমিউনো–‌মডুলেটরটি খুব কার্যকরী হতে পারে বলেই দৃঢ় বিশ্বাস বিজ্ঞানীদের। দুটো নতুন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানোর অনুমতিও দিয়েছে ড্রাগস কন্ট্রোলার জেনারেল অফ ইন্ডিয়া। সেপসিভ্যাক পরীক্ষা–‌নিরীক্ষা সফল হলে অনুমান করা হচ্ছে মুমূর্ষু কোভিড–‌১৯ রোগীর মৃত্যু অনেকটাই কমানো যাবে। প্রচণ্ড তাপমাত্রায় মাইকোব্যাকটেরিয়াম ডব্লু জীবাণু শোধন করে তৈরি হয় ভ্যাকসিন। মাইকোব্যাকটেরিয়াম ডব্লু–‌র নতুন নামকরণ মাইকোব্যাকটেরিয়াম ইন্ডিকাস প্রানাই। কেন? ব্যাকটেরিয়া আবিষ্কার হয় ভারতে, তাই‌ ইন্ডিকাস। প্রানাই?‌ আবিষ্কর্তার নামানুসারে— ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ইমিউনোলজিতে মুখ্য গবেষক ছিলেন ডঃ প্রাণ তলোয়ার। দুনিয়াভর কোভিড–‌১৯ লড়াইতে ভ্যাকসিন এবং অ্যান্টি–‌ভাইরাল তৈরির রিসার্চ হচ্ছে। সেপসিভ্যাক–‌এর কাজ একটু আলাদা। দেহের রোগ প্রতিরোধকারী ইমিউন সিস্টেম, তার অন্তর্ভুক্ত ম্যাক্রোফাজ, এনকে কোষগুলিকে সজীব করে তোলে সেপসিভ্যাক।‌
যথেষ্ট ইতিবাচক ফলাফল হাতে নেই বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (‌হু)‌ বেশ কড়া ভাষায় করোনা রুখতে বিসিজি ভ্যাকসিন ব্যবহারের চেষ্টা অবিলম্বে বন্ধ করতে বলা সত্ত্বেও বিশ্বময়, বিশেষত আমেরিকায় অনেকগুলি গবেষণা বেশ কয়েক কদম এগিয়েছে। বরিষ্ঠ বহু গবেষক তাঁদের আর্কাইভ থেকে ধুলো ঝেড়ে প্রাচীন গবেষণাপত্র আবার বের করেছেন। এ মুহূর্তে হাইলাইট ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন (‌ওপিভি)‌, ভারতে যা প্রত্যেক শিশুকে দেওয়া হয়। গ্লোবাল ভাইরাস নেটওয়ার্কে পরীক্ষা চালাচ্ছেন মেরিল্যান্ড স্কুল অফ মেডিসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত  ইনস্টিটিউট অফ হিউম্যান ভাইরোলজি–‌র ডাঃ রবার্ট গ্যালো এবং ইউএস এফডিএ–‌র কনস্ট্যান্টিন চুমাকভ। মার্কিন–‌আশ্রিত চুমাকভ জন্মসূত্রে রুশ, সত্তর দশকেই তাঁর বিজ্ঞানী মা প্রমাণ করেন ওপিভি ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস দমাতে সক্ষম।
জার্মানিতেও মানবদেহে করোনা ভ্যাকসিন প্রয়োগ সফল হবে বলেই পশ্চিমী পর্যবেক্ষকদের অনুমান। কিন্তু গোটা বিশ্ব এ মুহূর্তে তাকিয়ে অধ্যাপক সারা গিলবার্টের দিকে। অক্সফোর্ড ট্রায়াল নাকি লক্ষ্যের ৮০%‌ নাগাল পেয়ে গেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সারা গিলবার্টের পুরো টিম দিনরাত পরিশ্রম করছে। সবাই সারার জেনার ইনস্টিটিউট অ্যান্ড নুফিল্ড ডিপার্টমেন্ট অফ ক্লিনিক্যাল মেডিসিন–‌এর গবেষক। ব্রিটিশ সারা গিলবার্টকে এত ভরসার কারণ?‌ তাঁর চেয়ে নামী, সফল ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞ বিশ্বে নেই। ইনফ্লুয়েঞ্জা রুখতে পৃথিবীর সব দেশ যে সার্বজনীন ফ্লু ভ্যাকসিন ব্যবহার করে, তা সারারই তৈরি। মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম (‌‌মার্স‌‌)‌ এবং নিপা ভাইরাস রুখতে ভ্যাকসিন তৈরির প্রাথমিক পদক্ষেপ তাঁরই।
করোনা ভ্যাকসিন যিনি আবিষ্কার করবেন তাঁকে মেডিসিনে পরবর্তী নোবেল পুরস্কার তুলে দিতে প্রস্তুত রয়্যাল সুইডিশ আকাদেমি অফ সায়েন্সেস–‌এর বিচারকমণ্ডলী।‌

জনপ্রিয়

Back To Top