ডাঃ পল্লব বসুমল্লিক
কী বলবেন?‌ গণশত্রু?‌ একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। কিন্তু সমস্যাটা আদৌ এড়িয়ে যেতে পারেন না কেউ। কোভিড–‌১৯ লড়তে গিয়ে গোটা বিশ্ব প্রতিদিন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এপ্রিল ফুল না!‌ ১ এপ্রিলের ‘‌ল্যানসেট’‌ সংস্করণ জানাচ্ছে, উপসর্গহীন বাহকের মধ্যে বেশি সংখ্যায় শিশু। গবেষণাপত্রে প্রকাশিত, ১৭ জানুয়ারি থেকে ১ মার্চ প্রধান তিনটি চীনা হাসপাতালে ৩৬ জন কচিকাঁচা পাওয়া গেছে যাদের সামান্যতম উপসর্গও মেলেনি। ১০ থেকে ১৩ দিনের মাথায় তারা করোনা পজিটিভ চিহ্নিত হয়। এই শ্রেণির রোগীদের বলে ‘‌অ্যাসিম্পটোম্যাটিক ক্যারিয়ার’‌। শুধু শিশুরাই দায়ী?‌ না। এ গোত্রভুক্ত বহু প্রাপ্তবয়স্কও। সেখানে করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়া এবং অসুস্থ হয়ে পড়াটা আরম্ভই হচ্ছে ৮ থেকে ১০ দিনের মাথায়। এই শ্রেণিকে ভাইরোলজিস্ট এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ‘‌প্রিসিম্পটোম্যাটিক ক্যারিয়ার’‌–‌ও বলছেন। পরীক্ষা–‌নিরীক্ষায় প্রমাণ হয়েছে নোভেল করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে আক্রান্ত হওয়া থেকে শুরু করে প্রথম ৮ দিনেই সবচেয়ে বেশি ভাইরাস ছড়ান রোগীরা। সিভিয়র অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা সার্সের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। আক্রান্ত হওয়ার ৮ থেকে ১০ দিনে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ঘটান রোগীরা। কোন পর্বে কতটা ভাইরাস ছড়ানো হচ্ছে বা ভাইরাল লোড, তা থেকেই মহামারীর গতিপ্রকৃতি নির্ণয় করেন বিশেষজ্ঞরা।
গোটা বিশ্বে প্রায় এক–‌তৃতীয়াংশ মানুষ যখন লকডাউন বা ভার্চুয়াল কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে, উদ্বেগ বিল গেটসকেও গভীরভাবে ছুঁয়েছে। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন–‌এ তাঁর একটা প্রবন্ধ সম্প্রতি ছাপা হয়েছে। তিনি এই উপসর্গহীন বাহকদের রোগ ছড়ানোর প্রবণতা সম্পর্কে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, গ্লোবাল স্প্রেড রোখার ক্ষেত্রে এই শ্রেণির বাহকরাই প্রধান অন্তরায়। প্রত্যেক দেশই বিপর্যস্ত হতে পারে। অতীতে মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম (‌মার্স) বা সিভিয়র অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম (‌সার্স)‌ ছড়াত শুধুমাত্র উপসর্গ আছে এমন রোগীর মাধ্যমেই। গুপ্তঘাতকরা কোভিড–‌১৯–‌কে কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে তা ভেবে শিউরে উঠছি।
মাত্র ২৫%‌। অর্থাৎ প্রতি ৪ জনে একজন হতে পারেন ‌অ্যাসিম্পটোম্যাটিক ক্যারিয়ার। আমেরিকার সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (‌সিডিসি)‌ অধিকর্তা রবার্ট রেডফিল্ড মনে করছেন উপসর্গ নেই মানে এই রোগীরা করোনা ছড়াবেন না, এমনটা নয়। বরং আপনার পাশে দাঁড়িয়ে দিব্যি গল্প করলেও আপনি টের পাবেন না। শুধু আমেরিকা না, গোটা বিশ্বের যাবতীয় তথ্য আমরা বিশ্লেষণ করে এই প্রবণতা টের পেয়েছি। ব্যাপারটার প্রথম সমর্থন পাওয়া যায় গত ফেব্রুয়ারিতেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায় চীনের উহানে ২০ বছরের এক মহিলা তাঁর পরিবারের ৫ সদস্যকে সংক্রমিত করেন। তিনি নিজে কিন্তু প্রথম ৯ দিন উপসর্গহীন ছিলেন!‌ পরে সন্দেহ দেখা দিতে পরীক্ষা করে পরিবারের অন্যদের সঙ্গে তাঁকেও পজিটিভ বলা হয়।‌
বাঘ–‌সুমারি মনে পড়ে?‌ গলায় রেডিও কলার লাগিয়ে তার গতিবিধি এবং জঙ্গলে অন্য বাঘের উপস্থিতি ট্র‌্যাক করা হয়। ভারতে কোভিড–‌১৯ রুখতে ঠিক কী স্ট্র‌্যাটেজি ও রোডম্যাপ তৈরি হবে?‌ যে দেশে ন্যূনতম টেস্টিং চলছে, আক্রান্ত হয়ে উপসর্গ দেখা না দিলে কেন্দ্রীয় সরকার ও আইসিএমআর নাক, মুখ বা গলা থেকে লালারস সংগ্রহ করে রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন পলিমারেজ চেন রিঅ্যাকশন (‌আরটি–‌পিসিআর) পরীক্ষার অনুমতি দিচ্ছে না, তাতে আগামী ২ সপ্তাহে ভাইরাস ছড়ানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে বলেই মহামারী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তার মধ্যে আরও একটা ভয়ঙ্কর প্রবণতা, চটজলদি রক্তপরীক্ষায় (‌র‌্যাপিড অ্যান্টিবডি টেস্ট)‌ সরকারি সিলমোহর!‌‌ রোগীর রক্ত/‌সেরাম/‌প্লাজমা পরীক্ষায় ৩০ মিনিটে ফলাফল মেলে। খোঁজা হয় শরীরে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ার অ্যান্টিবডি আছে কিনা। মুশকিল হল, আক্রান্ত হওয়ার ৭ থেকে ১০ দিন না গেলে এ টেস্ট কখনওই পজিটিভ বেরোয় না। সুতরাং বহু ‘‌ফলস নেগেটিভ’‌ ফলাফল মেলার সম্ভাবনা থাকল। ভারতে আমরা উপসর্গহীন গুপ্তঘাতক তাহলে ধরব কীভাবে?‌ দেশের প্রধানসেবক বা চৌকিদার‌ অবশ্য আগেভাগে গেয়েই রেখেছেন, ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ বা ‘‌সেকেন্ড সার্জ’‌ এল বলে!‌  ‌
 

জনপ্রিয়

Back To Top