অভিজিৎ বসাক- ‌‌অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর ব্যাপারে অনেকেরই জানা রয়েছে। এ নিয়ে চিন্তিত বিজ্ঞানী, চিকিৎসকেরা। কারণ মানুষ বা প্রাণীর দেহে এই জীবাণুর সংক্রমণ ঘটলে কোনও অ্যান্টিবায়োটিক তার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে না। চিকিৎসকদের পরামর্শ না নিয়ে, নিয়ম না মেনে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এবার তাঁদের কাছে নতুন আশঙ্কার কথা শুনিয়েছেন বেলগাছিয়া প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। তাঁদের পর্যবেক্ষণ, শুধু লাগামহীন অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নয়, দূষিত পরিবেশও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু বেঁচে থাকার জন্য ‌আদর্শ পরিবেশ। সেখানে তারা দিব্যি টিকে রয়েছে। তাঁদের এই গবেষণা ইতিমধ্যে বিশ্বের তিনটি নামী বিজ্ঞান পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বেলগাছিয়া প্রাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের শিক্ষক ইন্দ্রনীল সামন্ত, সিদ্ধার্থ নারায়ণ জোয়ারদার, কুণাল বটব্যাল, ওই বিভাগের তিন ছাত্র অচিন্ত্য মোহান্তি, প্রতীক ঘোষ এবং অরিন্দম সামন্ত। কী খুঁজে পেয়েছেন তাঁরা?‌ কাজের জন্য তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন দেশি প্রজাতির শূকর এবং ক্রয়লার নামে এক বিশেষ প্রজাতির মুরগি। দেশি প্রজাতির শূকর পালন করেন আদিবাসী, প্রান্তিক মানুষেরা। গবেষকেরা জলপাইগুড়ি এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় কাজ করেছিলেন। ক্রয়লার মুরগি পালন করা হয় দার্জিলিঙের পার্বত্য অঞ্চলে। প্রান্তিক কৃষক, আদিবাসীদের গৃহপালিত প্রাণীদের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করার মতো আর্থিক ক্ষমতা বা অভ্যেস কোনওটাই নেই। সেখানকার মানুষদের সঙ্গে কথা বলে তাঁরা জানতে পারেন নিজেদের অসুখ–বিসুখেও অ্যান্টিবায়োটিক না ব্যবহার করার কথা। এই জাতীয় ওষুধের দামই তা ব্যবহার না করার প্রধান কারণ। অথচ এই ধরনের দেশি শূকর, ক্রয়লার মুরগিতে পাওয়া গেছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর অস্তিত্ব। বিশেষ করে ইএসবিএল উৎসেচক উৎপাদনকারী জীবাণুর অস্তিত্ব। এই উৎসেচক পাওয়া যায় অত্যন্ত দামি কিছু অ্যান্টিবায়োটিকের অত্যধিক ব্যবহারের ফলে। কিন্তু এখানে সেগুলি ব্যবহারের সম্ভাবনা নেই। এই জীবাণু এল কোথা থেকে?‌ তা খুঁজে পেতে তখন গবেষকেরা শূকর, মুরগির খাবার, জল, মাটির নমুনা সংগ্রহ করেন। সেখান থেকে তাঁরা খুঁজে পান ইএসবিএল উৎসেচক উৎপাদনকারী জীবাণুর অস্তিত্ব। গবেষক দলের অন্যতম সদস্য ইন্দ্রনীল সামন্ত বলেন, ‘‌ইএসবিএল উৎসেচক তৈরি করে যে সব জিন সেগুলি পরিবেশে থাকা জীবাণুর প্লাসমিডে বহুদিন থাকতে পারে। ওই দূষিত, অপরিচ্ছন্ন, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ তাদের বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম কারণ বলে মনে করি। সেখানকার 
মানুষজন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন না, গৃহপালিত প্রাণীদেরও দেওয়া হয় না।’‌‌ তাঁদের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে ‘‌অ্যানালস অফ 
মাইক্রোবায়োলজি’‌, ‘‌ইনফেকশন জেনেটিক্স অ্যান্ড ইভোলিউশন’‌ এবং ‘‌মাইক্রোবিয়াল ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স’‌ নামে তিনটি উচ্চমানের বিজ্ঞান পত্রিকায়। ‌বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পূর্ণেন্দু বিশ্বাসের উদ্যোগে, রাজ্য সরকারের বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি দপ্তরের অর্থে গবেষণার কাজ হয়েছে।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top