সম্রাট মুখোপাধ্যায়: সেবার শরৎ–এ উত্তমকুমার ছিলেন না। ঘোর বর্ষায়, শ্রাবণে চলে গিয়েছিলেন তিনি চিরতরে। সালটা ১৯৮০। খ্রিস্টাব্দে। আর বঙ্গাব্দে ১৩৮৭।
বাঙালি শোকাচ্ছন্ন। তার মহানায়ক বিদায় নিয়েছেন। তবু প্রকৃতির নিয়মেই শরৎ এল। বাঙালির শ্রেষ্ঠ ঋতু। কাশফুল ফুটল। উৎসবের কাল এগিয়ে এল। 
একসময় পুজোর সিনেমার তিনিই ছিলেন রাজা। ১৯৫৩ সালে পুজোর সপ্তাহে মুক্তি পায় তঁার ‘‌বউ ঠাকুরানির হাট’‌। তখনও উত্তম ‘‌মহানায়ক’‌ হননি, ফলে পুজোর প্রথম পথ চলা ‘‌নিষ্কণ্টক’‌ হয়নি। এ ছবি ফ্লপ করেছিল। কিন্তু পরের বছর ১৯৫৪–‌র পুজোতেই ছিল উত্তম–‌সুচিত্রার সেই বিশাল বক্স অফিস সাফল্য। অগ্রদূতের ‘‌অগ্নিপরীক্ষা’‌, প্রযোজনা ব্যয়ের পঁাচগুণ টাকা তুলেছিল এ’‌ ছবি। ১৯৫৭–য় ‘‌অভয়ের বিয়ে’‌ পুজোর ছবি হিসেবে তেমন সাফল্য পায়নি ঠিকই। কিন্তু তখনও যে হল ছেড়ে নড়েনি কয়েক সপ্তাহ আগে মুক্তি পাওয়া ‘‌হারানো সুর’।‌ অজয় করের এই ছবিও প্রযোজনা ব্যয়ের পঁাচগুণই টাকা তুলেছিল বক্স অফিসে। ’‌‌৫৯–‌এ‌ ‘‌সোনার হরিণ’‌, ’‌৬০–‌এ ‘‌শহরের ইতিকথা’‌, পেরিয়ে ’‌৬১–‌তে আবার পুজো–‌বিস্ফোরণ ছিল ‘‌সপ্তপদী’‌। চারগুণ ব্যবসা। আর সঙ্গে সেবার ছিল আরও একটা ছবি ‘‌দুই ভাই’‌, একই সপ্তাহে মুক্তি। তবু এ’‌ ছবিও প্রযোজনা ব্যয়ের দ্বিগুণ ব্যবসা পেয়েছিল!‌ উত্তম তখন এতটাই অব্যর্থ।
সবার উপরে
এই সময় পুজোর ছবিতে একবারই উত্তম ব্যর্থ হন ১৯৬৪ সালে। বছর দুয়েক হল সুচিত্রার সঙ্গে তঁার জুটি সাময়িকভাবে ভেঙে গেছে। এই সময়েই বসবাসের ঠিকানা বদলেছেন। ওই বছর পুজোয় মুক্তি পেল তঁার ‘‌মোমের আলো’‌, বহুদিন পরে (‌গোনা–‌গুনতি ১৫টা ছবি পরে)‌ তঁার সিনেমা ফ্লপ হল। আর সেবার পুজোর হিট হল সুচিত্রা সেনের ‘‌সন্ধ্যাদীপের শিখা’‌।
পরের বছর ’‌৬৫–তেই অবশ্য ‘‌সূর্যতপা’‌ হিট হল। ’‌৬৬–তে ‘‌শঙ্খ বেলা’‌ আবার চারগুণ টাকা তুলে সাড়া ফেলে দিল।‌ ’‌৬৭–তে ‘‌অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’‌ ও তাই। উত্তম–ক্যাম্পে তিন নতুন নায়িকা ঢুকে পড়লেন, সন্ধ্যা রায়, মাধবী মুখোপাধ্যায়, তনুজা সমর্থ। প্রসঙ্গত,‌ ’‌‌৬৭–তে আবার পুজোর ছবির আগের সপ্তাহেই মুক্তি পেয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘‌চিড়িয়াখানা’‌ও। ’‌৬৮–তে অতএব পুজোর সপ্তাহে আবার জোড়া উত্তম। ‘‌চৌরঙ্গী’‌, ‘‌তিন অধ্যায়’‌ দুটোই হিট। আর ’‌‌৬৯–তে পুজোর ছবিতে আবার উত্তমের পাশে ফিরে এলেন সুচিত্রা। হরিসাধন দাশগুপ্তের ‘‌কমললতা’–য়।‌ কাছাকাছিই মুক্তি পেল ‘‌মন নিয়ে’‌, নায়িকা সুপ্রিয়া দেবী। সেবার পুজোয় কৌতূহল তুঙ্গে, কে বেশি সাফল্য এনে দেবেন উত্তমকে?‌ সুচিত্রা নাকি সুপ্রিয়া?‌ দেখা গেল দু’‌টোই মাঝারি হিট হয়ে একইরকম ব্যবসা দিয়েছে। 
পরের বছর পুজোর সামান্য আগে মুক্তি পাওয়া ‘‌রাজকুমারী’‌ বক্স–‌অফিসে ব্যর্থ হলেও, পুজোর সময় বঁাচিয়ে দিল ‘‌নিশিপদ্ম’‌ তুমুল হিট হয়ে। ’‌৭১–‌এ পুজোয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি সিনেমা–বাজারের পক্ষে খুব একটা অনুকূল ছিল না। উত্তমের ‘‌জীবন জিজ্ঞাসা’‌ ছাড়া বাজারে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছবি ছিল না। এ’‌ছবি তবু মাঝারি হিট হল। ’‌৭২–এও পরিস্থিতি একই রকম। পুজোর সপ্তাহে আর তার একটু আগে পর পর উত্তমের দুটো ছবি ছিল ‘‌মেমসাহেব’‌ আর ‘‌ছিন্নপত্র’।‌ দুটোই মাঝারি ব্যবসা পেল। ’‌‌৭৩–‌এ‌ ‘‌রৌদ্র ছায়া’‌ও তাই। সেবারের পুজোর বরং সুপারহিট হল তরুণ মজুমদারের কিশোর নায়ক–‌নায়িকা খচিত ছবি ‘‌শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’‌। বোঝা গেল বক্স–‌অফিস বদলাচ্ছে। 
জোয়ার–‌ভাটা
আলোচনা শুধু হয়ে গিয়েছিল, তা হলে কি উত্তমকুমার শেষ?‌ না’‌ হলে পরপর তিন বছর পুজোয় উত্তম বড় হিট পাচ্ছেন না কেন?‌
আর ১৯৭৪–‌এই উত্তম এ’‌ আলোচনা থামিয়ে দিলেন নবরূপে। ‘‌অমানুষ’‌ দিয়ে। এ’‌ ছবি টানা ৩২ সপ্তাহ চলে রেকর্ড গড়ল। পুজোয় মুক্তি পেয়ে বক্স অফিসে তুলল প্রযোজনা ব্যয়ের ছ’‌গুণ টাকা!‌ যে উত্তম বোম্বেতে ‘‌ছোটি সি মুলাকাত’‌ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন, সেই উত্তম বোম্বাই মার্কা ‘‌মশালা’‌ গল্পের ছবিতে সুপারহিট হলেন পৌনে এক দশক পরে। আবার নতুন করে ‘‌গুরু গুরু’‌ রব উঠল। বাঙালি ছেলেরা ‘‌অমানুষ’–এর মধু–‌র আদলে রঙিন উঁচুকলার পাঞ্জাবি পরা শুরু করল। পুজো প্যান্ডেলের মাইকে অন্য কোনও গান শোনাই গেল না। সবাই ‘‌বেদনার‌ বালুচরে’‌র সুখেতে ভেসে গেলেন।
১৯৭৫, পুজোর সাড়ে তিন মাস আগে জরুরি অবস্থা কায়েম হয়েছে। উত্তম ভক্তরা আবার চিন্তিত। আবার কি তা হলে পুজোর ছবির ব্যবসা নষ্ট হবে?‌ সেবার আবার উত্তমের জোড়া ছবির মুক্তি। ‘‌প্রিয় বান্ধবী’‌, সঙ্গে সুচিত্রা সেন। আর ‘‌সন্ন্যাসী রাজা’‌। প্রথমটা ফ্লপ হল!‌ শেষ হল উত্তম–সুচিত্রা যুগ। কিন্তু ‘‌সন্ন্যাসী রাজা’‌ নিজের রাজত্ব পুনরুদ্বার করল। চলল টানা ১৮ সপ্তাহ। ব্যবসা করল ৪০০ শতাংশ।
’‌‌৭৬–‌এর পুজোয় উত্তমের ছবি ছিল না। ‌’‌৭৭–‌এর পুজোয় সে আপশোস মিটিয়ে দিল ‘‌আনন্দ আশ্রম’‌, পুনশ্চ শক্তি সামন্ত। ‘‌অমানুষ’‌–‌এর পরিচালক। এবার চারগুণ ব্যবসা। আর হলে টানা ২৬ সপ্তাহজুড়ে থাকা। ‘‌অমানুষ’‌–‌এর পরে ‘‌হল অকুপেন্সি’‌তে‌ সবার্ধিক উত্তমের কেরিয়ারে। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে আবার কিশোর–‌আশার ‘‌পৃথিবী বদলে’‌ ফেলার গান।
’‌৭৮–‌এ একটা মজার ঘটনা ঘটল। উত্তমকে নায়ক করে দু‌টো হিট পাওয়া শক্তি সামন্ত আবার উত্তমকে নিয়ে নতুন কী ছবি আনেন ‌এ প্রতীক্ষায় সবাই যখন উৎসুক তখন শক্তিবাবু হঠাৎ উল্টো রাস্তায় হঁাটলেন। উত্তমকে নিয়ে নতুন ছবি করার বদলে নিজের  পুরোনো এক হিন্দি ছবি ‘‌আরাধনা’‌। (‌নায়ক রাজেশ খান্না)–কে বাংলায় ’‌ডাব’‌ করে পুজোর আগে বাজারে ছাড়লেন। ভাবলেন কিশোর–লতার গানের জোরে বাজার ধরবেন। হায়!‌ সে ছবি হিন্দিতে যতই মেগাহিট হোক, বাংলায় ফ্লপ হল। আর তার বদলে পুজোর বাজার ধরলেন আবার সেই উত্তমকুমারই। ‘‌ধনরাজ তামাং’‌ হয়ে।
সত্যি কথা বলতে, ’‌‌৭৯–তে অবশ্য উত্তম একটু হতাশ করলেন। পুজোর দুই রিলিজ ‘‌নবদিগন্ত’‌ আর ‘‌শ্রীকান্তের উইল’‌ দুটোই ‘‌অ্যাভারেজ’‌ ব্যবসা দিল। 
আর এরপরই এল কালান্তক ১৯৮০ সাল।
নও শুধু ছবি
১৯৮০ এল। কিন্তু শরৎকাল মানে শারদ– উৎসব পর্যন্ত উত্তমকুমার থাকলেন না। তিনি চলে গেলেন জুলাইয়ের চতুর্থ সপ্তাহে। পুজোয় মাইকে উত্তমের ছবির গান বাজল। বেদনাঘন শোকবার্তা বাজল। বেশ কিছু প্যান্ডেলে মালা দেওয়া মহানায়কের ছবিও সাজানো রইল।
 কিন্তু হলে উত্তমকুমারের নতুন ছবি এল না। সেবছর পুজোয় মুক্তি পেল এবং হিট করল তপন সিংহের ‘‌বাঞ্ছারামের বাগান’‌। যে ছবিতে ছকড়ি দত্ত আর নকড়ি দত্তের দ্বৈত চরিত্র করার কথা ছিল উত্তমকুমারেরই। কিন্তু ‘‌ডেট’‌ নিয়ে সমস্যা হওয়ার তপন সিংহ তঁাকে বাদ দেন।‌ আর এই চরিত্র নিয়ে এতটাই ‘‌অবসেসড’‌ ছিলেন উত্তমকুমার যে বাদ পড়ে ব্যাপারটা নিয়ে তিনি উকিলের চিঠিও পাঠান তপনবাবুকে। 
আর একটি ছবি যেটা মুক্তি পায় এই পুজোয় সেই ‘‌বড় ভাই’‌। ছবির নামভূমিকাতেও উত্তমকুমারকে প্রথমে চেয়েছিলেন পরিচালক সুশীল মুখোপাধ্যায়। উত্তমের হাতে ডেট না থাকায় তিনি ওই ছবি করেননি। ওই চরিত্রটি শেষ পর্যন্ত করেন সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তম নেই, কিন্তু সেবার পুজোজুড়ে থাকল উত্তমকে ভেবে চিত্রনাট্য লেখা দুই ছবি। এবং দুটোই কমবেশি সাফল্য পেল।
মুখ থেকে যায় বিজ্ঞাপনে
কিন্তু শুধু এই দুই ছবি নয়, ’‌‌৮০–‌র পুজোয় আর একভাবে উত্তমকুমার বা উত্তমকুমারের সিনেমা ভক্ত–‌অনুরাগীদের মনজুড়ে থাকল। উত্তমকুমারের তিনটি ছবির বিজ্ঞাপন। তিনটিই নিজগুণে কৌতূহল সৃষ্টিকারী। বিজ্ঞাপনগুলি বেরিয়েছিল জনপ্রিয় সিনেমা পত্রিকার পাতায়। হয়ে উঠেছিল শোকার্ত অনুরাগীদের সান্ত্বনা।
উত্তম মারা যাওয়ার এক মাসের মাথাতেই মুক্তি পায় ‘‌রাজাসাহেব’‌। কিন্তু তাতে ‘‌নেগেটিভ’‌ চরিত্রে উত্তমকে মানতে পারেননি সদ্যশোকচ্ছন্ন দর্শকেরা। ছবি ‘‌ফ্লপ’‌ করে। ফলে সে ছবি পুজোর আগেই বাজার থেকে উঠে যায়।
মুক্তি পেতে চলা যে ছবি নিয়ে সবচেয়ে কৌতূহল ছিল দর্শকদের তা ছিল ‘‌ওগো বধূ সুন্দরী’‌। তিনটে কারণে। এক, ওই ছবি করতে করতেই মারা যান উত্তমকুমার। দুই, ওই ছবির গান তখন তুমুল হিট। তিন, হলিউডের ‘‌মাই ফেয়ার লেডি’‌ ভেঙে ওই ছবি হয়েছে। ওই ছবির বিজ্ঞাপন অবশ্য পুজোয় ছিল সাদামাঠা। নানা চেহারার উত্তমের মুখের ‘‌কাট আপ’‌ আর দুই নায়িকার ছবি। লেখা হয়েছিল ‘‌মুক্তি আসন্ন’‌। ছবি মুক্তি পায় পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে।
সুখেন দাসের ‘‌প্রতিশোধ’‌ ছবিতে উত্তমকুমার কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন না। ছিলেন নায়কের বাবা। তবু তাঁর মৃত্যু পরবর্তী জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতেই সম্ভবত‌ গোটা বিজ্ঞাপন জুড়েই তিনি ও তাঁর চরিত্রের কথা। সুকৌশলে ছবির গল্পে তাঁর মৃত্যুর ব্যাপারটাকে তুলে আনা হয়েছিল বিজ্ঞাপনের কপিতে। তাঁর নামের ‘‌পয়েন্ট সাইজ’‌ করা হয়েছিল অন্য শিল্পীদের নামের চার গুণ বড় করে।
তবে সব বিজ্ঞাপনকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল ‘‌কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’‌র বিজ্ঞাপন। আকারে। এবং গুরুত্বে। বিজ্ঞাপনে লেখা হয়েছিল, ‘‌‌উত্তমকুমার যে নেই একথা আমরা বিশ্বাস করি না। আমরা বিশ্বাস করি উত্তমকুমার আছেন। উত্তমকুমার আমাদের শ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। উত্তমকুমার বেঁচে আছেন।‌’‌ এর তলায় ছবির নাম। আর উত্তমের ওই ছবির চরিত্রের মেক আপে তিনটি ছবি। ‘‌নেগেটিভ’‌, ‘‌সেমি–‌নেগেটিভ’‌ আর ‘‌পজিটিভ’‌–‌এ। তলায় লেখা ‘‌শ্রদ্ধাঞ্জলী জানাচ্ছেন’‌ বলে ছবির সব শিল্পী ও কলাকুশলীর নাম। এ যেন ছবির বিজ্ঞাপন নয়। শোকবার্তা। এমন অভিনব বিজ্ঞাপন বাংলা ছবির অন্য কোনও শিল্পীর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়েছে বলে শুনিনি। প্রসঙ্গত,‌ ওই ছবির পরিচালক ছিলেন উত্তমকুমার স্বয়ং। এটিই মুখ্য চরিত্রে তাঁর অভিনয় করা শেষ সম্পূর্ণ ছবিও। মুক্তি পায় পরের বছর আগস্টে। ‘‌ওগো বধূ সুন্দরী’‌ বা ‘‌প্রতিশোধ’‌ ভাল রকম হিট করলেও, এ ছবি করেননি।

জনপ্রিয়

Back To Top