অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: পুজোর গান যখন এই বাংলা থেকে প্রায় উঠে গেছে, তখনও হাল ছাড়েননি ঊষা উত্থুপ। ট্যাংরা অঞ্চলে নিজেরই স্টুডিও ভাইব্রেশনে রেকর্ড করে ফেললেন পুজোর বাংলা গান। মনে হয়, তিনি যেন একজন বাঙালির চেয়েও বেশি বাঙালি। ‘‌হতাশা’‌ শব্দটা তাঁর অভিধানে নেই।
সেদিন রেকর্ডিং শেষ করার পর সতত উজ্জ্বল, উদ্দীপ্ত ঊষা উত্থুপের সামনে আমরা, স্টুডিও ভাইব্রেশনে।
• আপনার উদ্যোগে শুরু হওয়া ‘‌স্টেজ ক্র‌্যাফ্ট’‌ উৎসব এবার পাঁচ বছরে। এই উৎসবে আপনি সংবর্ধিত করেন মঞ্চের নেপথ্যে থাকা কলাকুশলীদের। কোন ভাবনা থেকে এই সংবর্ধনা উৎসব ‘‌স্টেজ ক্র‌্যাফ্ট’‌ শুরু করলেন?‌
•• আমার জন্যে স্টেজ ক্র‌্যাফ্ট ওয়াজ অলওয়েজ দেয়ার। সেই ৬৯ সাল থেকে যখন গান গাওয়া শুরু করি কলকাতায়, শুরু থেকেই আমি সব সময় আমার মিউজিশিয়ান, কলাকুশলীদের ধন্যবাদ জানিয়ে আসছি অনুষ্ঠানেই। একটা শো-‌কে সফল করার জন্যে যিনি স্টেজ তৈরি করেন, যিনি সাউন্ড করেন, যিনি আলো করেন, নেপথ্যে থাকা প্রতিটি মানুষ গুরুত্বপূর্ণ। শুধু গানে নয়, নাটকে, সিনেমায় সর্বত্র নেপথ্যের এইসব মানুষদের আবদান অসাধারণ। আমার মনে হয়েছিল প্রকাশ্যে এঁদের ধন্যবাদ জানানো দরকার, সম্মান জানানো দরকার। সেজন্যেই শুরু হয়েছে ‘‌স্টেজ ক্র‌্যাফ্ট’‌। আমরা একসঙ্গে এই উদ্যোগ নিয়েছি। সঙ্গে আছেন গৌতম জৈন, মহুয়া লাহিড়ী, শিলাদিত্য চৌধুরি, অনিল কুরিয়াকোস। এবার পঞ্চম বছর। কলামন্দিরে ২২ সেপ্টেম্বর আমাদের এই উৎসব। নেপথ্যের এইসব অসাধারণ কলাকুশলী, শিল্পীরাই তো মঞ্চের শিল্পীকে পূর্ণ রূপ দেন। আমার গান তো মিউজিশিয়ান ছাড়া অসম্পূর্ণ, যিনি সাউন্ড করেন তাঁকে ছাড়া অসম্পূর্ণ।
• কলকাতাতেই আপনার সঙ্গীত জীবন প্রায় ৪৫ বছরের?‌
•• ৪৯ বছর হবে। আমি ১৯৬৯ সাল থেকে কলকাতায় গান করছি।
• কিন্তু, শুনেছি একসময় আপনার স্কুলের গানের টিচার আপনাকে গানের দল থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন?‌
•• ঠিকই শুনেছেন। আমি তখন বোম্বেতে (‌‌মুম্বই)‌ কনভেন্ট অফ জেসাস অ্যান্ড মেরি-‌তে পড়ি। আমার পিতৃভূমি চেন্নাই হলেও বোম্বেতেই আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তখন নিচু ক্লাসেই পড়ি। কয়ার-‌এর সঙ্গে গানের লাইনে ছিলাম। গানের দলে। আমাদের গানের টিচার আমাকে বললেন, ডোন্ট সিঙ্গ। আমাকে বললেন, তোমার পারকাশনে থাকাই ভাল।
• কেন গাইতে বারণ করলেন উনি?‌ সুরে মিলছিল না?‌
•• আসলে, আমার গলাটা ছিল ‘‌ফানি’‌। ডিফারেন্ট টাইপ অফ আওয়াজ। সেজন্যেই উনি বলেছিলেন, গান না গেয়ে বাজনার দলে যাও।
• মন খারাপ হয়েছিল?‌ গানের দল থেকে বাদ পড়ার জন্যে কি আরও জেদ তৈরি হয়েছিল গান গাওয়ার জন্যে?‌
•• দুঃখ নিশ্চয়ই পেয়েছিলাম। কিন্তু গান গাইতে না পারলেও মিউজিকের দলে তো ছিলাম। ফলে, জেদ ধরে একটা কিছু দেখিয়ে দেব, এমনটা আমি ভাবিনি। আসলে, আমি একজন ফান পার্সন, হ্যাপি পার্সন, পজেটিভ পার্সন। বলতে পারেন, আমি কমপালসিভ অপটিমিস্ট। তাছাড়া, চিরকালই আমি ভেবেছি, মিউজিক ইজ নট মাই বিজনেস। আমার বিজনেস কমিউনিকেশন। মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা।
• পরে সেই গানের দিদিমণির সঙ্গে দেখা হয়েছে?‌
•• হ্যঁা, আমি তখন গান গাই। উনি আমার গান শুনে দিল্লিতে অশোকা হোটেলে এসে আমার সঙ্গে দেখা করেন। আমাকে আশীর্বাদ করেন। আমি একটা গান ওঁকে উৎসর্গ করেছিলাম।
• কী নাম আপনার সেই গানের দিদিমণির?‌
•• মিস ডেভিডসন। 
• কলকাতায় আপনি প্রথম গান গাইতে শুরু করেন পার্ক স্ট্রিটে ‘‌ট্রিংকাস’‌-‌এ। তার আগে কোথায় গাইতেন?‌
•• প্রথম গেয়েছিলাম চেন্নাইতে মাউন্ট রোডে ‘‌নাইন জেমস’‌ নাইট ক্লাবে। আমি গিয়েছিলাম ফ্যামিলির সঙ্গে। আমার মাসি হঠাৎ বলল, তুমি একটা গান করো। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়। আমাকে একটা গান গাওয়ার সুযোগ দেওয়া হল। প্রথম গানটাই সবার এত ভাল লাগল যে হাততালি থামে না। টানা ৪৫ মিনিট গান গেয়েছিলাম আমি। সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা। লাইভ শো। খুব কাছে বসে থাকা মানুষজনের প্রতিক্রিয়া, তাদের হাততালি। যেন একটা স্বপ্নের শুরু। কর্তৃপক্ষের এত ভাল লাগল যে আমাকে টানা এক সপ্তাহ ওই নাইট ক্লাবে গান গাইতে হয়। আমি গান গেয়ে একটা কাঞ্জিভরম শাড়ি পেয়েছিলাম। (‌হাসতে হাসতে)‌ মাই ফার্স্ট পেমেন্ট ওয়াজ আ কাঞ্জিভরম শাড়ি।
• বাড়িতে কি গানবাজনার চর্চা ছিল?‌
•• আমার বাবার রেকর্ড কালেকশন ছিল বিরাট। বেটোফেন, মোৎজার্ট থেকে শুরু করে ফ্রাংক সিনাত্রা থেকে বড়ে গুলাম আলি খান, এম এস শুভলক্ষ্মী। ছোটবেলায় বাংলা না বুঝলেও তখনই শুনি কে এল সায়গল, পঙ্কজ মল্লিক, কে সি দে থেকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্রের গান।

ফলে, গানের প্রতি টান ছোট থেকেই। সুর তো ছোটবেলাতেই মানুষের মাথায় আর হৃদয়ে ঢুকে পড়ে।
• কলকাতায় পার্ক স্ট্রিটে ‘‌ট্রিংকাস’‌-‌এ গান গাওয়ার শুরু কীভাবে?‌
•• ট্রিংকাসের মিস্টার জসওয়া আর মিস্টার পুরী আমার গান আগে শুনেছেন বোম্বের নাইট ক্লাবে। ওঁরাই আমাকে ট্রিংকাসে গাইতে বলেন।
• দেখুন, নাইট ক্লাবে গান গাওয়াটা তো খুব একটা সম্মানের চোখে দেখা হত না। সেটা কি আপনি টের পেতেন?‌
•• ঠিকই, নাইট ক্লাবে গান গাওয়াটা ভাল চোখে দেখা হত না। কিন্তু আমি তথাকথিত নাইট ক্লাব কালচারের মতো লো-‌কাট গাউন পরে, ব্লন্ড হেয়ার স্টাইল করে গাইতে আসতাম না। আমার লুকটা ছিল ডিফারেন্ট। আমি শাড়ি পরতাম। টিপ পরতাম। এবং ভারতীয় নারীর বেশেই উপস্থাপন করতাম আমার গান। আমার পোশাক, আমার অ্যাপিয়ারেন্স, আমার গান দারুণভাবে অ্যাকসেপ্ট করলেন সবাই। এত ভালবাসা, এত সম্মান পেয়েছি ট্রিংকাসে গান গেয়ে, তা ভোলার নয়। পাশাপাশি ছিল ফ্যামিলির সাপোর্ট।
• মূলধারার সঙ্গীত শিল্পীদের সঙ্গে পরিচয় হল কীভাবে?‌ তখন তো হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, সন্ধ্যা, আরতি বাংলা মাতিয়ে দিচ্ছেন।
•• আমি তো এঁদের গানের সঙ্গে আগেই পরিচিত ছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে সবার সঙ্গে পরিচয়ের শুরু পাড়ার জলসায় গাইতে গিয়ে।
• সেটা কোন সময়?‌
•• ওই ৬৯-‌৭০ সালেই। তখনই অজিত ঘোষ, মিন্টু ঘোষ আমাকে দিয়ে বাংলা গান রেকর্ড করান। আমার প্রথম রেকর্ড করা বাংলা গান ছিল—আহা তুমি সুন্দরী কত কলকাতা।
• এই গান তো এখনও জনপ্রিয়।
•• হ্যঁা, টানা ৪৮ বছর ধরে জনপ্রিয় এই গান। এখনও ফাংশনে এই গান গাইতে হয় আমাকে। এই গানের জন্যেই পাড়ার জলসায় প্রচুর ডাক পেতাম আমি।
• ছোটবেলায় তো বাংলা জানতেন না। বাংলা শিখলেন কীভাবে?‌
•• বাংলার মানুষের ভালবাসার টানে আর গানের ম্যাজিকে। বাবার রেকর্ড শুনে শুনে বাংলা গান কিছু কিছু শিখলেও বাংলা শিখলাম কলকাতার মানুষের টানে। রবীন্দ্রসঙ্গীতও প্রথম শুনেছিলাম বাবার রেকর্ড থেকেই। বাবার খুব প্রিয় গান ছিল—ওই মালতিলতা দোলে। ট্রিংকাসে যখন পপ গাইছি, তখন আস্তে আস্তে শিখে নিচ্ছি বাংলা ভাষাও। এমন কী আমি রবীন্দ্রসঙ্গীতও গাইতাম ট্রিংকাসে—পুরনো সেই দিনের কথা। কলকাতার ভালবাসা আমার রক্তে মিশে গেছে। আই অ্যাম মোর দ্যান আ বেঙ্গলি।
• কলকাতায় অন্য ভালবাসাও তো পেলেন তখন?‌
•• মানে?‌
• ট্রিংকাসে গান গাইতে গাইতেই তো বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ হ্যঁা, ঠিকই বলেছেন। আইয়ার থেকে উত্থুপ হয়ে গেলাম কলকাতাতেই।
• ট্রিংকাসে এখনও গান গাইতে ইচ্ছে করে?‌
•• ইচ্ছে আর কী?‌ এখনও তো মাঝে মাঝেই ট্রিংকাসে গিয়ে গান গাই। ট্রিংকাস আমার কাছে মন্দির। দু’‌সপ্তাহ আগেই গেয়ে এসেছি ট্রিংকাসে।
• আপনি তো অনেক সিনেমাতেও অভিনয় করেছেন?‌
•• হ্যঁা, বহু ভাষার সিনেমায়। আমি অভিনয় করতে ভালবাসি। আমার কাছে অভিনয়টা হল এক্সটেনশন অফ মাই সিংগিং। তবে, অভিনয়ে আমি কখনও ঊষা উত্থুপ নই। আমি সেই চরিত্রটা।
• আপনার অভিনয় করা সবচেয়ে প্রিয় ছবি কোনটা?‌
•• মালায়ালম ছবি। ‘‌পোতন বাবা’‌। এটা ছবিতে আমার ছেলের নাম। মামুটি আমার ছেলের চরিত্রে করেছিলেন। যদিও আমরা প্রায় একই বয়সী।
• দেব আনন্দের ‘‌হরে রাম হরে কৃষ্ণ’‌ ছবিতে ‘‌দম মারো দম’‌ গাওয়ার কথা ছিল আপনার। কেন হল না?‌
•• হয়নি, এটাই সত্যি। লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে ডুয়েট গাওয়ার কথা ছিল আমার। লতাজি গাইবেন মুমতাজের জন্যে, আমি গাইব জিনাত আমনের জন্যে। এটাই ঠিক ছিল। শেষ পর্যন্ত গাইলেন আশা ভোসলে। ইংরেজি ভার্সানটা আমি গেয়েছিলাম। লোকে অবশ্য এখনও ভাবে, ওটা আমারই গান।
• আপনি তো বিশাল ভরদ্বাজের ‘‌সাত খুন মাফ’‌-‌এও অভিনয় করে বেশ খ্যাতি পেয়েছিলেন?‌
•• ওই ছবিতে গানও গেয়েছিলাম। সেই গানের জন্যে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলাম। ২০১২ সালে। একই সময়ে পেয়েছিলাম ‘‌পদ্মশ্রী’‌।
• আপনার কপালের টিপেও কলকাতাকে ভালবাসার চিহ্ন। সেখানে লেখা থাকে—‘‌ক’‌। এই ভাবনাটা কীভাবে এল?‌
•• আসলে কলকাতা তো আমার হৃদয়ে। (‌হাসতে হাসতে)‌ সেখান থেকে কপালে চলে এল। আসলে, যখন ‘‌কলকাতা, কলকাতা ডোন্ট ওয়ারি কলকাতা’‌ গানটা গাই, তখন একদিন বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তুলি দিয়ে কপালে ‘‌ক’‌ এঁকে নিই।‌‌ অ্যাক্রেলিক পেইন্ট দিয়ে।

কপালে ‘‌ক’‌ নিয়ে গানটার ভিডিও করলাম। সবাই খুব তারিফ করল। মুম্বইয়ে একটা শপিং মলে তো অনেকেই জানতে চাইলেন, কোথা থেকে এই ‘‌বিন্দি’‌টা পেয়েছি। আসলে, ওটা তো আঁকা। তারপর আমার ডিজাইন থেকেই এটা তৈরি করে দিলেন একজন। তারপর তো এই ‘‌ক’‌-‌টিপ ইতিহাস হয়ে গেছে।
• আপনার কণ্ঠে বাংলা গান, আপনার কপালে বাংলা বর্ণমালার চিহ্ন। অথচ একসময় অপসংস্কৃতির দায়ে আপনার গান নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন তৎকালীন মন্ত্রী যতীন চক্রবর্তী।
•• (‌একটু থেমে)‌ যা গেছে তা যাক। পুরনো কথা কী হবে টেনে এনে?‌ যদিও, আমার জীবনে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
• কী কারণে আপনার ওপর এই নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল?‌
•• সেটা তো আমি আজও জানি না। এটা ১৯৮৩ সালের ঘটনা। অভিনেত্রী গীতা দে একদিন আমার এই স্টুডিওতে এসে বললেন, ঠাকুরপুকুর ক্যানসার হাসপাতালের সাহায্যে একটা অনুষ্ঠান মহাজাতি সদনে করছেন ওঁরা, আমি কি গাইব?‌ আমি সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হলাম। কিন্তু অনুষ্ঠানের দু’‌দিন আগে গীতাদি এসে বললেন, তোমাকে গাইতে দেওয়া হবে না। জানলাম, আমার গানকে ‘‌অপসংস্কৃতি’‌ আখ্যা দিয়ে তৎকালীন পি ডব্লিউ ডি মন্ত্রী যতীন চক্রবর্তী আমাকে ‘‌ব্যান’ ঘোষণা করেছেন।
• আপনার প্রথম প্রতিক্রিয়া  কী ছিল?‌
•• দুঃখ পেলে যা হয়। আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। পরের দিনই আমি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে যাই যতীনবাবুর সঙ্গে দেখা করতে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও যখন ডাক পেলাম না, তখন অনুমতি নিয়ে নিজেই ঢুকলাম। ঢুকে বললাম, অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে এসেছি, আপনি ভেতরে ডাকেননি, বসতেও বলেননি, এটা তো বাঙালি সংস্কৃতি নয়। সঙ্গে সঙ্গে উনি বসতে বললেন। আমি তখন ওঁর কাছে জানতে চাইলাম, কেন আমার গানকে অপসংস্কৃতি বলেছেন উনি?‌ কেনই বা আমাকে ‘‌ব্যান’‌ করা হল? উনি কোনও কারণ না দেখিয়েই বললেন, ‘‌কোনও সরকারি হলেই আপনাকে গাইতে দেওয়া হবে না। কোনও কারণ দেখাব না। আপনি যা খুশি করুন। কোর্টেও যেতে পারেন।’‌ আমি তখন বলে এলাম—হ্যঁা, আমি কোর্টেই যাব।
• এতটা সাহস কোথা থেকে পেলেন?‌
•• কলকাতা থেকে, বাংলার মানুষের ভালবাসা থেকে। আসলে, বাংলার প্রতিটা মানুষ আমার পাশে ছিলেন, এমন কি জ্যোতিবাবুও। যতীনবাবু তো আমার ‘‌ফান্ডামেন্টাল রাইটস অফ এক্সপ্রেশন’-‌এ‌ বাধা দিলেন। আমি মুম্বইতে বাবাকে ফোন করে ঘটনাটা জানাই। উনি মামলা করার অনুমতি দেন। দু’‌টো মামলা করি আমি। একটা গান গাওয়ার মৌলিক অধিকার ফিরে পাওয়ার। অন্যটা মানহানির মামলা। ফেব্রুয়ারিতে মামলা করি। মে মাসে প্রথম মামলাটায় আমি জিতি। তখন বাবা আমাকে বলেন, ‘‌তোমার সম্মান তুমি আদায় করে নিয়েছো। মানহানির মামলা করার দরকার নেই।’‌ আমি ওই মামলাটা প্রত্যাহার করে নিই।
• তারপর যতীন চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা হয়েছে আপনার?‌
•• পরে তো যতীনদার সঙ্গে আমার খুব বন্ধুত্ব হয়ে যায়। যখন ফরিদাবাদে ওঁর মেয়ে মারা যান, তখন আমিই প্রথম যতীনদার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। হি ওয়াজ আ ফ্যান্টাস্টিক পার্সন। প্রতি পুজোয় আমি দাদাকে ধুতি, বৌদিকে শাড়ি দিতাম। উনি আমাকে বলতেন, তোমার এত ভাল ‘‌ভয়েস’, তুমি কেন রবীন্দ্রসঙ্গীত করো না?‌ ওঁর জন্যে ওঁর কথার জন্যেই আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করি, রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রথম অ্যালবাম করি। সেই রেকর্ড সুপার-‌ডুপার হিট হয়েছিল। যতীনদা আমার গান নিষিদ্ধ করেছিলেন, আবার ওঁর জন্যেই আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করলাম। জীবনে শুধু নেগেটিভ খুঁজতে নেই। সব কিছুর মধ্যেই পজেটিভ আছে। এটাই জীবনের ম্যাজিক।
• পুজোর গান তো কেউই এখন রেকর্ড করেন না। আপনি শুনলাম পুজোর গান করে ফেললেন?‌
•• গান ছাড়া পুজো হয়?‌ (‌হাসতে হাসতে)‌ পুজোয় চাই নতুন গান। তবেই তো দুর্গাপুজো সার্থক হবে। একটা নতুন গান তৈরি করেছি। রাজীব দত্তর লেখা। শুভজিৎ রায় আর আমি মিউজিক করেছি। এখন তো মিউজিক ভিডিও-‌র যুগ। আমি গেয়েছি আর ভিডিও-‌তে অভিনয় করেছেন খরাজ মুখোপাধ্যায়। মনে হয়, পুজোটা জমেই যাবে।
• কী গান গাইলেন?‌ একটু শোনা যাবে?‌
•• (‌গুনগুন করে)‌ বছর বছর মারতে অসুর/‌ চাই যে তোমায় মা/‌ দশ হাতে মন ভরিয়ে তোলো/‌ আর কিছু চাই না।
শুনতে শুনতে, সত্যিই‌ মন ভরে উঠছিল। মুম্বইতে জন্ম, চেন্নাইতে পিতৃভূমি, স্বামী কেরলের, কিন্তু আমাদের সামনে গুনগুন করে গান গাইতে থাকা ঊষা উত্থুপকে বাঙালি ছাড়া আর কিছুই মনে হওয়ার উপায় নেই। কণ্ঠে বাংলা গান, ললাটে বাংলা বর্ণমালার চিহ্ন। ‌‌

ছবি: বিপ্লব মৈত্র

জনপ্রিয়

Back To Top