অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়- তিনি এখন দ্বাদশ শ্রেণি। হায়ার সেকেন্ডারির একটা ‘‌পেপার’‌–এর পরীক্ষা এখনও বাকি। সেই তিনিই ছেলে, মেয়ে, নাতি, নাতনি নিয়ে নিত্য সামলান জানবাজারের রাজবাড়ি। তখন তিনি ‘‌রানী রাসমণি’‌। সেই ১৮ মার্চ থেকে শুধুই দিতিপ্রিয়া হয়ে টালিগঞ্জের ঘরে বন্দি হয়ে আছেন। শুটিং শুরু হবে জেনে দিতিপ্রিয়া এখন আস্তে আস্তে আবার মনে মনে রাসমণি হয়ে উঠছেন।
ফোন করতেই দিতিপ্রিয়া বলে ওঠেন, করোনার জন্যে কি কম বিপত্তি হল?‌ একদিকে বন্ধ হয়ে গেল শুটিং, অন্যদিকে আমার ‘‌এইচএস’‌–এর একটা পরীক্ষাও গেল পিছিয়ে।
২ জুলাই তাঁর সেই ‘‌এডুকেশন’‌–এর পরীক্ষা। পড়াশোনা অনেক দিন থেকেই তৈরি। চিন্তা নেই। ‘‌কিন্তু শুটিং নিয়ে চিন্তা আছে। আমার চেয়ে বেশি চিন্তিত বাড়ির লোকজন।’‌ বলেন দিতিপ্রিয়া।
তাহলে?‌ গিন্নিবান্নির মতো দিতিপ্রিয়া বলে ওঠেন, রানী রাসমণিতে আমি তো ‘‌লিড’‌। আমি চিন্তা নিয়ে বাড়িতে বসে থাকলে কি চলবে?‌ কিন্তু কত টেকনিশিয়ান দাদা সমস্যার মধ্যে আছে। সিরিয়াল শুরু না হলে তাঁদের চলবে কী করে?‌
এতদিন ঘর–বন্দি থেকে আবার ভিড়ের মধ্যে যেতে হবে, তাই মনের মধ্যে একটা ভয় আছে। কিন্তু এখন আরও স্বাবলম্বী হতে হবে। জল সঙ্গে নিতে হবে। দিতিপ্রিয়া বলেন, আমি তো নিজেই মেকআপ বক্স নিয়ে যাই। মেকআপটা না হয় নিজেই করব। কিন্তু, ‘‌হেয়ার’‌ পারব না। চুল বেঁধে দেবার জন্যে তো হেয়ার–ড্রেসার লাগবেই।
একটু চিন্তিত শোনায় দিতিপ্রিয়ার কণ্ঠ। বলেন, ‘‌বুধবার থেকে শুটিং শুরু। মনে হচ্ছে যেন যুদ্ধে যাব।’‌ তারপরেই আত্মবিশ্বাসী শোনায় দিতিপ্রিয়াকে। বলেন, সবরকম ব্যবস্থা তো নেওয়া হবে। স্যানিটাইজ করা হবে সব কিছু। আমার সঙ্গে আমার মা থাকবেন। সেটা একটা বড় ভরসা।
তাই বুধবার দিতিপ্রিয়া সেজেগুজে রানী রাসমণি হয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন ইন্দ্রপুরী স্টুডিওয়। এখন টিভিতে যাঁরা এই ধারাবাহিকের পুনঃপ্রচারে দেখছেন সদ্য বিবাহিতা রাসমণিকে, ১৫ জুন তাঁরা দেখবেন নাতি–নাতনি নিয়ে সংসারের সর্বময় কর্ত্রী প্রবীণা রাসমণিকে, নতুন পর্বে।
১০ জুন ধারাবাহিকের শুটিং শুরু হবে বলে সব স্টুডিওতেই গোছগাছ শুরু হয়েছে। দিতিপ্রিয়াও গোছগাছ শুরু করেছেন প্রবীণা রাসমণি হয়ে ক্যামেরার সামনে আসবেন বলে। কিন্তু টালিগঞ্জের প্রবীণা অভিনেত্রীরা মোটেই ভরসা পাচ্ছেন না শুটিং করার জন্যে।
লকডাউনের আগে ‘‌নকশি কাঁথা’‌য় পার্ট করছিলেন মাধবী মুখোপাধ্যায়। শুক্রবার দুপুরে যখন ফোন করি, তখন সবে সজনে ডাঁটা দিয়ে আলু পোস্তর তরকারি নামিয়েছেন বাঙালি দর্শকের চিরন্তন ‘‌চারুলতা’‌। বললেন, এই লকডাউনে কোনও বাইরের লোককে ঘরে আসতে দিইনি। কাজের লোকজনকে মাইনে দিয়ে ছুটি দিয়েছি। এত সাবধানতা নিয়ে থাকার পর কী করে শুটিং করতে যাব ক্যালকাটা মুভিটোনে?‌ রোজই তো এখন দেশে করোনায় আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এখন সত্যিই ভরসা পাচ্ছি না।
তারপর হাসতে হাসতে বললেন, প্রবীণদের অবশ্য ছাড় দেওয়া হচ্ছে তো শুনলাম। ওই ছাড়টা নিয়ে আরও কিছুদিন থাকি। লিখিত স্বীকারোক্তি দিয়ে শুটিং করার কী দরকার?‌ সত্যিই পারব না, সহজ স্বীকারোক্তি মাধবী মুখোপাধ্যায়ের।
টিভিতে এখন তাঁর পুরনো ধারাবাহিক ‘‌ভুতু’‌ দেখাচ্ছে। সেটা মাঝে–মধ্যে দেখছেন লিলি চক্রবর্তী। কিন্তু ‌ভুতুদের বয়সি শিশুশিল্পীদের এখন কাজ করা বারণ। তবে, ‘‌ভুতু’‌ তো পুনঃপ্রচার। যেমন পুনঃপ্রচারে ছোট লোকনাথকে দেখালেও, এখন শুরু হবে বড় লোকনাথের কাহিনি, যে চরিত্রে এখন ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়।
লিলি চক্রবর্তী বললেন, ভুতুদের যেমন ছাড় আছে, আমাদের মতো বয়স্করাও তো ছাড়ের তালিকায়। তবে, তাঁর ‘‌অন্য যশোদা’‌–র শুটিং হচ্ছিল লকডাউনের আগে। অন্য একটা সিরিয়ালও শুরু হওয়ার কথা হয়েছিল। পরান বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘‌পান্তুয়া’‌ নামের একটা ছবির শুটিং হয়েছে মাত্র দু’‌দিন। সবই আটকে আছে। কিন্তু মাধবী মুখোপাধ্যায়ের মতো লিলি চক্রবর্তীও একদমই রাজি নন এখন শুটিং করতে। বললেন, জানি আর্থিকভাবে সবাই অসুবিধের মধ্যে আছেন। আমিও আছি। কিন্তু এতটা ঝুঁকি নেওয়ার কী দরকার?‌ কতটা স্বাস্থ্যবিধি মানা যাবে শুটিং করতে গেলে?‌ প্রশ্ন লিলি চক্রবর্তীর। বললেন, এখন তো সংক্রমণ বেড়েই যাচ্ছে। আরও কিছুদিন অপেক্ষা করা যেত না?‌
অপেক্ষা করতে করতে অবশ্য ক্লান্ত আর এক প্রবীণা, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। বললেন, অভিনয় না করলে তো সুস্থ থাকতে পারি না। সবরকম সতর্কতা নিয়ে যদি শুটিং হয় তো হোক। আমি তো কাজ করতে চাই। তবে, ওই যে মুচলেকা দিয়ে নাকি আমাদের কাজ করতে হবে, এটা মানতে আমি রাজি নই। আরে, আমি রোজ সত্তর পাক হাঁটি ছাদে, এক্সারসাইজ করি। আমার প্রেসার নেই, শুগার নেই। কেন আমার নিজের সার্টিফিকেট নিজে দেব?‌ যারা শুটিং করাবে, তারা ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করে নিক। আমি কিছু লিখে দিতে পারব না। এই আমার স্পষ্ট কথা। ‘‌কোড়া পাখি’‌ ধারাবাহিকে কাজ করার কথা হয়েছিল আগে। লিখিত–পড়িত কথা দিয়ে কিংবদন্তি অভিনেত্রী ক্যামেরার সামনে আসতে রাজি নন।
দাসানি এক নম্বর স্টুডিওয় অবশ্য ১০ জুনেই ক্যামেরার সামনে আসবেন ‘‌শ্রীময়ী’‌ ইন্দ্রাণী হালদার। ইন্দ্রাণী বললেন, সবরকম সাবধানতা নিয়েই কাজ করতে হবে। আমি নিজেও নজর রাখব। রিস্ক তো আছে, কিন্তু কাজ বন্ধ করে কতদিন বসে থাকবেন সবাই?‌
‘‌শ্রীময়ী’‌–তেই ইন্দ্রাণীর জুটি হিসেবে বেশ কিছুদিন পরে আবার ধারাবাহিকে ফিরেছেন টোটা রায়চৌধুরি। রোজ ব্যায়াম, প্রাণায়াম করা স্বাস্থ্য–সচেতন টোটা মনে করেন, কাজ শুরু করতেই হবে। কিন্তু সতর্ক হতে হবে। চারপাশে অনেকেই কিন্তু সেটা মানছেন না। সেটাই সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন মগজাস্ত্রে বিশ্বাসী, সদ্য ওয়েব সিরিজের ‘‌ফেলুদা’‌ টোটা রায়চৌধুরি।
টোটা ফিরছেন ‘‌শ্রীময়ী’‌তে। বললেন, ‘‌শ্রীময়ী’‌ তো আজকের সময়ের গল্প। সেখানে কিন্তু করোনা বা সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং–এর প্রসঙ্গও আসতে পারে।
সত্যিই আসছে নাকি?‌ এই রহস্য অবশ্য ভাঙলেন না ‘‌শ্রীময়ী’‌র কাহিনিকার লীনা গঙ্গোপাধ্যায়।
 

জনপ্রিয়

Back To Top