অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় 
এতটা অনিশ্চিত অবস্থায় কখনও পড়েনি বাংলা সিনেমা শিল্প। লকডাউন এবং তিন মাসের অনিশ্চিত ও ছবির অবস্থা কাটিয়ে শুটিংয়ে ফিরেছে টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রি। কিন্তু চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে, নির্দিষ্ট সেটে মাসের পর মাস শুটিং হয় ধারাবাহিকের। সিনেমায় সেটা সম্ভব নয়। তাই টালিগঞ্জের বড় প্রযোজক, পরিচালকরা কেউই বলতে পারছেন না তাঁরা কবে শুটিংয়ে ফিরবেন। কেউ কেউ বললেন, সিনেমার শুটিং কবে শুরু হবে, সেটা এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমরা ভাবতেই পারছি না। 
বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তো অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে পৌঁছে গেল?‌ প্রশ্ন শুনে পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, শুধু বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি?‌ সারা বিশ্বের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এখন অনিশ্চিত অবস্থায়। তারপর, একটু থেমে, ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে কৌশিক বললেন, জীবন, জগৎ সবটাই এখন অনিশ্চিত। সিনেমা তো সেই জগৎ আর জীবনের একটা ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। 
প্রায় একই দার্শনিক উপলব্ধি ইন্ডাস্ট্রির সর্বজনীন ‘‌দাদা’‌ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের। বিদেশ থেকে সেই কাকাবাবুর শুটিং করে বাড়ি ফিরেছেন ১৯ মার্চ। গৃহবন্দি প্রসেনজিৎ বললেন, জীবনটাই তো পাল্টে গেল। বদলে গেল সব ইকুয়েশন। কোথায় গিয়ে দাঁড়াব আমরা। এইটাই তো আমার প্রফেশন। সিনেমা, সিনেমা আর সিনেমা। আর তো কিছু পারি না। ভয়–‌ই হচ্ছে। কবে শুটিং শুরু করতে পারব, কবে দাঁড়াব ক্যামেরার সামনে, কবে শুনব লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন শব্দগুলো, জানি না। কিচ্ছু জানা নেই। 
জানা নেই বলেই, নিজের প্রযোজিত এবং অভিনীত অন্যরকম ছবি ‘‌নিরন্তর’‌–‌এর রিলিজ নিয়ে এক বছর ধরে নানান প্ল্যান থাকা সত্ত্বেও কিছু করা যায়নি করোনা ‌পরিস্থিতির জন্যে। শেষ পর্যন্ত টিভিতে রিলিজ হয়েছে এই ছবি। প্রসেনজিৎ বললেন, ‘‌কতদিন আটকে রাখব ছবিটা?‌ কেউ তো কিচ্ছু জানি না, কবে স্বাভাবিক পরিস্থিতি আসবে।’‌ যদিও তাঁর ছবি, সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘‌কাকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’‌ পুজোয় রিলিজ হবে বলে জানিয়েছে প্রযোজনা সংস্থা এসভিএফ। ‘‌কিন্তু, সিনেমা হল খোলার মতো পরিস্থিতি কবে আসবে, সেটাই তো আমাদের জানা নেই’‌— বললেন প্রসেনজিৎ। ঠিক তেমনই জানা নেই, কবে শুরু হতে পারে তাঁর নতুন ছবির শুটিং, অভিনেতা হিসেবে যেমন, প্রযোজক হিসেবেও। 
দেবকে নিয়ে ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ‘‌গোলন্দাজ’‌ ছবির শুটিং শুরু হয়েছিল লকডাউনের আগেই। এখন গোলন্দাজ স্তব্ধ। এসভিএফ এন্টারটেনমেন্ট থেকে জানা গেল, কবে আবার শুটিং শুরু হতে পারে গোলন্দাজ–‌এর, পুরোটাই অনিশ্চিত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে, নতুন কোনও ছবির শুটিংও শুরু হওয়া সম্ভব নয়। 
সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘‌কাকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’‌ যেমন, অরিন্দম শীলের ‘‌মায়াকুমারী’‌ও পুজোয় রিলিজ হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। অরিন্দম বললেন, এরকমই প্ল্যানিং। এখন দেখা যাক, পরিস্থিতি কেমন থাকে, হল কবে খোলে। সবটাই আশার ওপরে আছি আমরা। করোনার ভ্যাকসিনের দিকেও আশা নিয়েই তাকিয়ে আছি আমরা। 
নতুন ছবির শুটিং কবে শুরু হতে পারে?‌ অরিন্দম বললেন, সবই রেডি করে বসে আছি। ‘‌খেলা যখন’‌ ছবিতে প্রচুর আউটডোর আছে, তাই এটা এখন ভাবতে পারছি না। নতুন ‘‌শবর’‌ করব। এটার শুটিং সবই কলকাতায়। কিন্তু, অরিন্দমও বললেন, সবই এত অনিশ্চিত, যে কোনও কিছু প্রেডিক্ট করা যাবে না। 
নন্দিতা রায়, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রতি বছরই বক্স–‌অফিস সফল ছবি নিয়ে আসছেন, লাগাতার। সবকিছু যখন স্তব্ধ ছিল, তখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে, মোবাইল ফোনে শুট করে, উইনডোজের একটার পর একটা শর্ট ফিল্ম এসেছে অনলাইনে। কিন্তু বড় ছবির শুট এই পরিস্থিতিতে সম্ভব নয়, জানালেন নন্দিতা রায়। তাদের হাতে আছে ‘‌বেলা শুরু’‌। এই ছবি নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ অনেকখানি। বেলাশেষের স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এখানেও প্রধান ভূমিকায়। কিন্তু এই ছবিও কবে রিলিজ হবে, সবটাই নির্ভর করছে পরিস্থিতির ওপর। 
সুরিন্দম ফিল্মসের হাতে এখন তৈরি হওয়া ন’‌টা ছবি। তার মধ্যে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি যেমন আছে, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের ছবিও রয়েছে। সেই সব ছবির রিলিজ কবে হবে, সেটাই এখন অনিশ্চিত। তাই, নতুন ছবির শুটিং কবে শুরু হবে, পুরোটাই অনিশ্চিত। সব বড় প্রযোজক এবং পরিচালক একই কথা বলছেন। 
ইতিমধ্যে ছোট বাজেটের ছবি, শ্যামল বসুর ‘‌সময়’‌–‌এ রুবির কাছে একটা বাড়িতে একদিন শুটিং করলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। পরিচালক বললেন, আমি ভাবতে পারিনি, ওই পরিস্থিতিতেও উনি শুটিং করতে রাজি হবেন। অন্যদিকে অংশুমান প্রত্যুষের ‘‌এস ও ‌এস’‌ কলকাতা ছবির জন্যে পার্পল স্টুডিও–‌য় একদিন মিমি চক্রবর্তী ও একদিন নুসরত জাহান শুটিং করলেন। এগুলোকে বিচ্ছিন্ন দৃষ্টান্ত হিসেবেই দেখছে টালিগঞ্জের সিনেমা মহল। কারণ, সারা বছর যে–‌সব পরিচালকের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকেন দর্শকরা, তাঁরা কেউই এই সময়টাকে শুটিংয়ের উপযুক্ত বলে মনে করছেন না। ধারাবাহিকের পাশাপাশি সিনেমাও পরিচালনা করেন লীনা গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর নতুন ছবির চিত্রনাট্য তৈরি। কিন্তু, লীনা বললেন, ধারাবাহিকের শুটিং যে করা সম্ভব, সেটা তো আমরা প্রমাণ করছি। কিন্তু সিনেমার শুটিং কবে শুরু করা সম্ভব, এটা বলা সত্যিই কঠিন। কোনও পরিকল্পনা করা যাচ্ছে না। 
আর, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, এইসব পরিকল্পনা করার কোনও অধিকারই আমাদের নেই, একটা ভাইরাস এসে আমাদের জানিয়ে দিল। 
তাই, টালিগঞ্জ সিনেমা মহল এখন শুটিং শুরুর দিন ঘোষণা করার সাহস পাচ্ছে না। ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top