সরোদ তাঁর হাতে কথা বলে। সঙ্গীতচর্চা তাঁর সাধনা। আর ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা, অবসর। বিদেশ আর ভিনরাজ্যে দৌড়ে ফাঁকে ধরে ফেললেন উদ্দালক ভট্টাচার্য।

 এই দফায় ক’দিন কলকাতায় আছেন?‌ 
পণ্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা অনুষ্ঠান আছে। একটা বক্তৃতা। ধ্রুপদী সঙ্গীতের তালিমের তাৎপর্য নিয়ে আমায় বলতে হবে। হাতেকলমে প্রয়োগিক দিকও বুঝিয়ে দিতে হবে। ওটার পর যাব দক্ষিণ ভারতে। সেখানে চেন্নাই, পুদুচেরি–সহ আরও বেশ কয়েকটা শহরে আমার অনুষ্ঠান আছে। এপ্রিলের ৩ অথবা ৪ তারিখে আবার কলকাতায় ফিরব।
 আপনি বাইরে যত অনুষ্ঠান করেন কলকাতায় তত নয় কেন?‌ 
তেজেন্দ্রনারায়ণ: কলকাতায় আমি ইচ্ছে করেই খুব বেছে বেছে অনুষ্ঠান করি। আমাকে কলকাতার লোক অনেকদিন ধরে নানা অনুষ্ঠানে অনেকবার শুনেছেন। তাই মাঝেমধ্যে অনুষ্ঠান হলে লোকের মধ্যে একটা আগ্রহ তৈরি হয়। এ ব্যাপারে আমি একটু ছেঁকে নেওয়ায় বিশ্বাসী। তবে এই বছর খুব একটা কম অনুষ্ঠানও করিনি। কলকাতার যে কটা বড়বড় ধ্রুপদী সঙ্গীতের অনুষ্ঠানমঞ্চ আছে, তার প্রায় সবক’টাতেই আমি বাজিয়েছি। 
 কলকাতায় কি ধ্রুপদী সঙ্গীতের শ্রোতা কমে গেছে?‌ শহরের বাইরে দেশে বা বিদেশে এই শ্রোতার সংখ্যাটা কেমন?‌
তেজেন্দ্রনারায়ণ: কলকাতায় শ্রোতা কমে গেছে বলে আমার মনে হয় না। তবে সঙ্গীতের শিক্ষিত শ্রোতা, যা আগে অনেকেই ছিলেন, তাঁদের সংখ্যাটা অনেকটা কমে এসেছে। এখনও এই শহরে বেশ কয়েকটা বড় ধ্রুপদী সঙ্গীতের অনুষ্ঠান হয়। আমি নিজে একটা বড় ধ্রুপদী সঙ্গীতের অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। সেখানে তো সবসময় হাউসফুলই থাকে। কিন্তু এটাও ঠিক যে, বড়মাপের অনুষ্ঠান আয়োজন করা সহজ নয়। তার জন্য যে পরিশ্রম এবং যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়, ততটা সবসময় পাওয়া যায় না। এর পাশাপাশি স্পনসরশিপের কথাও বলতে হবে। সবকিছুতেই অর্থ প্রয়োজন। মহারাষ্ট্র ও দক্ষিণ ভারতের বেশ কয়েকটা শহরে সেটা বেশি পাওয়া যায়, তাই আয়োজনও সেখানে বেশি হয় হয়ত।
 আপনি পেশা হিসেবে সরোদশিল্পী হওয়ার সিদ্ধান্তটা কবে নিলেন?‌ সিদ্ধান্তটা নিতে ভয় করেনি?‌
তেজেন্দ্রনারায়ণ: হঠাৎ করে তো নিইনি! আমি একটা সাঙ্গীতিক পরিবেশে বড় হয়েছি। আমার বাবা, ঠাকুরদার কাছ থেকে ছোটবেলায় শিক্ষা পেয়েছি। তারপর ওস্তাদ বাহাদুর খাঁ সাহেবের কাছে শিখেছি। তবে পাঁচটা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের মতো পড়াশোনাও করেছি। পাশাপাশি সঙ্গীতশিক্ষাও চালিয়ে গেছি। এটা তো ঠিক কথা যে, ছোটবেলায় ওভাবে কেউই বুঝতে পারে না যে, সরোদ বাজানোটাই তার পেশা হবে। অল ইন্ডিয়া রেডিওর মিউজিক কম্পিটিশনে প্রথম হওয়ার পর থেকেই আমার জীবনের ছবিটা পাল্টে যায়। অনেকে বলেন, আমার সরোদ বাজানোটাকে প্রচণ্ড সিরিয়াসলি নেওয়া উচিত। পেশাদার জীবনে প্রবেশের সময়ে চাকরির প্রস্তাব আসছিল। কিন্তু আমার মা–বাবা আমাকে পেশাদার সঙ্গীতকর্মী হিসেবেই দেখতে চেয়েছিলেন। সেটা আমার একটা বড় পাওনা। আর আমার গুরু তো ছিলেনই। কিন্তু এটা তো আর ফাটকা খেলা নয়। মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের উচ্চমার্গে পৌঁছানোর জন্য। আমাকেও পড়ে থাকতে হয়েছে। লড়াই করতে হয়েছে। আমার গুরু এবং অভিভাবকরা একটা নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছনোর আগে আমাকে বাইরে, এমনকী, আকাশাবাণী বা যুববাণীতেও অনুষ্ঠান করতে দেননি। ফলে এখনকার মতো ছোট বয়সে বিখ্যাত হওয়ার সুযোগ আমার ছিল না। রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কার নেওয়ার পর আমি বাইরে অনুষ্ঠান করতে শুরু করি। ফলে ঝুঁকি ছিলই। চাকরির মতো মাসমাইনের সুরক্ষা তো আর এই পেশায় ছিল না। 
 তারপর তো আপনাকে ধ্রুপদীসঙ্গীতের জগতে সবাই চিনল। কিন্তু ফিল্মের কাজ নিয়মিত করেন না কেন আপনি?‌
তেজেন্দ্রনারায়ণ: ফিল্মের কাজ আমি করি। বিভিন্ন ছবির সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে আমি একাধিক সাফল্য পেয়েছি। কিন্তু ছবিতে কাজ করার ক্ষেত্রে আমার কতগুলো শর্ত সবসময় কাজ করে। মানে আমার শিল্পগত কয়েকটা চাহিদা আছে। যেগুলো নিয়ে আমি সমঝোতা করব না। সেটা মেনে নিয়ে যাঁরা আমাকে কাজ করতে দেন, আমি তাঁদের সঙ্গেই কাজ করি। আর সময়ও তো তেমন পাই না। সারা বছর দেশে–বিদেশে ঘুরে অনুষ্ঠানে বাজাতে হয় আমায়। যে সময়টা ওই অনুষ্ঠানের চাপ কম থাকে, তখন ছবির কাজ করতে পারি। তাতেই যা হয়। তবে আমি তো কোনওদিনই জনপ্রিয় সঙ্গীত পরিচালক হতে চাইনি। আমার একমাত্র কাজ হল মঞ্চে হাজার হাজার শ্রোতার সামনে যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। সেটা করে চলব। পাশাপাশি সময় পেলে সঙ্গীত পরিচালনার কাজ করব। তবে সম্প্রতি একটা ছবির কাজ নিয়ে আমি বেশ উত্তেজিত। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও নাসিরুদ্দিন শাহ অভিনীত শৈবাল মিত্রের যে ছবিটি, তার সঙ্গীত পরিচালনা করছি আমি। 
 সঙ্গীতচর্চা না প্রথাগত চাকরি— এই প্রজন্মের অনেকেই এই দ্বিধায় ভোগেন। পণ্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণ তাঁদের কী বলবেন?‌
তেজেন্দ্রনারায়ণ: এটা একেবারে নিজের সিদ্ধান্ত। তার পরিবেশ, আত্মবিশ্বাস ও নিজের ক্ষমতার প্রতি আস্থা এই ধরণের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। সাধারণ গানবাজনার ক্ষেত্রে ইদানিং দেখছি অনেকেই খাটছে। মন দিয়ে তালিমও নিচ্ছে। কিন্তু সেরকম প্রচারের আলোয় আসতে পারছে না। উল্টোটাও আছে। মানে তেমন সঙ্গীতশিক্ষা বা তালিম নেই। অথচ হঠাৎ করে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে একটা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিশেষত, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ক্ষেত্রে যারা বছরের পর রেওয়াজ করে, তালিম নিয়ে নিজেকে তৈরি করছে, তাদের মধ্যে একটা হতাশা তৈরি হচ্ছে। তারা ভাবছে, ‘‌ক’দিন শিখেই একজন বিখ্যাত হয়ে গেল। আর আমি এতদিন তালিম নিয়েও কিছু করতে পারলাম না।’‌ এটা আমারও খারাপ লাগার একটা জায়গা। কবে এই অবস্থা পাল্টাবে জানি না। হুজুগের চোটে রিয়েলিটি–শো মাতিয়ে যারা এখন জনপ্রিয় হয়েছে, তাদের প্রকৃত তালিম না থাকলে ভবিষ্যতে জনপ্রিয়তা ধরে রাখা অসম্ভব। কিন্তু সঙ্গীতের শিক্ষা যার আছে, তার পরিবেশনা মানুষের মনে থেকে যাবেই। এ আমার বিশ্বাস। ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top