রক্ষণশীল দক্ষিণী পরিবারের মেয়ে। সেজন্যই তাঁর মাথা ঘোরে না সাফল্যে। শোভিতা ধুলিপালা হলেন মেধা ও ধৈর্যের যোগফল। লিখলেন দেবারতি দাশগুপ্ত।

‌কী পড়ছি সেটা বড় কথা, কী পরছি সেটা নয়। কারণ দিনের শেষে আর সব ছেড়ে চলে গেলেও বিদ্যাবুদ্ধি সঙ্গ ছাড়ে না। এই আপ্তবাক্য মূলমন্ত্র করে মেয়েটির বড় হওয়া। পাহাড়–সমুদ্র ঘেরা ছোট, সুন্দর শহর বিশাখাপট্টনমের যে পরিসরে তার বেড়ে ওঠা, সেখানে জ্ঞানবুদ্ধিই মূলধন বলে গ্রাহ্য হত। বইকে আঁকড়ে ধরেই শৈশব, কৈশোর পার করেছিল মুখচোরা মেয়েটি। 
স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে মুম্বইয়ে পাড়ি দিতেই এতদিনের সুলালিত বিশ্বাস নির্মম ধাক্কা খেল। সেখানে ‘‌ড়’‌ আর ‘‌র’‌ ওলটপালট হয়ে দাঁড়াল— কী পরছি সেটাই বড় কথা, কী পড়ছি সেটা নয়!‌ মুম্বইয়ের এইচ আর কলেজ অফ কমার্সের প্রথম বর্ষের ছাত্রী তাই যখন লম্বা চুলে ভাল করে তেল দিয়ে বিনুনি দুলিয়ে, একেবারে সাদামাঠা পোশাক পরে ক্লাসে গিয়েছিল, তখন প্রথমদিনই সহপাঠিনীরা নাক সিঁটকে তাকে একঘরে করেছিল। কেউ ফিরেও তাকাত না। 
দিন যায়। একদিন ক্লাসের সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতেই ‘মিস ইন্ডিয়া’ প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে দিলেন তখন বছর উনিশের কলেজছাত্রী। পরিকল্পনা ছিল— প্রথম রাউন্ডে উঠলেই হল। অন্তত সবাই তো জানবে, তিনিও কিছু করতে পারেন। কিন্তু ভবিতব্য অন্য পরিকল্পনা ছকে রেখেছিল। বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা মেয়েটিই সবাইকে হারিয়ে ‘মিস ইন্ডিয়া’‌র মুকুট পরে ফেললেন। সেটা ২০১৩ সাল। অতঃপর মডেলিং, বিজ্ঞাপন, কিছু ছবিতে ছোটখাটো ভূমিকার পর এখন ওয়েব সিরিজের তারকা শোভিতা ধুলিপালা। ‘‌মেড ইন হেভ্‌ন’‌ –‌এ তাঁর অভিনীত চরিত্র তারা খান্না ওয়েব দুনিয়া তোলপাড় করে দিয়েছে। 
শোভিতার রাতারাতি ওয়েবের তারা হওয়া কি সেই চিরায়ত কুৎসিত হাঁসের ছানার রাজহাঁস হয়ে ওঠার গল্প?‌ 
নাহ্‌। বলছেন শোভিতা নিজেই। অন্ধ্রপ্রদেশের কট্টর ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে। তেনালিতে জন্ম, বিশাখাপট্টনমে বেড়ে ওঠা ২৬ বছরের শোভিতা বলছেন, বরং উল্টোটাই। ‘মিস ইন্ডিয়া’‌র শিরোপা তাঁর আত্মবিশ্বাস একেবারে দুরমুশ করে দিয়েছিল। নিজের সত্ত্বাই লোপ পেয়েছিল একরকম। 
বলেন কী!‌ 
শোভিতার কথায়, ‘‌একথা সত্যিই যে, জীবনে ওই প্রথম নজর কাড়তে পেরেছিলাম। যা আমাকে কলেজের ‌নির্মম দিনগুলোর ব্যথা ভুলিয়ে দিয়েছিল। তবে নিজেকে নিজেরই অচেনা লাগছিল। বরাবর জানি, আমি দেখতে ভাল নই। তাই পড়াশোনায় জোর দিতেই হবে। এক বুদ্ধিবৃত্তিই হল সেই জিনিস, যা খেটেখুটে অর্জন করা যায়। ম্যাজিক কোনও জিন তো নয়!‌ মিস ইন্ডিয়া হয়ে রাতারাতি সব পাল্টে গেল। সবার মন জুগিয়ে চলতে হবে। সুন্দর সুন্দর কথা বলতে হবে। মুখে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে রাখতেই হবে। যা–ই হোক না কেন। ওই বোধটা আমায় একেবারে গেঁথে দিল। সে এক দমবন্ধ করা অবস্থা!‌ বারবার মনে হত, এ তো আমার শিক্ষাদীক্ষা নয়। নিজেকে ছোট মনে হত। অস্তিত্বের সঙ্কট হচ্ছিল। খালি মনে হত, এর শেষ কোথায়?‌ সবসময় মনমরা হয়ে থাকতাম।’‌ 
অভিনয়ে বুদ্ধি প্রয়োগ করা যায়। এই ভাবনা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে ডাক এল অনুরাগ ক্যাশপের প্রযোজনা সংস্থা থেকে। ছবির নাম ‘‌রামন রাঘব ২.‌০’‌। ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত থ্রিলারধর্মী ছবিটিতে শোভিতার চরিত্রটি দৈর্ঘ্যে ছোট ছিল। গুরুত্বে নয়। সহ অভিনেতা নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকির সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে অভিনয় করে কুলীন কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা সহ অভিনেত্রীর বিভাগে মনোনীত হয়েছিলেন সেলুলয়েডে একেবারেই আনকোরা শোভিতা। এরপর ‘‌শেফ’‌ এবং ‘‌কলাকান্দি’‌ (‌দু’‌টি ছবিই সইফ আলি খানের সঙ্গে)‌। আবারও ছোট চরিত্র কিন্তু তুমুল আলোচিত। বড় ব্রেক দিলেন জোয়া আখতার। অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও–‌র জন্য তাঁর ওয়েব সিরিজ ‘‌মেড ইন হেভ্‌ন’–‌এ। আড়ে–বহরে, গুরুত্বে বড় চরিত্র তারা খান্নার ভূমিকায় অভিনয় করার প্রস্তাব দিয়ে। ওয়েব সিরিজ বিষয়টি নতুন হলেও ইতিমধ্যে বেশ চালু। বড়পর্দায় মূলধারার ছবির থেকে স্বতন্ত্র, স্বাধীন ছবির মাধ্যম ওয়েব। এখানে মুড়িমিছরি একদর নয়। 
ওয়েব সিরিজই জীবনই পাল্টে দিয়েছে তাঁর। ভাবনার রসদ যুগিয়েছে। অভিনয় উন্নত করেছে। এখন অকপটে স্বীকার করেন সারা দেশে (বিদেশেও) ওয়েব দর্শকদের মধ্যে হইচই ফেলে দেওয়া শোভিতা। তবু কোনও তাড়াহুড়ো নেই তাঁর। মাথা ঘোরেনি। পা এখনও বাস্তবের মাটিতেই। 
‘‌মেড ইন হেভ্‌ন’‌–‌এর মূল কাহিনী দুই ওয়েডিং প্ল্যানারের। যারা মহার্ঘ সব বিয়ের খুঁটিনাটি পরিপাটি করে সাজিয়ে তোলে। তাদেরই একজন তারা খান্না ওরফে শোভিতা। সব বিয়ে আসলে স্বর্গীয় নয়। নিছক সাজানো গোছানো ভাল থাকার অভিনয়। সবটাই সমঝোতা। সেই সত্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে সমান্তরালে চলে তারার বিবাহিত জীবন। মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়ে, অতঃপর ডাকসাইটে শিল্পপতির স্ত্রী তারার অসুখী গৃহকোণ, নিত্য বিবাদ থেকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে শেখায় তাঁর বহির্জগৎ। 
সিরিজের শেষ দৃশ্যটি শোভিতার প্রিয়তম। যেখানে ব্যস্ত দিনের শেষে আপাতমস্তক অলংকারে সজ্জিতা তারা বাথটাবে গা এলিয়ে দেয়। প্রাপ্তি–অপ্রাপ্তির সঙ্ঘাত ওই দৃশ্য। যা কড়ি দিয়ে কেনা যায়, তার সবটুকু হাতের মুঠোয়। নেই শুধু সুখ। 
যেমন পর্দার বাইরের ধৈর্যশীলা শোভিতা বলে দেন, বাথটাবের বুদবুদের মতোই তাঁর এই তারকা সত্ত্বা, তাঁকে ঘিরে এই উন্মাদনা। সব স্বল্পায়ু। এই আছে এই নেই। 
রিল আর রিয়েল লাইফে শোভিতা আর তারা কোথায় মিলেমিশে একেবারে হয়ে যান!‌ ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top