অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় 
৪৮ বছর পেরিয়ে আজ সিনেমার ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তি পাচ্ছে ‘‌মারীচ সংবাদ’‌। ১৯৭২ সালে তৈরি হয় ‘‌চেতনা’‌ নাট্যগোষ্ঠী। প্রথম বছরেই অরুণ মুখোপাধ্যায় রচিত, নির্দেশিত ‘‌মারীচ সংবাদ’‌ মুগ্ধ করে দর্শকদের। আলোড়িত নাট্যমহল। উৎপল দত্ত বলেছিলেন, ‘‌প্রতিক্রিয়ার দুর্গে কামান দেগেছে মারীচ সংবাদ’‌। লোকের মুখে মুখে ফিরতে থাকে‌ মেরিবাবার গান। অভিনয়ে এবং মেরিবাবার গানে দর্শকদের মাতিয়ে দেন বিপ্লবকেতন চক্রবর্তী। তিনিই মূল গায়েন। সঙ্গে ছিলেন ‘‌ওস্তাদ’‌ শিবশঙ্কর ঘোষ। দুই অভিনেতাই আজ প্রয়াত। ছবি হিসেবে ‘‌মারীচ সংবাদ’‌ রিলিজের একদিন আগে চেতনা–‌র আজকের নাট্যনির্দেশক সুজন মুখোপাধ্যায় বললেন,‌ আনন্দের দিনেও তাই মন খারাপ ওই দুই অসাধারণ অভিনেতার জন্য। কিন্তু আবার তাঁরা নতুন করে দর্শকদের সামনে আসছেন আজ। ‘‌মাই সিনেমা হল অ্যাপ’‌–‌এ আজই ডিজিটাল সিনেমা হিসেবে রিলিজ করছে ‘‌মারীচ সংবাদ’‌। 
এই নাটক প্রথম অভিনয়ের ৯ বছর বাদে ১৯৮৩ সালে মঞ্চনাটকের আঙ্গিক রেখেই ১৬ মিলিমিটারে চলচ্চিত্রায়িত করা হয় ‘‌মারীচ সংবাদ’‌। পরবর্তীকালে প্রিন্ট নষ্ট হয়ে যায়। একটা ভিএইচএস কপি থেকে ডিজিটাল ফর্মাটে রূপান্তরিত করা হয়েছে। 
মঞ্চে এই ৪৮ বছরে অন্তত ১২০০ রজনী অভিনীত হয়েছে ‘‌মারীচ সংবাদ’‌। যাঁরা মঞ্চে এই নাটক দেখেছেন, তাঁরা কি তৃপ্ত হবেন ডিজিটাল মাধ্যমে এই নাটক দেখে?‌ এই নাটকের স্রষ্টা ও নির্দেশক অরুণ মুখোপাধ্যায় বললেন, নাটক দেখতে হয় মঞ্চে, এটাই থিয়েটারের গর্ব। কিন্তু এটা একটা ডকুমেন্ট। ডিজিটাল মাধ্যমে দেখে মানুষ ‘‌মারীচ সংবাদ’‌–‌এর কিছুটা আভাস পাবেন। এই সবই আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে। যেমন শিশির ভাদুড়ি সম্পর্কে কত কথা আমরা পড়েছি, কিন্তু তাঁর থিয়েটারের অভিনয়ের কোনও আন্দাজ তো আজকের মানুষ পাবেন না। এমনকী শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্তর মঞ্চ অভিনয়ের আভাস পাওয়াও তো আজকের দর্শকের নাগালের বাইরে। তাই, এই ধরনের কাজ একটা সংরক্ষণের প্রচেষ্টা। 
একই কথা বললেন তাঁর পুত্র সুজনও। সুজন জানালেন, ৮৩ সালে যখন এই চলচ্চিত্ররূপ তোলা হয়, তখন ঋষি বালকের পার্ট করেছিলেন তিনি। তাঁর দাদা সুমন মুখোপাধ্যায় নাটকে রামায়ণ পাঠ করেছিলেন। পরবর্তীকালে যখন বিপ্লবকেতন চক্রবর্তী অভিনয় করতে পারেননি, তখন মঞ্চে মেরিবাবার গানে দেখা গেছে কখনও সুমনকে, কখনও সুজনকে। ডিজিটাল ফর্মাটে এইভাবে থিয়েটারকে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে সংরক্ষণ মূল্যকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন ব্রাত্য বসু, দেবশঙ্কর হালদারও। উত্তরসূরিদের কাছে কিছুটা আন্দাজ পৌঁছনোটাও তো কম মূল্যবান নয়, বললেন অরুণ মুখোপাধ্যায়। 
আর, সেই কথার হাতে‌নাতে প্রমাণ দিচ্ছে সাড়ে চার বছরের শাহিদা। ২০১৮ সালের নভেম্বরে যখন প্রয়াত হন তার ‘‌দাদাই’‌ বিপ্লবকেতন চক্রবর্তী, তখন এই প্রবীণ অভিনেতা সেভাবে কথা বলতে পারতেন না। এরই মধ্যে তার দাদাইয়ের গাওয়া মেরিবাবার গান শাহিদা দেখেছে ডিজিটাল ফর্মাটে। নতুন করে চিনল সে তার দাদাইকে। শাহিদার মা অর্থাৎ বিপ্লবকেতনের মেয়ে অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী বললেন, আমার মেয়ে তো এখন নেচে, গেয়ে মাত করছে মেরিবাবার গানে। মুখভঙ্গি করে গাইছে, ‘‌আস্ত গিলে খাব’‌। শুক্রবার (‌আজ)‌ পুরো নাটকটাই সে দেখবে। সুদীপ্তা বললেন, আমি জানি, খুশিতে আরও ডগমগ হয়ে যাবে আমার মেয়ে। এই উত্তরাধিকারটা বাবা রেখে গেলেন ‘‌মারীচ সংবাদ’‌–‌এ। 
সন্দেহ নেই, এই প্রজন্মের আরও বহু নতুন দর্শকের কাছে উত্তরাধিকারের বার্তা পৌঁছে দেবে থিয়েটারের এই সংরক্ষণ। মাই সিনেমা হল অ্যাপের কর্ণধার কল্যাণময় চট্টোপাধ্যায় বললেন, আরও অনেক নাটককে আমরা এইভাবে পৌঁছে দেব আজকের দর্শকদের কাছে। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top