বাস্তবের নাম নয়, তামাম দুনিয়া কিট হ্যারিংটনকে চেনে তাঁর পর্দার নামে। ‘গেম অফ থ্রোন্‌স’ টিভি সিরিজে তাঁর আবেদন ঈর্ষণীয়। ফিরে দেখলেন দেবাশিস পোদ্দার।

রোয়ান অ্যাটকিনসন বা ড্যানিয়েল র‌্যাডক্লিফকে চেনেন? বলা কঠিন। কিন্তু মিস্টার বিন বা হ্যারি পটার? রোয়ান আর ড্যানিয়েলের মুখই ভাসবে। জন স্নো–ও তেমনই। এইচবিও–র বিশ্ববিখ্যাত টিভি সিরিজ ‘‌গেম অফ থ্রোন্‌স’‌–এর চরিত্র। অভিনয়ে ব্রিটিশ যুবক কিট হ্যারিংটন। কিন্তু এ আবার পুরোপুরি অভিনয়ও নয়। ব্যক্তিসত্ত্বা ছাপিয়ে জন স্নো আর কিটের মধ্যে অদ্ভুত মিল।
ক্রিস্টোফার ক্যাট্‌সবি হ্যারিংটন। এটাই যে তাঁর পুরো নাম, সেটা ১১ বছর জানতেন না কিট। প্রখ্যাত নাট্যকার ক্রিস্টোফার মারলোর নামে এই নাম রেখেছিলেন কিটের মা ডেবোরা জেন ক্যাট্‌সবি। যিনি নিজে নাট্যকার। ‘‌গেম অফ থ্রোন্‌স’‌–এর কাল্পনিক পৃথিবীর উত্তরে ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম উইন্টারফেল। সেই উত্তরভাগের শাসক নেড স্টার্ক। গল্পের শুরুতে নেডের জারজ সন্তান হিসেবে আসেন জন স্নো। গল্প যত এগোয় ততই পরিষ্কার হয় জনের আসল পরিচয়। জানা যায় তাঁর আসল নাম এগন টারগেরিয়ান। জানা যায় তাঁর পিতৃপরিচয়ও।
বাস্তবের কিটের জন্ম ১৯৮৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর লন্ডনের অ্যাকটনে। বাবা স্যর ডেভিড হ্যারিংটন ব্যবসায়ী এবং ব্রিটেনের ১৫তম ব্যারোনেট (‌ব্রিটিশ রাজপরিবারের বিশেষ উপাধি)‌। তাঁদের বংশের ধারায় বইছে রাজা দ্বিতীয় চার্লসের রক্ত। এমনকী, রানি এলিজাবেথের (‌প্রথম)‌ জন্য আধুনিক ফ্লাশ টয়লেটের আবিষ্কর্তা স্যর জন হ্যারিংটনও এই বংশেরই পূর্বপুরুষ। কিট অবশ্য সেই আভিজাত্য নিয়ে খুব বেশি ভাবেন না। জন স্নো–র পিতৃপরিচয় সামনে আসার পর জানা যায়, তিনিই আসল রাজা। তাঁর শরীরেই বইছে সিংহাসনের যোগ্য উত্তরাধিকারের রক্ত। মিল।
তৃতীয় মিল— সুইমিং পুলে স্নান করার সময় তলিয়ে গিয়েছিল বছর চারেকের কিট। ‘‌মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলাম’‌, এক সাক্ষাৎকারে পরে বলেছিলেন তিনি। আর সিরিজের পঞ্চম সিজনের শেষপর্বে জন স্নোকে কুপিয়ে খুন করে তাঁরই সঙ্গীসাথীরা। এক বছর পর ষষ্ঠ সিজনের শুরুতে এক ধর্মযাজিকার যাদুবলে মৃত্যুকে জয় করে বেঁচে ওঠেন জন।
ছোট থেকেই মায়ের হাত ধরে দাদার সঙ্গে নাটক দেখতে যেতেন কিট। লিখতেন ছড়া–কবিতা। স্কুলে থাকতে অভিনয় করেছেন। বয়স যখন ১৪, তখন ‘ওয়েটিং ফর গোডো’ নাটকটি দেখে অভিনেতা হওয়ার ইচ্ছে জাগে। অতঃপর ড্রামা এবং থিয়েটার নিয়ে পড়াশোনা শুরু। হ্যামলেট চরিত্রে বেন হুইসাওয়ের অভিনয় দেখে ২০০৫ সালে র‌য়্যাল সেন্ট্রাল স্কুল অফ স্পিচ অ্যান্ড ড্রামায় স্নাতকস্তরে ভর্তি হওয়া। সুযোগ আসে ন্যাশনাল থিয়েটারে ‘‌ওয়ার হর্স’‌ থেকে অনুপ্রাণিত নাটকের মুখ্য চরিত্র অ্যালবার্টের ভূমিকায় অভিনয়ের। নিজের ঘোড়াটিকে অসম্ভব ভালবাসা খাটো চুলের গ্রামের ছেলের চরিত্রে কিটের অভিনয় চোখে পড়ে ডি বি উইজ ও ডেভিড বেনিঅফের (‌গ্রেম অফ থ্রোন্‌স–এর নির্মাতা)‌। অডিশনে ডাকা হয় তাঁকে। প্রথম অডিশনেই পাস। যাত্রা শুরু জন স্নো–র। যদিও প্রথম ওই চরিত্রের জন্য ইওয়ান রিহনকে (‌র‌্যামজে বোল্টনের চরিত্রের অভিনেতা)‌ ভাবা হয়েছিল। 
২০১১–তে শুরু সিরিজের নির্মাতাদের কথায়, ‘‌কিছু না বলেও অনেক কিছু বলার ক্ষমতা রয়েছে কিটের। ও এক জাত অভিনেতা যে এখনও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সংলাপ আওড়ায়।’‌
অভিনেতা হওয়ার আগে কিট অবশ্য চেয়েছিলেন সাংবাদিক হতে। হাতে ক্যামেরা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধের খবর ‘কভার’ করার ইচ্ছে ছিল তাঁর। কে জানত তিনিই জন স্নো–র চরিত্রে একদিন ‘যুদ্ধে’ জড়াবেন আর মৃতদের (‌হোয়াইট ওয়াকার)‌ বিপক্ষে সবচেয়ে বড় যুদ্ধে জীবিতদের একজোট করবেন। 
‘‌গেম অফ থ্রোন্‌স’‌–এ‌ তো যুদ্ধে দক্ষতা আর নেতৃত্ব দেখিয়েই জনপ্রিয় কিট হ্যারিংটন ওরফে জন স্নো। লম্বা কোঁকড়ানো চুল আর গালভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ির জন স্নো হতে অবশ্য বেশ বেগ পেতে হয়েছিল কিটকে। প্রথম পাইলট পর্বে পরচুলা পরতে হয়েছিল। এক সাক্ষাৎকারে কিট স্বীকার করেছেন, তাঁর বড় চুল বা দাড়ি রাখতে ভাল লাগে না। সুচ আর মাকড়সায় তাঁর খুব ভয়।
‘‌গেম অফ থ্রোন্‌স’‌–এর শুটিং চলাকালীন কিট পা রাখেন হলিউড সাম্রাজ্যে। ২০১২ সালে প্রথম ছবি ‘‌সাইলেন্ট হিল:‌ রিভিলেশন’। ‌কিন্তু নামডাক হয় ঐতিহাসিক পটভূমিকায় নির্মিত ২০১৪ সালের ‘পম্পেই’‌ ছবির পর।‌ এর পর ‘‌হাউ টু ট্রেন ইওর ড্রাগন’‌ সিনেমার দুটি পর্বে কণ্ঠ দেওয়া থেকে শুরু করে ‘‌টেস্টামেন্ট অফ ইউথ’‌, ‘‌সেভেন্থ সন’‌, ‘‌দ্য ডেথ অ্যান্ড লাইফ অফ জন এফ ডনোভ্যান’‌ ইত্যাদি সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন কিট। যাঁর ঝুলিতে র‌য়েছে ‘‌সেভেন ডেজ ইন হেল’‌, ‘‌গানপাউডার’‌ (‌যেখানে কিট তাঁর এক পূর্বপুরুষের চরিত্রে অভিনয় করছেন‌‌) প্রভৃতি টেলিফিল্ম ও সিরিজ। এত কিছুর পরও থিয়েটার ছাড়েননি। ‘‌ওয়ার হর্স’‌–এর পর অভিনয় করেছেন ‘‌পশ’‌, ‘দ্য ভোট’‌, ‘‌ট্রু ওয়েস্ট’‌ নামে জনপ্রিয় নাটকে।‌
কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় নেই তিনি। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম তো দূরের কথা, টুইটারেও তাঁর কোনও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট নেই। তাঁর নামে যে সব অ্যাকাউন্ট, সবই ‘ফ্যান পেজ’। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি এ সবের মধ্যে নেই। কারণ, আমি যতটুকু নিজের ব্যক্তিগত জীবনের ব্যাপারে জানিয়েছি, তার থেকে বেশি কিছু জানানোর প্রয়োজন বোধ করি না। আমি চাই মানুষ আমার অভিনয় করা চরিত্রগুলো নিয়েই মেতে থাকুক।’‌
তবে ‘‌গেম অফ থ্রোন্‌স’‌ যে তাঁর জীবনে মাইলস্টোনের থেকে অনেক বেশি, তা এক কথায় স্বীকার করেছেন কিট হ্যারিংটন। 
এই গল্পে জন স্নো–র প্রথম প্রেম ইগরিট। সেই চরিত্রে অভিনয় করেছেন রোজ লেসলি। চতুর্থ মিল— রিল এবং রিয়েল লাইফ মিলেমিশে একাকার। ২০১২ সালে আইসল্যান্ডে প্রবল ঠান্ডার মধ্যে শুটিং করার সময় কিট ও রোজ প্রেমে পড়েন। ভালবাসা পূর্ণতা পায় ২০১৮ সালের ২৩ জুন। বিয়ে করেন তাঁরা। 
আশ্চর্য নয় যে, সাক্ষাৎকারে কিট জানিয়েছিলেন, একটি কাল্পনিক চরিত্র তাঁর বাস্তবের জীবনের সঙ্গে কতটা মিশে যেতে পারে এখনও ভাবতে পারেন না তিনি। 
আর দর্শকদের মনে ‘গেম অফ থ্রোন্‌স’ সিরিজে ইগরিটের বিখ্যাত সংলাপ— ‘‌ইউ নো নাথিং জন স্নো।’

জনপ্রিয়

Back To Top