শেষ হল ‘গেম অফ থ্রোন্‌স’। ঝড়ঝঞ্ঝা পেরিয়ে টিকে গেলেন যিনি, সেই পিটার ডিনক্লেজও টিকে থেকেছেন জীবনের লড়াইয়ে।  খুঁজে দেখলেন দেবাশিস পোদ্দার।

যোগ্যতমের উদ্‌বর্তন।
টানা ৯ বছর ধরে একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়া ৮টি সিজনের পর অবশেষে যবনিকা পতন। শেষ হয়ে গেল বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও অন্যতম জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘‌গেম অফ থ্রোন্‌স’। আর তার শেষ পর্বে চার্লস ডারউইনের এই তত্ত্বের সার্থকতাই যেন প্রকাশ পেল— যোগ্যতমের উদ্‌বর্তন।
তামাম দুনিয়ার কোটি কোটি ভক্তের অনুমান এবং বিশ্লেষণকে (‌পরিভাষায় ‘ফ্যান থিওরি’)‌ এক নিমেষে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে শেষের সিজন। যেখানে দেখানো হয়েছে, ক্ষমতার রোষানলই কাল হল ডেনিরিজের। জন স্নো ওরফে এগন টারগেরিয়ান ফের চলে গেল নাইট্‌স ওয়াচে। রাজধর্ম পালনে ব্রতী হল ভাই ব্র‌্যান স্টার্ক। ইমারতি ধ্বংসস্তূপে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে সারা জীবনের মতো নিথর হয়ে গেল সারসেই এবং জেমি ল্যানিস্টার। 
ল্যানিস্টার পরিবারে টিকে রইল কে? একমাত্র টিরিয়ান। যোগ্যতম টিরিয়ান। বাহুবলে নয়। বুদ্ধিবলে। যার একমাত্র অস্ত্র তার পরিচয়। তার বামনত্ব। সেটাই তার বর্ম। যে অবলীলায় বলে, ‘‌আই ড্রিঙ্ক অ্যান্ড আই নো থিংস’‌। সত্যিই তাই।
এ তো গেল টেলিভিশন সিরিজের কাহিনী। পর্দার পিছনে বাস্তব জীবনেও রয়ে গেল আরেক যোগ্যতমের উদ্‌বর্তনের কাহিনী। ৪ ফুট ৫ ইঞ্চি এক অবয়বের লড়াই। ‘‌না’‌ বলার লড়াই। টিকে থাকার লড়াই। নিজস্বতাকে বর্মের মতো ব্যবহারের লড়াই।
‘গেম অফ থ্রোন্‌স’–এ টিরিয়ানের চরিত্রে অভিনয় করে তিনটি ‘‌এমি’‌, একটি ‘‌গোল্ডেল গ্লোব’‌ জেতা মার্কিন অভিনেতা পিটার ডিনক্লেজের ব্যক্তিগত লড়াই। 
টেলিভিশনের মেগাহিট সিরিজের শেষে যে বহুবার মরতে মরতেও শেষপর্যন্ত বেঁচে থাকে, বাস্তবে বামনত্বের জীবনেও সেই লোকটা লড়াই করতে করতে শেষপর্যন্ত জিতে যায়। টিরিয়ন ল্যানিস্টার আর পিটার ডিনক্লেজ মিলেমিশে একাকার হয়ে যান। 
নিউ জার্সির মরিজটাউনে ‘‌অ্যাকন্ড্রোপ্লেজিয়া’‌ নিয়ে ১৯৬৯ সালের ১১ জুন পিটারের জন্ম হয়েছিল। যে রোগ হাত–পায়ের হাড়ের বৃদ্ধি রুখে দেয়। বিমাবিক্রেতা বাবা, সঙ্গীতশিক্ষিকা মা, বেহালাবাদক দাদা বা বংশের অন্য কেউ কখনও বামনত্বের ‘শিকার’ হননি। ছোটবেলায় এটা ভাবতেই খারাপ লাগত পিটারের। সময়ের পালাবদলে অভিশাপের তকমা ঘুচিয়ে আশীর্বাদে পরিণত হয়েছে বামনত্ব। নাকি তিনিই আশীর্বাদে পরিণত করে ছেড়েছেন তাঁর শারীরিক অসামঞ্জস্যকে? 
যে পৃথিবীতে সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী হলে অর্ধেক যুদ্ধ জেতা হয়ে যায়, যে দুনিয়ায় ‘সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র’ বাক্যটি চলে যায় প্রবাদের পর্যায়ে, সেখানে পিটার এক কঠোর ব্যতিক্রম।
দাদা জোনাথনের সঙ্গে পাড়ায় পুতুলনাচের আসর বসাতেন পিটার। দাদার বেহালায় সুর তোলার আবেগই তাঁকে অভিনেতা হওয়ার রসদ জুগিয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন পিটার। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় ‘‌দ্য ভেলভিটিন র‌্যাবিট’‌ নাটকের মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করে প্রশংসা পাওয়া থেকে শুরু। ১৫ বছর বয়সে ‘‌ট্রু ওয়েস্ট’‌ নাটক দেখে অভিনয়কেই পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার ‘‌দুঃসাহস’‌ করেন পিটার। স্কুলের পাঠ শেষ করে ভর্তি হন বেনিংটন কলেজে। বিষয়?‌ অবশ্যই নাটক। অভিনয়। তখনই ‘‌হুইজি’‌ নামে এক ব্যান্ডে শখের গান গাওয়া শুরু করেন পিটার। ছোটখাটো ভূমিকায় অভিনয়ও শুরু করেছিলেন তখনই।
চোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে ১৯৯১ সালে কলেজের পড়াশোনা শেষে বন্ধু ইয়ান বেলের সঙ্গে স্বপ্নপূরণের শহর নিউ ইয়র্কে পাড়ি দেন পিটার। ইচ্ছে ছিল নাটকের দল খোলার। 
যাবতীয় আরাম, আয়েশকে পিছনে ফেলে একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে পথচলা শুরু। শীতে ঘর গরম করার কোনও ব্যবস্থা ছিল না। ইঁদুরের উপদ্রবে ফ্ল্যাটে বিড়াল পুষতে হয়েছিল তাঁকে। শেষে অবশ্য ভাড়া মেটাতে না পেরে ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিতে হয়। 
এমন নয় যে, অভিনয়ের কোনও সুযোগ আসছিল না। কিন্তু পিটার তা গ্রহণ করছিলেন না। কারণ, তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে দৃঢ় ছিলেন যে, তাঁর বামনত্বকে ছোট করে দেখানো হবে বা ওই একই ধরনের বেঁটে চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব এলে তিনি তা কখনওই করবেন না। 
এই হল পিটারের ‘‌না’‌ বলার লড়াই। তখন তিনি ভাল অভিনয়ের সুযোগ খুঁজছেন। আর পাশাপাশি এক ডেটা প্রসেসিং কোম্পানিতে কাজ করছেন। টানা ছ’বছর!
১৯৯৫ সাল। তখন ঠিক যে পরিস্থিতিতে পিটার, তেমনই একটি চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পেলেন তিনি। ছবির নাম ‘‌লিভিং ইন ওবলিভিয়ন’‌। শুধু বামন চরিত্রেই অভিনয় করার সুযোগ পাওয়া এক বিরক্ত অভিনেতার ভূমিকায় নামলেন পিটার। এবং পর্দায় এসে তাক লাগিয়ে দিলেন। স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ সেই পেরোলেন তিনি। একজন ম্যানেজার জুটিয়ে ২০০২ থেকে ২০১০ সাল অবধি ‘‌থার্টিন মুন’‌, ‘‌দ্য স্টেশন এজেন্ট’‌, ‘‌ফাইন্ড মি গিল্টি’‌, ‘ডেথ অ্যাট আ ফিউনারেল’‌–সহ বিভিন্ন ছবিতে নানারকম চরিত্রে অভিনয় করে নিজস্ব জায়গা তৈরি করে নিলেন একদা একের পর এক চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া ৪ ফুট ৫ ইঞ্চির পিটার।
অবশেষে ২০১১ সালে এল জীবনের সবচেয়ে বড় ‘ব্রেক’। টিরিয়ান ল্যানিস্টারের ভূমিকায় ‘‌গেম অফ থ্রোন্‌স’‌–এ অভিনয়ের প্রস্তাব এল পিটারের কাছে। যে উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে ওই টিভি সিরিজ, তার লেখক জর্জ আর আর মার্টিন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‌পিটার ওই চরিত্রে অভিনয় না করলে আদৌ সিরিজটা তৈরি হত কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে।’‌ 
সারা পৃথিবী টিরিয়ানের সঙ্গে চিনে ফেলল পিটারকে। এর পর বড় বাজেটের জনপ্রিয় ছবি ‘‌এক্সমেন:‌ ডেজ অফ ফিউচার পাস্ট’‌, ‘‌অ্যাভেঞ্জার্স:‌ ইনফিনিটি ওয়ার’‌ ছবিতে অভিনয় করলেন পিটার। এখন তাঁর সুখের জীবন। ছোট্ট ফ্ল্যাটে ইঁদুরের বর্বরতা আর নেই। দুই সন্তান নিয়ে স্ত্রী এরিকার সঙ্গে সহজ–সরল জীবন। যে জীবনে জুড়ে আছে নিরামিষ ভোজন এবং জীবজন্তুর প্রতি ভালবাসা।  
সাধে কি পিটারকে দেখে পৃথিবীর মনে পড়ে টিরিয়ান ল্যানিস্টারের বিখ্যাত ডায়ালগ— ‘‌নেভার ফরগেট হোয়াট ইউ আর। দ্য রেস্ট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড উইল নট। ওয়্যার ইট লাইক আর্মার। অ্যান্ড ইট ক্যান নেভার বি ইউজ্‌ড টু হার্ট ইউ!’‌

জনপ্রিয়

Back To Top